ক্রুশের সেই দিনের পর ঈসা (আ.)-এর কী হয়েছিল?

ইহুদি, খ্রিষ্টান, সাধারণ মুসলমান আর আহমদী মুসলমান, চারটি দল চার রকম উত্তর দেন। কোন উত্তরটি কুরআনের সঙ্গে মেলে, চলুন পাশাপাশি রেখে দেখি।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

প্রায় দুই হাজার বছর আগের কথা। জেরুজালেমের বাইরে একটি পাহাড়। একজন নবীকে ক্রুশে ঝোলানো হয়েছে, তিনি হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)।

সেদিন বিকেলে কী ঘটেছিল, আর তারপর তাঁর কী হলো? এই এক প্রশ্নের উত্তরে পৃথিবীর মানুষ আজ চারটি দলে ভাগ হয়ে আছে। প্রত্যেক দলের গল্প আলাদা। চলুন, একে একে চারটি গল্প শুনি, তারপর কুরআনের কাছে যাই।

চারটি দল, চারটি গল্প

প্রথম দল: ইহুদিরা। তওরাতে আছে, যে ব্যক্তি কাঠে ঝুলে মারা যায়, সে আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত (দ্বিতীয় বিবরণ ২১:২৩)। তাই ইহুদিরা দাবি করে, তারা ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে চড়িয়ে মেরে ফেলেছে। এতে তাদের মতে প্রমাণ হলো, তিনি সত্য নবী ছিলেন না, নাউযুবিল্লাহ।

দ্বিতীয় দল: খ্রিষ্টানরা। তারাও মানে যে তিনি ক্রুশে মারা গেছেন। তবে তাদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের বিশ্বাসে তিনি ছিলেন খোদার পুত্র। মানুষের পাপের বোঝা নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি ক্রুশে প্রাণ দিয়েছেন। তিন দিন পর আবার জীবিত হয়ে আকাশে চলে গেছেন।

তৃতীয় দল: অধিকাংশ মুসলমান। তাদের মতে ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে চড়াতেই পারেনি। আল্লাহ অন্য একজন মানুষকে ঈসা (আ.)-এর চেহারা দিয়ে দেন, আর ভুল করে সেই লোকটিকেই ক্রুশে দেওয়া হয়। আসল ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ সশরীরে, জীবিত অবস্থায় আকাশে তুলে নেন। তিনি আজও সেখানে আছেন, আর শেষ যুগে নেমে আসবেন।

চতুর্থ দল: আহমদী মুসলমানরা। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে হত্যাও করতে পারেনি, ক্রুশে চড়িয়ে মারতেও পারেনি। তাঁকে ক্রুশে ঝোলানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে মৃত্যুর মতো অচেতন অবস্থায় জীবিত নামিয়ে আনেন। সুস্থ হয়ে তিনি বনী ইসরাঈলের হারানো গোত্রদের খোঁজে পূর্ব দিকে হিজরত করেন। শেষে কাশ্মীরে পৌঁছান, সেখানে দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। শ্রীনগরে তাঁর কবর আছে।

✦

কুরআন কী বলে?

চারটি গল্পের মধ্যে কোনটি সত্য, তা যাচাইয়ের সবচেয়ে নিরাপদ মাপকাঠি আল্লাহর কালাম। কুরআন ইহুদিদের দাবিটি উদ্ধৃত করে তারপর উত্তর দিয়েছে:

وَّقَوۡلِہِمۡ اِنَّا قَتَلۡنَا الۡمَسِیۡحَ عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ رَسُوۡلَ اللّٰہِ ۚ وَمَا قَتَلُوۡہُ وَمَا صَلَبُوۡہُ وَلٰکِنۡ شُبِّہَ لَہُمۡ
“এবং তাহাদের এই বক্তব্যের কারণে, ‘আমরা আল্লাহ্‌র রসূল মরিয়মের পুত্র ঈসা মসীহ্‌কে নিশ্চয় হত্যা করিয়াছি’, অথচ না তাহারা তাহাকে হত্যা করিয়াছিল এবং না তাহারা তাহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া নিহত করিয়াছিল, বরং তাহাদের নিকটে তাহাকে (ক্রুশ-বিদ্ধ মৃতের) অনুরূপ করা হইয়াছিল…”
সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৪:১৫৭।

লক্ষ করুন, কুরআন বলছে না যে তাঁকে ক্রুশে ঝোলানোই হয়নি। কুরআন বলছে, তারা তাঁকে ক্রুশে বিদ্ধ করে মেরে ফেলতে পারেনি। ইহুদিদের কাছে শুধু মনে হয়েছিল যে তিনি ক্রুশে মারা গেছেন। আর যারা এ নিয়ে মতভেদ করে, তারা সন্দেহে আছে, তাদের কাছে নিশ্চিত জ্ঞান নেই।

এতে প্রথম দুই দলের মূল দাবি ভেঙে যায়। ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি। তাই ইহুদিদের “অভিশপ্ত মৃত্যু”র অভিযোগও টেকে না, আর খ্রিষ্টানদের “ক্রুশে প্রাণ দিয়ে পাপ মোচন”-এর বিশ্বাসেরও ভিত্তি থাকে না।

এরপর আল্লাহ বলেন:

بَلۡ رَّفَعَہُ اللّٰہُ اِلَیۡہِ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا
“বরং আল্লাহ্ তাহাকে তাঁহার দিকে উন্নীত করিয়াছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ্ মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯

ইহুদিরা চেয়েছিল তাঁকে অভিশপ্ত প্রমাণ করতে, অর্থাৎ আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। আল্লাহ উল্টোটা করলেন, তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করলেন, সম্মানিত করলেন। আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট আকাশে বসে থাকেন না, তিনি সব জায়গায় আছেন। তাই “আল্লাহর দিকে উন্নীত করা” মানে মর্যাদা বাড়ানো, শরীর নিয়ে ওপরে তুলে নেওয়া নয়।

তৃতীয় গল্পটির সমস্যা কোথায়?

অধিকাংশ মুসলমানের গল্পে দুটি অংশ আছে: অন্য কারও চেহারা বদলে দেওয়া, আর সশরীরে আকাশে তুলে নেওয়া। কুরআনের আয়াতে এ দুটির কোনোটির উল্লেখ নেই।

আয়াতে বলা হয়েছে “তাকে অনুরূপ করা হয়েছিল।” এখানে “তাকে” বলতে স্বাভাবিকভাবেই ঈসা (আ.)-কে বোঝায়, যাঁর কথা আয়াতে চলছে। অন্য কোনো লোকের নাম বা ইঙ্গিত সেখানে নেই। তা ছাড়া, একজন নির্দোষ মানুষকে আরেকজনের চেহারা দিয়ে তার জায়গায় মেরে ফেলা আল্লাহর ন্যায়বিচারের সঙ্গেও মেলে না।

আলইসলাম.অর্গের গবেষণা দেখায়, এই “চেহারা বদল”-এর গল্প কুরআন বা সহীহ হাদীস থেকে আসেনি। এগুলো এসেছে পরবর্তী যুগে ইসলাম গ্রহণকারী কিছু ইহুদি ও খ্রিষ্টানের বর্ণনা থেকে। প্রাচীন কিছু খ্রিষ্টান উপদলের মধ্যেই এমন বিশ্বাস ছিল যে, ক্রুশে আসল যিশু নন, তাঁর মতো দেখতে অন্য কেউ ছিল।

তাহলে কুরআনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে কোন গল্পটি? যেটি বলে: তিনি ক্রুশে মারা যাননি, আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন ও সম্মানিত করেছেন, আর পরে অন্য সব নবীর মতো তিনিও স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ নিজেই ঈসা (আ.)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “নিশ্চয় আমি তোমাকে মৃত্যু দিব এবং আমার দিকে তোমাকে উন্নিত করিব” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৬)।

চারটি দলই একটি বিষয়ে একমত: শেষ যুগে একজন মসীহ আসবেন। পার্থক্য শুধু এখানে যে, প্রথম তিন দল সেই পুরোনো ঈসা (আ.)-এর আকাশ থেকে নেমে আসার অপেক্ষায় আছে। আহমদী মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, পুরোনো ঈসা (আ.) যেহেতু মারা গেছেন, তাই মহানবী (সা.) যাঁর আগমনের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি এই উম্মতেরই একজন, ঈসা (আ.)-এর গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসা একজন মসীহ।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“রাফাআহু” মানে কি শরীরসহ আকাশে তুলে নেওয়া নয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, “বাল রাফাআহুল্লাহু ইলাইহি” কথাটিই তো প্রমাণ যে তাঁকে সশরীরে ওপরে তোলা হয়েছে। চলুন দেখি কুরআন নিজে এই শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করে। হযরত ইদরীস (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

وَّرَفَعۡنٰہُ مَکَانًا عَلِیًّا
“এবং আমরা তাহাকে অতি উচ্চ মর্যদায় উন্নীত করিয়াছিলাম।”
সূরা মারইয়াম ১৯:৫৮

মুমিন ও জ্ঞানীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁদের “মর্যাদাসমূহে সমুন্নত ও সম্মানিত করিবেন” (সূরা আল-মুজাদালা ৫৮:১২), সেখানেও একই শব্দ ইয়ারফাই। মহানবী (সা.) দুই সিজদার মাঝে দোয়া করতেন, ওয়ারফা’নী, “আমার মর্যাদা উঁচু করো” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৮৯৮)। কেউ এর অর্থ করেন না যে তিনি আকাশে উঠে যেতে চাইতেন। আল্লাহ যখন কোনো মানুষকে “নিজের দিকে” উন্নীত করেন, তার অর্থ সম্মান ও নৈকট্য। ঈসা (আ.)-এর বেলাতেও তাই।

তিনি যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে হাদীসে যে ঈসা ইবনে মারইয়ামের নেমে আসার কথা আছে?

প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক। উত্তরও হাদীসের ভেতরেই আছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে নাযিল হবেন আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে” (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪৯)। লক্ষ করুন, “আকাশ থেকে” শব্দটি হাদীসে নেই। আর “নাযিল হওয়া” কুরআনে মহানবী (সা.), লোহা ও পশুর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে; এর মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো।

আরও লক্ষণীয়, সহীহ বুখারীতেই মহানবী (সা.) দুই ঈসার দুই রকম চেহারা বর্ণনা করেছেন। মিরাজে দেখা ঈসা (আ.) ছিলেন লালচে রঙের, কোঁকড়া চুলের (হাদীস ৩৪৩৮)। আর শেষ যুগের দৃশ্যে কাবা তাওয়াফ করতে দেখা মসীহ ছিলেন বাদামি রঙের, সোজা চুলের (হাদীস ৩৪৪১)। চেহারা আলাদা মানে মানুষও আলাদা। যিনি আসার কথা, তিনি এই উম্মতেরই একজন, ঈসা (আ.)-এর গুণ নিয়ে আসা মসীহ।

ক্রুশে ঝোলানোর পরও বেঁচে থাকা কি সম্ভব?

কেউ প্রশ্ন করেন, ক্রুশে ঝোলানো হলে তো মানুষ মারা যায়। কিন্তু কুরআনের শব্দ মা সালাবূহু শুধু ক্রুশে ঝোলানো অস্বীকার করছে না, ক্রুশে ঝুলিয়ে মেরে ফেলা অস্বীকার করছে। আহমদীয়া অনুবাদে তাই লেখা: “না তাহারা তাহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া নিহত করিয়াছিল।” কয়েক ঘণ্টা ক্রুশে থাকার পর মৃতের মতো অবস্থায় নামিয়ে আনা আর সেবা-শুশ্রূষায় সেরে ওঠা আল্লাহর কুদরতে মোটেই অসম্ভব নয়। ঠিক এ কারণেই কুরআন বলছে, ইহুদিরা নিজেরাও এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল না, তারা “ঘোর সন্দেহের মধ্যে নিপতিত।”

এই বিষয়ে চলচ্চিত্র · ৮:১৮ মিনিটFilm on this topic · 8:18 minক্রুশ থেকে কাশ্মীর · পর্ব ১: খালি কবরFrom the Cross to Kashmir · 1: The Empty Tomb

সংক্ষেপে

  1. ইহুদিরা বলে তাঁকে ক্রুশে মেরেছে, খ্রিষ্টানরা বলে তিনি ক্রুশে প্রাণ দিয়ে আকাশে গেছেন।
  2. অধিকাংশ মুসলমান বলেন, অন্য একজনকে তাঁর চেহারা দেওয়া হয় আর তিনি সশরীরে আকাশে আছেন।
  3. কুরআন বলছে, তারা তাঁকে হত্যাও করেনি, ক্রুশে মেরেও ফেলেনি; আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন।
  4. আহমদী বিশ্বাস: তিনি ক্রুশ থেকে জীবিত রক্ষা পান, কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.