“পূর্ণাঙ্গ মুহাম্মদকে দেখতে চাইলে কাদিয়ানে এসো” কথাটি কার?

একটি কবিতার এক লাইন দিয়ে গোটা জামাতের বিশ্বাস বিচার করা হয়। অথচ লাইনটি কার লেখা, আর জামাতের খলীফা এ নিয়ে কী বলেছিলেন, তা খুব কমই বলা হয়।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

ভালোবাসা মানুষকে কবি বানায়। প্রিয় মানুষের প্রশংসায় কবিরা প্রায়ই এমন উপমা টানেন, যা মেপে-জুখে বলা গদ্যে কেউ বলত না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অনেক।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর এক ভক্ত কবিও একবার এমন কয়েকটি লাইন লিখেছিলেন। আজ সেই লাইনগুলোর একটি আহমদীয়া জামাতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত আপত্তির একটি।

আপত্তিটি কী?

উর্দু কবিতাটির ভাব এমন: “মুহাম্মদ আবার আমাদের মাঝে এসেছেন, মর্যাদায় আগের চেয়েও এগিয়ে; যে পূর্ণাঙ্গ মুহাম্মদকে দেখতে চায়, সে কাদিয়ানে এসে গোলাম আহমদকে দেখুক।”

বিরোধীরা বলেন, এর অর্থ আহমদীরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চেয়েও বড় মনে করে। অভিযোগটি গুরুতর। তাই খুব যত্ন নিয়ে দেখা দরকার, কথাটি কার, আর জামাতের অবস্থান আসলে কী।

লাইনটি কার লেখা?

লাইনটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নয়। তাঁর কোনো বইয়ে, কোনো ঘোষণায় এ কথা নেই। এটি তাঁর এক অনুরাগী কবি, কাযী যহুরুদ্দীন আকমল সাহেবের কবিতার অংশ। জামাতের কোনো খলীফারও এটি বক্তব্য নয়।

একজন কবির আবেগের লাইন কোনো জামাতের আকীদা (বিশ্বাস) হয় না। আকীদা জানতে হয় প্রতিষ্ঠাতার নিজের লেখা থেকে, আর তাঁর খলীফাদের ব্যাখ্যা থেকে।

আর খলীফার ব্যাখ্যাটিও আমাদের হাতে আছে। এই কবিতাংশটি যখন জামাতের দ্বিতীয় খলীফা হযরত মির্যা বশীরউদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-এর সামনে আনা হয়, তিনি বলেন: “যদি এতে উন্নত মর্যাদা বোঝানো হয়ে থাকে, তাহলে এমন বিশ্বাস নিঃসন্দেহে কুফরী।” তিনি আরও বলেন, যে অর্থেই এমন শব্দ ব্যবহার করা হোক, এটি চরম অপছন্দনীয় ও বেআদবি। (আল-ফযল, ১৯ আগস্ট ১৯৩৪)

অর্থাৎ যে অর্থ ধরে আপত্তি করা হচ্ছে, জামাত নিজেই সেই অর্থকে কুফরী বলেছে।

✦

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে কী বলেছেন?

এবার তাঁর নিজের কথা শুনি। মহানবী (সা.) সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:

“তিনিই সব কল্যাণের উৎস। যে ব্যক্তি তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার না করে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে, সে মানুষ নয়, শয়তানের বংশধর। কারণ প্রতিটি শ্রেষ্ঠত্বের চাবি তাঁকেই দেওয়া হয়েছে… আমি কে, আমার আসল পরিচয় কী? আমি অকৃতজ্ঞ হব, যদি স্বীকার না করি যে আল্লাহর প্রকৃত একত্ব আমি এই নবীর মাধ্যমেই পেয়েছি।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১১৫)

আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্য ছাড়া তিনি কোনো মর্যাদা, কোনো সম্মান, আল্লাহর কোনো নৈকট্যই লাভ করতে পারতেন না; যা কিছু পেয়েছেন, তা ছায়া হিসেবে, মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমেই পেয়েছেন। (ইযালায়ে আওহাম, পৃষ্ঠা ১৩৮)

যে মানুষ নিজেকে এভাবে বর্ণনা করেন, তিনি কি নিজেকে মনিবের চেয়ে বড় ভাবতে পারেন? ছায়া কখনো আসল জিনিসের চেয়ে বড় হয় না।

কুরআনও এই সম্পর্কের পথটি দেখিয়ে দিয়েছে:

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ
“তুমি বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে ভালোবাস, তাহা হইলে তোমরা আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ্ও তোমাদিগকে ভালোবাসিবেন…’”
সূরা আলে ইমরান ৩:৩২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩:৩১।

আল্লাহর ভালোবাসার পথ মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেকে এই অনুসরণেরই ফল বলেছেন, এর বাইরে কিছু নয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কবিতাটি তো জামাতের মানুষই লিখেছিলেন, তাহলে দায় কার?

কেউ কেউ বলেন, জামাতের একজন সদস্য লিখেছেন, তাই জামাতকেই দায় নিতে হবে। চলুন দেখি ইসলাম কী শেখায়। মহানবী (সা.)-এর যুগেও ভক্তরা কখনো কখনো প্রশংসায় সীমা ছাড়িয়ে যেতেন। তখন তিনি নিজেই তা থামিয়েছেন:

لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
“খ্রিস্টানরা যেমন মরিয়মের পুত্রের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা আমার প্রশংসায় তেমন বাড়াবাড়ি করো না। আমি তো তাঁর বান্দা মাত্র; তাই বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল।”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪৫

ভক্তের বাড়াবাড়ির দায় তখনই নেতার ঘাড়ে পড়ে, যখন তিনি তা সমর্থন করেন। এখানে জামাতের খলীফা স্পষ্ট ভাষায় সেই অর্থকে কুফরী ও বেআদবি বলেছেন। দায় তাই জামাতের ওপর বর্তায় না।

আহমদীরা কি তাঁকে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় মনে করে?

না। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তাঁকে শুধু “নবী” বলা যায় না; তিনি একই সঙ্গে নবী এবং মহানবী (সা.)-এর উম্মতি (অনুসারী)। তাঁর নবুওয়ত মহানবী (সা.)-এর নবুওয়তের প্রতিচ্ছবি, আলাদা কিছু নয়। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৫০) প্রতিচ্ছবিকে কেউ আসলের চেয়ে বড় বলে না।

আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন: “আমার নিজের কোনো যোগ্যতায় নয়, শুধু আল্লাহর কৃপায় আমাকে সেই নেয়ামতের পূর্ণ অংশ দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে নবী-রসূলদের দেওয়া হয়েছিল। আমার নেতা ও মনিব, নবীদের গৌরব, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর অনুসরণ না করলে এই নেয়ামত পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ৬২)

তাহলে “মুহাম্মদ আবার এসেছেন” ধারণাটি কোথা থেকে?

এর মূল কুরআনের সূরা জুমুআয়। সেখানে বলা হয়েছে, মহানবী (সা.) পরবর্তী এমন লোকদের মধ্যেও আবির্ভূত হবেন, যারা তখনো আসেনি:

وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই।…”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৪

এই আয়াত নাযিল হলে সাহাবীরা জানতে চান, এরা কারা। মহানবী (সা.) হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর গায়ে হাত রেখে বলেন, “ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছেও চলে যায়, তবু এদের মধ্য থেকে কিছু লোক বা একজন লোক তা ফিরিয়ে আনবে।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, হাদীস ৪৮৯৭)

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, পূর্ণ আনুগত্যের কারণে আকাশে তাঁকে মুহাম্মদ ও আহমদ নাম দেওয়া হয়েছে; এটি মহানবী (সা.)-এরই আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আগমন, তাঁর গৌরবের জন্য, নিজের জন্য নয়। (এক গলতী কা ইযালা) এখানে “বড়” হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই; আছে মনিবের আলো ছাত্রের মধ্যে প্রতিফলিত হওয়ার কথা।

সংক্ষেপে

  1. লাইনটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নয়; এটি এক ভক্ত কবির আবেগের কবিতা।
  2. দ্বিতীয় খলীফা (রা.) বলেছেন, এতে উচ্চতর মর্যাদা বোঝালে তা কুফরী, আর যে অর্থেই হোক এটি বেআদবি।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেকে মহানবী (সা.)-এর অনুসারী ও প্রতিচ্ছবি বলেছেন; সব কল্যাণ তিনি তাঁর কাছেই ঋণী।
  4. তাই এক কবির লাইন দিয়ে জামাতের বিশ্বাস বিচার করা ন্যায্য নয়।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.