“আমার পরে আসবেন আহমদ”: দায়িত্ব হস্তান্তরের গল্প

বনী ইসরাঈলের সামনে দাঁড়িয়ে ঈসা (আ.) একজন রসূলের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, যিনি আসবেন তাঁর পরে। সেই রসূল এসে গেছেন। তাহলে ঈসা (আ.)-এর পালা কি আবার ফিরে আসতে পারে?

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

একটি দৌড়ের কথা ভাবুন, যেখানে একজন দৌড়বিদ তাঁর অংশ শেষ করে পরের জনের হাতে লাঠিটি তুলে দেন। লাঠি হাতবদল হলো মানে প্রথম জনের পালা শেষ। এখন দৌড়াবেন দ্বিতীয় জন।

নবুওয়তের ইতিহাসেও এমন একটি হাতবদলের মুহূর্ত আছে। বনী ইসরাঈলের নবী হযরত ঈসা (আ.) নিজের জাতির সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, তাঁর পরে আরেকজন রসূল আসবেন।

وَاِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰٮۃِ وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ
“এবং (স্মরণ কর) যখন মরিয়মের পুত্র ঈসা বলিয়াছিল, ‘হে বনী ইস্‌রাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র রসূল, উহার (ভবিষ্যদ্বাণীর) সত্যায়নকারীরূপে যাহা তওরাত হইতে আমার সম্মুখে আছে, এবং এমন এক রসূলেরও সুসংবাদ দাতা রূপে যে আমার পরে আসিবে, যাহার নাম হইবে আহ্‌মদ।’…”
সূরা আস-সাফ ৬১:৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬১:৬।

আয়াতের তিনটি সংকেত

প্রথম সংকেত: ঈসা (আ.) বলছেন, “আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর রসূল”, অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের প্রতি। কুরআনের আরেক জায়গায়ও তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে “বনী ইস্‌রাঈলের প্রতি রসুল রুপে” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫০)। তাঁর দায়িত্ব ছিল একটি নির্দিষ্ট জাতি আর তওরাতের শরীয়তের সঙ্গে বাঁধা।

দ্বিতীয় সংকেত: তিনি আসবেন মিন বা’দী, “আমার পরে।” একজন নবী যখন নিজের পরবর্তী রসূলের সুসংবাদ দেন, তখন তিনি নিজের যুগের সমাপ্তির কথাও বলছেন। মহানবী (সা.) নিজেও এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছেন:

أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِابْنِ مَرْيَمَ، وَالأَنْبِيَاءُ أَوْلاَدُ عَلاَّتٍ، لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ
“মানুষের মধ্যে আমিই ইবনে মারইয়ামের সবচেয়ে নিকটবর্তী। নবীরা সবাই একই পিতার ভিন্ন ভিন্ন মায়ের সন্তানের মতো। আমার আর তাঁর মাঝখানে কোনো নবী নেই।”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪২

তৃতীয় সংকেত: যাঁর সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল, তিনি এসে গেছেন। মুসলমানরা একমত যে এই আয়াতের “আহমদ” মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আল্লাহ তাঁকে বলেছেন “নবীগণের মোহর” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১)।

✦

হাতবদলের পর পুরোনো দৌড়বিদ কি ফিরে আসেন?

এবার পুরো ছবিটা একসঙ্গে দেখুন। ঈসা (আ.) বনী ইসরাঈলের রসূল। তিনি বলে গেলেন, তাঁর পরে আসবেন আহমদ। আহমদ (সা.) এলেন, আর তিনি হলেন সব নবীর মোহর, সমগ্র মানবজাতির রসূল।

এখন যদি বলা হয়, সেই একই ইসরাঈলী নবী ঈসা (আ.) দুই হাজার বছর আকাশে অপেক্ষা করে আবার পৃথিবীতে নেমে আসবেন, তাহলে দুটি সমস্যা দেখা দেয়।

প্রথমত, “আমার পরে আহমদ” কথাটির মানে দাঁড়ায় “আমার পরে আহমদ, আর আহমদের পরে আবার আমি।” তাহলে মহানবী (সা.)-এর পরে আরেকজন পুরোনো নবী এসে নবুওয়তের ধারায় দাঁড়ালেন। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় তাই বলা হয়েছে, খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে বনী ইসরাঈলের নবী হিসেবে ঈসা (আ.) আবার আসতে পারেন না। মহানবী (সা.)-এর পরে কেউ আসতে পারলে আসবেন তাঁরই পূর্ণ অনুসারী, তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ যে রসূলকে একটি জাতির জন্য পাঠিয়েছিলেন আর যিনি নিজেই পরবর্তী রসূলের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে গেছেন, তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়েছে। অন্য সব নবীর মতো তিনিও তাঁর আয়ু পূর্ণ করে মৃত্যুবরণ করেছেন। সূরা আলে ইমরানের ১৪৫ আয়াত এটাই বলে: মহানবী (সা.)-এর আগের সব রসূল মারা গেছেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ঈসা (আ.)-এর পরে আহমদ (সা.) এসেছেন, এতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণ হয় কীভাবে? তিনি তো আকাশে থেকেও থাকতে পারেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, ঈসা (আ.) আকাশে চলে গেছেন, তারপর মহানবী (সা.) এসেছেন; এতে কোনো বিরোধ নেই। চলুন দেখি বিরোধটা কোথায়। সমস্যা আকাশে থাকা নিয়ে নয়, ফিরে আসা নিয়ে। যিনি ফিরে আসবেন বলে বিশ্বাস করা হয়, তাঁর নবুওয়তের যুগ শেষ হয়নি বলে ধরে নিতে হয়। অথচ তিনি নিজে ঘোষণা দিয়ে গেছেন, তাঁর পরের রসূল আহমদ। আর মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁর আর ঈসা (আ.)-এর মাঝখানে কোনো নবী নেই, অর্থাৎ ধারাটি এখানে এক থেকে আরেকজনে গেছে। তার ওপর আল্লাহ বলে দিয়েছেন, মহানবী (সা.)-এর আগের সব রসূল মারা গেছেন (৩:১৪৫)। ঈসা (আ.) মহানবী (সা.)-এর আগের রসূল। এই তিনটি সত্য একসঙ্গে রাখলে আকাশে জীবিত থাকার কোনো জায়গা থাকে না।

ঈসা (আ.) তো নবী হিসেবে আসবেন না, উম্মতি হিসেবে আসবেন?

অনেকে এভাবে খাতামান নাবিয়্যীনের প্রশ্নটি এড়াতে চান। কিন্তু সহীহ মুসলিমের যে বিখ্যাত হাদীসে নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) শেষ যুগের মসীহের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে মহানবী (সা.) চারবার তাঁকে বলেছেন নাবিয়্যুল্লাহ ঈসা, “আল্লাহর নবী ঈসা” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭; ধারাবাহিক গণনায় ৭৩৭৩)। নবীর পদ থেকে কাউকে সরিয়ে দেওয়া হয় না। তাহলে বনী ইসরাঈলের সেই পুরোনো নবী যদি আসেন, তিনি নবী হিসেবেই আসবেন, আর মহানবী (সা.)-এর পরে একজন বাইরের নবীর আগমন হবে। এর সমাধান মহানবী (সা.) নিজেই দিয়েছেন: “তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৯)। প্রতিশ্রুত মসীহ উম্মতে মুহাম্মদীরই একজন, পুরোনো ঈসা (আ.) নন।

ঈসা (আ.) তো মহানবী (সা.)-এর আগেই নবী হয়েছিলেন; ফিরে এলে মোহর ভাঙবে কেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, খাতামান নাবিয়্যীন মানে মহানবী (সা.)-এর পরে নতুন কেউ নবী হবেন না; ঈসা (আ.) তো পুরোনো নবী, তাই তাঁর ফিরে আসায় সমস্যা নেই। চলুন আয়াতটি দেখি: “মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কাহারও পিতা নহে, কিন্তু সে আল্লাহ্‌র রসূল এবং নবীগণের মোহর” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১)। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই আয়াত বলে যে মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী আসতে পারেন না যিনি তাঁর নবুওয়তের মোহর ভেঙে আসেন; কেউ এলে আসবেন তাঁরই পূর্ণ অনুসারী হয়ে। বনী ইসরাঈলের নবী হিসেবে যিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ছাড়াই নবুওয়ত পেয়েছিলেন, তাঁর ফিরে আসা মানে মহানবী (সা.)-এর পরে বাইরের একজন নবীর আগমন। নতুন হোক বা পুরোনো, মোহরের পরে বাইরে থেকে কেউ ঢুকলে মোহর অক্ষত থাকে না।

সংক্ষেপে

  1. ঈসা (আ.) বনী ইসরাঈলের রসূল ছিলেন এবং নিজের পরে “আহমদ” নামের রসূলের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
  2. মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁর আর ঈসা (আ.)-এর মাঝে কোনো নবী নেই; দায়িত্ব সরাসরি হাতবদল হয়েছে।
  3. মহানবী (সা.) নবীগণের মোহর; তাঁর পরে পুরোনো কোনো ইসরাঈলী নবীর ফিরে আসার সুযোগ নেই।
  4. আগের সব রসূলের মতো ঈসা (আ.)-ও মৃত্যুবরণ করেছেন; প্রতিশ্রুত মসীহ এই উম্মতেরই একজন।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.