একদিন এক সাহাবী হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে এসে জানতে চাইলেন, মহানবী (সা.)-এর চরিত্র কেমন ছিল। উম্মুল মু'মিনীন পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি কুরআন পড়ো না?” তিনি বললেন, “অবশ্যই পড়ি।” তখন তিনি বললেন:
কুরআন একটি কিতাব, আর মহানবী (সা.) একজন মানুষ। তবু তাঁর জীবনকে বলা হলো “কুরআন”। কারণ কুরআনের শিক্ষা তাঁর জীবনে পুরোপুরি ফুটে উঠেছিল। মানুষকে কুরআনের সঙ্গে তুলনা করা তাই নতুন কিছু নয়। এই কথা মনে রেখে আমরা একটি আপত্তির দিকে যাই।
আপত্তি ও পুরো ইলহাম
একটি আপত্তি হলো, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইলহাম আছে, যার অর্থ: “আমি তো কুরআনের মতোই।” আপত্তিকারীরা বলেন, এভাবে তিনি নিজেকে কুরআনের সমপর্যায়ে দাঁড় করিয়েছেন।
কিন্তু ইলহামটি এখানেই শেষ নয়। পুরো বাক্যটি হলো: মা আনা ইল্লা কাল-কুরআনি, ওয়া সাইয়াযহারু আলা ইয়াদাইয়া মা যাহারা মিনাল ফুরকান। আহমদীয়া জামাতের প্রকাশিত “তাযকিরা”-র ইংরেজি সংস্করণে এর অনুবাদ এভাবে আছে:
“আমি তো কুরআনেরই মতো, আর শীঘ্রই আমার মাধ্যমে তা প্রকাশিত হবে, যা ফুরকানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।” (Tadhkirah, ইংরেজি সংস্করণ, পৃ. ৯১৯; মূল সূত্র: বদর, ২০ সেপ্টেম্বর ১৯০৬, পৃ. ৩ এবং আল-হাকাম, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯০৬, পৃ. ১)
তাযকিরায় এই ইলহামটি একই সময়ের আরও কয়েকটি ইলহামের সঙ্গে ক্রমিক নম্বর দিয়ে লেখা আছে। তার আগের ইলহামগুলোর একটির অর্থ: “আল্লাহ তোমার দোয়া শুনেছেন… আল্লাহ মুত্তাকী ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।” আরেকটির অর্থ: “আল্লাহ তোমার ইলহাম, ওহী ও স্বপ্নে বরকত রেখেছেন।” পুরো পাতাটি পড়লে বোঝা যায়, এটি দোয়া কবুল ও আল্লাহর সাহায্যের সুসংবাদের ধারাবাহিকতা; কোনো নতুন শরীয়তের ঘোষণা নয়।
লক্ষ করুন, “কুরআনের মতো” কথাটির ব্যাখ্যা ইলহামের ভেতরেই আছে। কোন দিক থেকে মতো? এই দিক থেকে যে, কুরআন যা প্রকাশ করেছিল, তাঁর হাতে আবার তা-ই প্রকাশিত হবে। নতুন কিছু নয়, কুরআনেরই জিনিস।
ফুরকান কী প্রকাশ করেছিল
“ফুরকান” কুরআনেরই একটি নাম। শব্দটির অর্থ, যা সত্য আর মিথ্যাকে আলাদা করে দেয়। কুরআন বলছে:
কুরআন নাযিলের সময় কী ঘটেছিল? মূর্তিপূজার অন্ধকারে ডুবে থাকা একটি জাতি এক আল্লাহকে চিনল। মিথ্যা বিশ্বাস ভেঙে পড়ল। জীবন্ত নিদর্শন দেখে মানুষের ঈমান সাহাবীদের মতো দৃঢ় হলো।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সূরা আল-জুমুআর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, শেষ যুগে আল্লাহ এমন একটি দল তৈরি করবেন যারা সাহাবীদের মতো নিদর্শন দেখবে, এবং তাদের ইমাম হবেন মহানবী (সা.)-এর “যিল্ল” বা আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি (জুমুআর খুতবা, ২৪ মার্চ ২০২৩, alislam.org-এ উদ্ধৃত)। অর্থাৎ যা একদিন কুরআনের মাধ্যমে ঘটেছিল, তা আবার কুরআনেরই মাধ্যমে, তাঁর হাতে ঘটবে। ইলহামটি ঠিক এই কথাই বলছে।
তাঁর সারাজীবন এরই সাক্ষী। তিনি কুরআন থেকে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, খ্রিস্টান পাদ্রী আর আর্য সমাজের আক্রমণের জবাব দিয়েছেন কুরআনের যুক্তিতে, আর তাঁর জামাতকে শিখিয়েছেন: যা কুরআনের অনুকূল তা গ্রহণ করো, যা কুরআনের বিরোধী তা বর্জন করো।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কুরআনের মতো বলা মানেই কি কুরআনের সমকক্ষ হওয়ার দাবি নয়?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, “মতো” শব্দেই সমতার দাবি লুকিয়ে আছে। চলুন দেখি। হযরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর চরিত্রকে “কুরআন” বলেছেন; কেউ এর অর্থ করেননি যে মহানবী (সা.) কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী। কোনো কিছুর “মতো” হওয়া মানে কোনো একটি দিকে মিল থাকা, সব দিকে সমান হওয়া নয়। আর এই ইলহাম নিজেই দিকটি বলে দিয়েছে: কুরআন যা প্রকাশ করেছে, তা প্রকাশ পাওয়া।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) “কিশতিয়ে নূহ”-এ লিখেছেন, কুরআন এক সপ্তাহে মানুষকে পবিত্র করতে পারে, এবং মানুষকে নবীদের মতো বানাতে পারে, যদি সে নিজে কুরআন থেকে পালিয়ে না যায় (Noah's Ark, alislam.org)। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে কুরআনের ছাঁচে গড়ে ওঠাই মু'মিনের লক্ষ্য। যে মানুষ পুরোপুরি কুরআনের ছাঁচে গড়ে ওঠেন, তিনি “কুরআনের মতো” হন।
“তিনি কি এর মাধ্যমে নতুন কোনো কিতাব বা বিধান দাবি করেছেন?”
না। ইলহামের শব্দই বলে, “যা ফুরকানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল”, অর্থাৎ পুরনো, প্রতিষ্ঠিত জিনিস। “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি লিখেছেন, আকাশের নিচে কুরআন ছাড়া আর কোনো কিতাব নেই যা সরাসরি মানুষকে পথ দেখাতে পারে। যিনি এ কথা বলেন, তিনি কুরআনের পাশে আরেকটি কিতাব দাঁড় করাতে পারেন না। “এক গলতী কা ইযালা” পুস্তিকায়ও তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, তিনি কোনো নতুন শরীয়ত নিয়ে আসেননি, আর যা পেয়েছেন তা মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমেই পেয়েছেন (A Misconception Removed, পৃ. ১০, alislam.org)।
“আপত্তিতে শুধু প্রথম অংশ তোলা হলে ক্ষতি কী?”
ক্ষতি অনেক। কেউ যদি কুরআন থেকে শুধু “নামাযের কাছে যেয়ো না” তুলে ধরেন, আর “যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত” অংশটি বাদ দেন, তাহলে অর্থ উল্টে যায়। একইভাবে এই ইলহামের দ্বিতীয় অংশ বাদ দিলে এর আসল বার্তা হারিয়ে যায়। ন্যায়বিচার দাবি করে, পুরো বাক্য পড়ে তারপর রায় দেওয়া হোক।
সিদ্ধান্ত: এই ইলহাম কুরআনের ওপর দাবি নয়, কুরআনের সেবার ঘোষণা। কুরআন যা একদিন দেখিয়েছিল, আল্লাহ তা আবার দেখাবেন, এবং দেখিয়েছেন।
সংক্ষেপে
- পুরো ইলহাম: “আমি তো কুরআনেরই মতো, আর শীঘ্রই আমার মাধ্যমে তা প্রকাশিত হবে, যা ফুরকানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।” (তাযকিরা, ইংরেজি, পৃ. ৯১৯)
- দ্বিতীয় অংশই বলে দেয় মিলটি কোথায়: কুরআনের শিক্ষা ও নিদর্শন আবার প্রকাশিত হওয়া।
- হযরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর চরিত্রকেও “কুরআন” বলেছেন; এমন তুলনা সমকক্ষতার দাবি নয়।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআনকে একমাত্র পথনির্দেশক কিতাব বলেছেন; তাই এই আপত্তি ভিত্তিহীন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Tadhkirah (English, PDF) · alislam.org
- Noah's Ark: Our Teaching · alislam.org
- The Promised Messiah and Mahdi (as), Friday Sermon 24 March 2023 · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.