পাকিস্তান সরকারের “শ্বেতপত্রে” একটি জোরালো দাবি ছিল: ইসলামের ইতিহাসে কেউ কখনো “খাতামান নাবিয়্যীন” বা “লা নাবিয়্যা বা’দী”-র অন্য কোনো অর্থ করেননি; সবাই একবাক্যে বলেছেন, সব ধরনের নবুয়্যত শেষ।
একটি দাবি যাচাই করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পুরোনো বইগুলো খুলে দেখা। হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন। চলুন, তাঁর দেখানো পথে কয়েকটি পাতা উল্টাই।
প্রথম পাতা: উম্মুল মু’মিনীন
শুরু করি সবচেয়ে কাছের সাক্ষী দিয়ে। মহানবী (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেছেন: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)।
তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর হাদীস-বিশারদ ইমাম ইবনে কুতাইবা (রহ.) এই উক্তি নিয়ে লিখেছেন, এটি মহানবী (সা.)-এর বাণীর বিরোধী নয়; কারণ নবী (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর পরে এমন কোনো নবী নেই যিনি তাঁর শরীয়ত রহিত করবেন (তাবীলু মুখতালিফিল হাদীস, পৃষ্ঠা ১২৭)।
দশম হিজরী শতাব্দীর ইমাম মুহাম্মদ তাহের (রহ.)-ও তাঁর তাকমিলা মাজমাউল বিহারিল আনওয়ারে (পৃষ্ঠা ৫০২) লিখেছেন, হযরত আয়েশা (রা.)-এর এই কথা “লা নাবিয়্যা বা’দী” হাদীসের পরিপন্থী নয়, কারণ নবী (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁর শরীয়ত রহিতকারী কোনো নবী না আসা।
সুফি ও মুজাদ্দিদদের কলম
শায়খুল আকবর হযরত মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.) লিখেছেন: নবুয়্যত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি; শুধু নতুন শরীয়ত নিয়ে আসা নবুয়্যত শেষ হয়েছে, আর এটাই “লা নাবিয়্যা বা’দী”-র অর্থ (আল-ফুতূহাতুল মাক্কিয়্যা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৩)।
ইমাম আব্দুল ওয়াহহাব শারানী (রহ.) লিখেছেন: মহানবী (সা.)-এর কথা যে তাঁর পরে কোনো নবী বা রসূল নেই, এর অর্থ শুধু এই যে তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী নেই (আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫)।
উপমহাদেশে সর্বজনমান্য মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমদ সারহিন্দী (রহ.) তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেন: নবীগণের মোহর মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর আবির্ভাবের পর তাঁর অনুসারীদের মধ্যে অনুসরণ ও উত্তরাধিকারসূত্রে নবুয়্যতের গুণাবলি অর্জন তাঁর খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী নয়; অতএব সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না (মাকতুবাতে ইমাম রব্বানী, প্রথম খণ্ড, মাকতুব নং ৩০১)।
দ্বাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) লিখেছেন: “লা নাবিয়্যা বা’দী” থেকে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, তাঁর পরে নতুন শরীয়ত নিয়ে আসা কোনো নবী নেই (কুররাতুল আইনাইন, পৃষ্ঠা ৩১৯)। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, তাঁর পরে এমন কেউ নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পান (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)।
হানাফী আলেম থেকে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা
আহলে সুন্নতের প্রথম সারির আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন: খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি নতুন শরীয়ত আনবেন এবং তাঁর উম্মতের অনুসারী নন (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)।
লখনৌর মাওলানা আব্দুল হাই (রহ.) লিখেছেন: মহানবী (সা.)-এর যুগে বা তাঁর পরে কোনো নবী আসা অসম্ভব নয়, কিন্তু নতুন শরীয়ত আসা একেবারেই অসম্ভব (দাফিউল ওয়াসাওয়াস, পৃষ্ঠা ১২)।
আর দেওবন্দী ধারার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী (রহ.) লিখেছেন: সাধারণ মানুষের ধারণা, খাতাম মানে তাঁর যুগ আগের নবীদের পরে, তিনি শেষ নবী; কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের কাছে স্পষ্ট যে সময়ের ক্রমে আগে-পরে আসায় নিজস্ব কোনো মর্যাদা নেই। … এমনকি মহানবী (সা.)-এর যুগের পরেও যদি কোনো নবী জন্ম নেন, তাতেও তাঁর খাতামিয়্যাতে কোনো পার্থক্য আসবে না (তাহযীরুন নাস, পৃষ্ঠা ৩, ২৫)।
এবার শ্বেতপত্রের দাবিটি আবার পড়ুন: “কেউ কখনো অন্য অর্থ করেননি।” পাতাগুলো নিজেই উত্তর দিচ্ছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এঁরা তো সুফি; উম্মতের ইজমা কি এর বিপরীত নয়?
তালিকাটি আবার দেখুন। এখানে আছেন একজন উম্মুল মু’মিনীন, তৃতীয় শতাব্দীর একজন হাদীস-বিশারদ, প্রখ্যাত হানাফী ফকীহ, দুইজন স্বীকৃত মুজাদ্দিদ, আর দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা। এঁদের সবাইকে শুধু “সুফি” বলে সরিয়ে রাখা যায় না। আর যেখানে এত বড় বড় নাম ভিন্ন অর্থ লিখে গেছেন, সেখানে “সবাই একমত” দাবিটি আর টেকে না। ইজমার দাবি প্রমাণ করতে হয় বই দিয়ে, আর বই অন্য কথা বলছে।
এঁরা তো ঈসা (আ.)-এর ফিরে আসার পথ খোলা রাখতেই এ কথা বলেছেন, নতুন নবীর জন্য নয়?
ইমাম মুহাম্মদ তাহের (রহ.) সত্যিই লিখেছেন, হযরত আয়েশা (রা.)-এর উক্তির একটি কারণ ছিল ঈসা (আ.)-এর আগমন। কিন্তু লক্ষ করুন, তাঁরা যে নীতিটি দিয়েছেন তা সাধারণ: শুধু শরীয়তবাহী, স্বাধীন নবুয়্যত শেষ। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) ঈসা (আ.)-এর কথা বলছেন না, বলছেন মহানবী (সা.)-এর অনুসারীদের কথা, যারা উত্তরাধিকারসূত্রে নবুয়্যতের গুণাবলি পাবেন। আর শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর মাপকাঠি, “তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পাওয়া নবী হতে পারেন না”, পুরোনো বনী ইসরাঈলী নবীর ফিরে আসার পক্ষে নয়, বরং উম্মতী নবুয়্যতের পক্ষে যায়।
নানুতুবী সাহেবের কথা কি প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি?
তিনি অন্য জায়গায় কী লিখেছেন, সেটা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু এখানে তিনি দুটি কথা স্পষ্টভাবে লিখেছেন: সময়ের দিক থেকে শেষে আসায় আলাদা কোনো মর্যাদা নেই, আর তাঁর পরে কোনো নবী জন্মালেও খাতামিয়্যাতে পার্থক্য আসবে না। আহমদীয়া জামাত এটুকুই দেখাতে চায়: খাতামিয়্যাতের মূল অর্থ মর্যাদা, আর অনুসারী নবুয়্যত তাকে ভাঙে না। এই কথা তাঁর নিজের কলমেই আছে।
সংক্ষেপে
- হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, “খাতামান নাবিয়্যীন বলো, কিন্তু বলো না তাঁর পরে কোনো নবী নেই।”
- ইবনে কুতাইবা, ইবনে আরাবী, শারানী, শাহ ওলীউল্লাহ, মোল্লা আলী কারী (রহ.) প্রমুখ বলেছেন, শেষ হয়েছে শুধু শরীয়তবাহী নবুয়্যত।
- মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) লিখেছেন, অনুসারীদের মধ্যে নবুয়্যতের গুণাবলি অর্জন খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী নয়।
- মাওলানা কাসেম নানুতুবী লিখেছেন, পরে কোনো নবী জন্মালেও খাতামিয়্যাতে পার্থক্য আসবে না; তাই “কেউ অন্য অর্থ করেননি” দাবিটি সঠিক নয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Real Significance of Hadith La Nabiyya Ba‘di · alislam.org
- Advent of a Prophet within the Ummah is Not in Conflict with ‘Khatm-e-Nubuwwat’ · alislam.org
- Reality of Khatam al-Nabiyyin · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.