কাদিয়ানের পাশের এক গ্রাম থেকে আসা এক বৃদ্ধা। নাম ভানু। বহু বছর ধরে তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর পরিবারে কাজ করতেন। বাড়ির মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন প্রায় পরিবারেরই একজন, আর তাঁর ভক্তি ছিল সরল গ্রামীণ মানুষের মতো।
এক প্রচণ্ড শীতের রাতে এই বৃদ্ধাকে নিয়ে একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনাটিকেই পরে আপত্তির রূপ দেওয়া হয়েছে।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.) সংকলিত সীরাতুল মাহদী গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বাড়িতে ভানু নামে এক মহিলা কাজ করতেন, আর তিনি রাতে তাঁর পা টিপে দিতেন। এই অর্ধেক কথাটুকু বলে তাঁরা একটি খারাপ ইঙ্গিত দিতে চান।
পুরো বর্ণনাটি
সীরাতুল মাহদীর সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি (বর্ণনা নম্বর ৭৮০) কার মুখ থেকে এসেছে, সেটিই প্রথম লক্ষণীয়। এটি বর্ণনা করেছেন ডা. মীর মুহাম্মদ ইসমাঈল সাহেব, আর তিনি শুনেছেন তাঁর বোন, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সহধর্মিণী হযরত সৈয়দা নুসরত জাহান বেগম (রা.)-এর কাছ থেকে।
ঘটনাটি এমন: ভানু নামে এক বৃদ্ধা কাজের মহিলা এক প্রচণ্ড শীতের রাতে হুযূরের পা টিপে দিতে বসলেন। তিনি লেপের উপর দিয়েই টিপছিলেন, তাই বুঝতে পারেননি যে তিনি আসলে পা নয়, খাটের কাঠের পাটাতন টিপছেন। কিছুক্ষণ পর হযরত মির্যা সাহেব রসিকতা করে বললেন, “ভানু, আজ অনেক শীত পড়েছে, তাই না?” ভানু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ভীষণ শীত, দেখুন না, আপনার পা কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে!”
বর্ণনার শেষে বলা হয়েছে, ভানু কাদিয়ানের কাছের গ্রামের মানুষ ছিলেন, আর ছিলেন নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক মহিলা।
গল্পটি আসলে কী বলে
এবার পুরো ছবিটা দেখুন। ঘটনাটির বর্ণনাকারী তাঁর নিজের স্ত্রী। তিনি এটি বলেছেন একটি হাসির গল্প হিসেবে। ভানু এত বয়স্ক যে, খাটের কাঠ আর মানুষের পায়ের পার্থক্যও বুঝতে পারেননি। পরিবারের মধ্যে, সবার জানাশোনায়, প্রকাশ্যে ঘটা একটি সরল ঘটনা।
কোনো গোপন বা লজ্জাজনক বিষয় হলে একজন স্ত্রী কি তা হাসির গল্প হিসেবে ভাইকে শোনাতেন? আর সেই ভাই কি তা বইয়ে ছাপার জন্য দিতেন? ঘটনাটি নিজেই প্রমাণ করে, এতে আপত্তির কিছু ছিল না। আসলে এটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কোমল রসবোধ আর বাড়ির বয়স্ক মানুষদের প্রতি তাঁর স্নেহের একটি ছোট্ট ছবি।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
একজন বেগানা নারী কি পা টিপে দিতে পারেন?
এখানে কেউ কেউ বলেন, পর্দার বিধান অনুযায়ী এটা ঠিক হয়নি। চলুন দেখি, মহানবী (সা.)-এর জীবনে এমন ঘটনা আছে কি না। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন:
এই হাদীস নিয়ে আলেমরা নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু কোনো মুসলমান এর ভিত্তিতে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। সবাই বোঝেন, প্রসঙ্গ, সম্পর্ক আর পরিবেশ দেখে ঘটনার বিচার করতে হয়। সেই একই ন্যায্যতা এখানেও প্রাপ্য: একজন অতি বৃদ্ধা, বহু বছরের পুরোনো গৃহকর্মী, পরিবারের উপস্থিতিতে, শীতের রাতে লেপের উপর দিয়ে সেবা করতে বসেছিলেন।
তাহলে এমন ঘটনা বইয়ে লেখা হলো কেন?
কারণ সীরাতুল মাহদী হলো হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর জীবনের ছোট-বড় সব ঘটনার সরল সংকলন। যাঁরা কিছু লুকানোর প্রয়োজন বোধ করেন, তাঁরা এমন ঘটনা ছাপেন না। খোলা মনে সব ঘটনা লিপিবদ্ধ করাই প্রমাণ করে, তাঁদের কাছে এতে লুকানোর মতো কিছু ছিল না।
নবী-সংস্কারকদের ঘরোয়া জীবনের এমন খুঁটিনাটি কেন লেখা হয়?
কেউ কেউ ভাবেন, একজন ধর্মীয় নেতার জীবনী মানে শুধু বড় বড় ঘটনা। কিন্তু হাদীসের ভাণ্ডার দেখুন। সেখানে মহানবী (সা.)-এর ঘরোয়া জীবনের অসংখ্য ছোট ঘটনা যত্ন করে সংরক্ষিত আছে। হযরত আসওয়াদ (রহ.) একবার হযরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, মহানবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন:
এই ছোট ছোট বর্ণনাই আমাদের দেখায়, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ঘরের ভেতরে কেমন মানুষ ছিলেন। সীরাতুল মাহদীও একই কাজ করেছে। ভানুর গল্পে আমরা দেখি একটি সরল, স্নেহময় পরিবার: এক বৃদ্ধা কর্মী, যিনি ভক্তিতে সেবা করতে চান; আর একজন গৃহকর্তা, যিনি তাঁর ভুল দেখে বকা না দিয়ে মৃদু রসিকতা করেন। গল্পটির আসল শিক্ষা হলো কোমলতা আর বয়স্কদের প্রতি সম্মান।
তাই এই আপত্তির শিক্ষা আমাদের সবার জন্য। কারও জীবনের কোনো ঘটনা শুনলে আগে দেখতে হবে, পুরো বর্ণনাটি কী, কে বর্ণনা করেছেন, আর কোন পরিবেশে ঘটেছে। এখানে পুরো বর্ণনা পড়লে একটি নির্দোষ, মিষ্টি পারিবারিক স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সেই স্মৃতিকে বিকৃত করে অভিযোগ বানানো সত্যের প্রতি অবিচার। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, অপবাদ শুনলে মুমিনের প্রথম কাজ ভালো ধারণা পোষণ করা (সূরা আন-নূর ২৪:১৩)। পুরো বর্ণনা সামনে থাকলে ভালো ধারণা পোষণ করা তো আরও সহজ।
সংক্ষেপে
- সীরাতুল মাহদীর বর্ণনাটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর স্ত্রী হযরত নুসরত জাহান বেগম (রা.) নিজে একটি হাসির ঘটনা হিসেবে বলেছিলেন।
- ভানু ছিলেন অতি বৃদ্ধা, ধার্মিক গৃহকর্মী, যিনি লেপের উপর দিয়ে খাটের কাঠকে পা ভেবে টিপছিলেন।
- অর্ধেক উদ্ধৃতি দিয়ে ঘটনাটিকে বিকৃত করা হয়েছে; পুরো বর্ণনায় আপত্তির কিছু নেই।
- প্রসঙ্গ দেখে বিচারের যে ন্যায্যতা আমরা সহীহ বুখারীর ৭০০১ নম্বর হাদীসের ক্ষেত্রে করি, এখানেও সেটিই প্রযোজ্য।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.