কারো বাবা যখন ছেলেকে বলেন, “তুই তো একদম আমার মতো হয়েছিস”, তখন তিনি চেহারার কথা বলছেন না, নামের কথাও না। তিনি বলছেন স্বভাব, চালচলন, মনের কথা। মিল অনেক রকমের হয়।
শেষ যুগের প্রতিশ্রুত সংস্কারকের নাম নিয়েও হাদীসে এমনই একটি “মিলের” কথা এসেছে। অনেকে ধরে নেন, ইমাম মাহদীর নাম হবে হুবহু “মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ”। চলুন দেখি, হাদীস আসলে কী বলে।
হাদীসের শব্দটি: “ইউওয়াতিউ”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, পৃথিবীর যদি মাত্র একটি দিনও বাকি থাকে, আল্লাহ সেই দিনকে দীর্ঘ করবেন:
এখানে মূল আরবি শব্দটি হলো “ইউওয়াতিউ”। এর অর্থ মিলে যাওয়া, সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। হাদীসে বলা হয়নি “তাঁর নাম হবে মুহাম্মদ”। বলা হয়েছে, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলবে।
আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদীসের কয়েকটি সূত্র একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। হযরত সুফিয়ান (রহ.)-এর বর্ণনায় শুধু আছে, “আমার আহলে বাইতের একজন আরবদের শাসন করবেন, যার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলবে।” পিতার নামের কথা সেখানে নেই। আর ইমাম আবু দাউদ নিজেই বলেছেন, আরও দুজন বর্ণনাকারীর শব্দ সুফিয়ানের বর্ণনার মতোই। অর্থাৎ “পিতার নাম” অংশটি সব বর্ণনায় একরকম নয়।
মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন
নামের এই মিলের গভীর অর্থ বুঝতে হলে আমাদের সূরা আল-জুমুআর দিকে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তিনি উম্মী আরবদের মধ্যে একজন রসূল পাঠিয়েছেন। তারপরের আয়াতে বলছেন:
অর্থাৎ মহানবী (সা.) পরবর্তী এক যুগের মানুষের মধ্যেও “আবির্ভূত” হবেন। সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এরা কারা? হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনবার প্রশ্ন করার পর মহানবী (সা.) পাশে বসা হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর গায়ে হাত রেখে বললেন:
মহানবী (সা.) নিজে তো সশরীরে আবার আসবেন না। তাহলে “তাদের মধ্যেও আবির্ভূত হবেন” কথার অর্থ কী? অর্থ হলো, তাঁর এমন এক পূর্ণ অনুসারী আসবেন, যাঁর মধ্যে তাঁরই রং, তাঁরই শিক্ষা, তাঁরই আত্মা প্রতিফলিত হবে। যেন মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আগমন।
এবার নামের হাদীসটি আবার পড়ুন। যিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আসবেন, তাঁর নাম তো মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলবেই। কারণ তিনি নিজের পরিচয়ে নয়, তাঁর প্রভুর পরিচয়েই পরিচিত হবেন।
আহমদ: মহানবী (সা.)-এর আরেক নাম
এবার বাহ্যিক নামের দিকেও তাকানো যাক। কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর মুখে একটি সুসংবাদ আছে:
“আহমদ” মহানবী (সা.)-এরই নাম। আর প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবিকারীর নাম মির্যা গোলাম আহমদ। তাঁর নামের মূল অংশই “আহমদ”। আলইসলাম ডট অর্গের একটি প্রবন্ধে প্রতিশ্রুত মসীহর চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ আছে যে, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, আর সূরা আস-সাফের এই আয়াতটিও সেখানে উদ্ধৃত হয়েছে।
অর্থাৎ বাহ্যিক দিক থেকেও নাম মিলেছে, আর আধ্যাত্মিক দিক থেকেও। হাদীসের “ইউওয়াতিউ” শব্দটি এই দুই মিলকেই সুন্দরভাবে ধারণ করে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“নাম মিলবে মানে তো নাম হুবহু ‘মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ’ হবে?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীসের সরল অর্থ হলো নাম হুবহু এক হবে। চলুন দেখি। হাদীসের শব্দ “ইউওয়াতিউ”, যার অর্থ মিলে যাওয়া বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। তা ছাড়া আমরা দেখেছি, পিতার নামের অংশটি সব বর্ণনায় নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামের চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে “মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ” নামের একাধিক মানুষ মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন, এবং ইতিহাস তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু নাম মিলিয়ে কেউ মাহদী হয় না। মাহদী চেনা যায় তাঁর কাজ, তাঁর সময় আর আল্লাহর সাহায্য দেখে।
“হাদীসে তো আগমনকারীর নাম ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম’, তাহলে মাহদী আলাদা কেউ নন?”
এটি খুব ভালো প্রশ্ন, আর এর উত্তরেই নামের রহস্যটা খুলে যায়। একই প্রতিশ্রুত মানুষকে হাদীস বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে ডেকেছে: কোথাও “ঈসা ইবনে মারইয়াম”, কোথাও “মাহদী”, কোথাও এমন একজন “যার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলবে”। সুনান ইবনে মাজাহতে তো এমন একটি বর্ণনাও আছে: “ঈসা ইবনে মারইয়াম ছাড়া আর কোনো মাহদী নেই” (কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৩৯)। এর সনদকে কোনো কোনো হাদীস-বিশারদ দুর্বল বলেছেন, তবু এতে একটি দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য আছে।
এসব নাম আসলে পরিচয়পত্রের নাম নয়, বরং গুণ আর ভূমিকার নাম। “ঈসা” নাম বোঝায়, তিনি ঈসা (আ.)-এর স্বভাব আর দায়িত্ব নিয়ে আসবেন। “মাহদী” নাম বোঝায়, তিনি আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর “মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মেলা নাম” বোঝায়, তিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি। নামগুলো একে অন্যের বিরোধী নয়, একে অন্যকে পূর্ণ করে।
“‘গোলাম আহমদ’ তো একটি পুরো নাম, শুধু ‘আহমদ’ নয়।”
উপমহাদেশে “গোলাম”, “আবদুল” ইত্যাদি শব্দ জুড়ে নাম রাখা খুব সাধারণ রীতি। “গোলাম আহমদ” মানে আহমদের সেবক। মজার বিষয় হলো, এই নামটিই পুরো সত্যটা বলে দেয়: তিনি স্বাধীন কোনো নবী নন, বরং আহমদ মুস্তফা (সা.)-এর গোলাম, তাঁরই অনুসারী, তাঁরই প্রতিচ্ছবি। নামের মূল শব্দ “আহমদ” মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলে যায়, আর “গোলাম” শব্দটি তাঁর বিনয়ী অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
সংক্ষেপে
- আবু দাউদের হাদীস (৪২৮২) বলে, প্রতিশ্রুত ব্যক্তির নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে “মিলবে”, হুবহু এক হবে এমন বলা হয়নি।
- সূরা আল-জুমুআ ও বুখারীর হাদীস (৪৮৯৭) অনুযায়ী শেষ যুগে মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আগমন হবে; তাই তাঁর প্রতিচ্ছবির নাম তাঁর নামের সঙ্গে মিলবেই।
- “আহমদ” মহানবী (সা.)-এর নাম (সূরা আস-সাফ ৬১:৭), আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নামের মূল অংশও “আহমদ”।
- হাদীসে একই প্রতিশ্রুত ব্যক্তির জন্য একাধিক নাম এসেছে; এগুলো তাঁর গুণ ও দায়িত্বের পরিচয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Promised Messiah · alislam.org
- The Promised Messiah and Mahdi (as) (Friday Sermon, 24 March 2023) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.