কাশ্মীরের এক আহলে হাদীস ভদ্রলোক তাঁর এক মৌলভী বন্ধুকে প্রায়ই বলতেন, “আমরা নিজেদের খাঁটি একত্ববাদী মনে করি, কিন্তু হয়তো এমন এক দল আসবে, যারা আমাদেরও মুশরিক বলবে।” পরে তিনি বলতেন, ঠিক তা-ই হয়েছে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈসা (আ.) পাখি সৃষ্টি করতেন। হুঁশ ফিরল হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর দুটি কবিতার লাইন শুনে: “সব পাখির সত্যিকার খোদা তো তিনিই… হে মৌলভী, এটাই কি তওহীদ? সত্যি বলো, তুমি কোন উপাস্যের অনুসারী?” (সীরাতুল মাহদী, ২য় খণ্ড, বর্ণনা ১২২৯; ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের জুমুআর খুতবায় উদ্ধৃত)
এই গল্পেই এই আলোচনার আসল কেন্দ্রবিন্দু লুকিয়ে আছে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, ঈসা (আ.)-এর মাটির পাখি তৈরির মুজেযার ব্যাখ্যায় মির্যা সাহেব নানা “অদ্ভুত” কথা বলেছেন: কখনো একে কলের খেলনার মতো কিছু বলেছেন, কখনো বলেছেন মাটির পাখি মানে নিরক্ষর সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রশ্ন, এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে ঐশী জ্ঞানের কী সম্পর্ক?
আয়াতটি কী বলে?
এখন একই কুরআনের আরেকটি আয়াত পড়ুন:
আর আরেকটি আয়াত বলে, আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকা হয়, তারা সবাই মিলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৪)
তাহলে ঈসা (আ.) যদি সত্যিই মাটি থেকে জীবন্ত পাখি বানাতেন, তাহলে পৃথিবীতে কিছু পাখি আল্লাহর সৃষ্টি আর কিছু ঈসা (আ.)-এর সৃষ্টি হতো। ঠিক এই “একাকার হয়ে যাওয়া”-কেই কুরআন শিরক বলেছে।
সমস্যাটি পুরোনো, সমাধানও
এই কারণে পূর্ববর্তী তফসীরকারকরাও আক্ষরিক অর্থ নিয়ে স্বস্তিতে ছিলেন না। যেমন তফসীরে জালালাইন-এ আছে, ঈসা (আ.) বাদুড়ের আকৃতি বানিয়েছিলেন; মানুষ যতক্ষণ দেখত, তা উড়ত, আর চোখের আড়াল হলেই মরে পড়ে যেত। (জালালাইন, মাতবায়ে মুজতাবাঈ, পৃষ্ঠা ৪৯) অর্থাৎ তাঁরাও মানতেন, এটি স্থায়ী সত্যিকারের সৃষ্টি ছিল না।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সমস্যার মূলে গিয়ে স্পষ্ট করে লিখেছেন:
“এখন পরিষ্কার হোক যে, কিছু পাখি আল্লাহর সৃষ্টি আর কিছু ঈসার, এই ধারণা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও শিরকপূর্ণ।” (ইযালায়ে আওহাম, ছোট সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৯৮)
এরপর তিনি আয়াতটির দুটি সম্ভাব্য অর্থ দেখিয়েছেন। একটি বাহ্যিক: সেকালে ইহুদিদের মধ্যে নানা কৌশলী বিদ্যার চর্চা ছিল; আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে এমন জ্ঞান দিতে পারেন, যাতে মাটির তৈরি একটি আকৃতি কোনো কৌশলে পাখির মতো উড়ত বা চলত। (ইযালায়ে আওহাম, ৩য় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১২৫, টীকা) অন্যটি আধ্যাত্মিক: কুরআনে বহু জায়গায় রূপক ভাষা আছে, তাই “মাটির পাখি” মানে সেই নিরক্ষর সাধারণ মানুষ, যাদের ঈসা (আ.) সঙ্গী বানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে হিদায়াতের রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন, আর তারা আধ্যাত্মিক আকাশে উড়তে শুরু করেছিল। (ইযালায়ে আওহাম, ৩য় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১২৫–১২৬)
আলইসলাম ডট অর্গও এই দ্বিতীয় অর্থটিকেই তুলে ধরে: যারা ঈসা (আ.)-এর শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, সেই সাধারণ মানুষগুলো আধ্যাত্মিকভাবে রূপান্তরিত হয়ে দুনিয়ার তুচ্ছতা ছাড়িয়ে উঁচু আকাশে উড়তে থাকা পাখির মতো হয়েছিল।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“আল্লাহর আদেশে” বলা আছে, তাহলে সৃষ্টি করলে সমস্যা কী?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতে তো “আল্লাহর আদেশে” আছে, তাই এটি শিরক নয়। চলুন দেখি। খ্রিস্টানরাও বলে, ঈসা (আ.) পিতার অনুমতিতেই সব করতেন; তবু তারা তাঁকে উপাস্য বানিয়েছে। সূরা রা’দের আয়াত “অনুমতি” আছে কি নেই, সে প্রশ্ন তোলেনি; বলেছে, আল্লাহর সৃষ্টির অনুরূপ সৃষ্টি অন্য কেউ করলে সৃষ্টি একাকার হয়ে যায়, আর সেটাই শিরক। “স্রষ্টা” গুণে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর আদেশে নবী নিদর্শন দেখান, কিন্তু প্রাণ সৃষ্টির কাজ আল্লাহ কাউকে দেন না।
তাহলে কি তিনি ঈসা (আ.)-এর মুজেযা অস্বীকার করেছেন?
না। তিনি নিজেই লিখেছেন: “বিরোধীরা বলে, এই ব্যক্তি মসীহের পাখি সৃষ্টি ও মৃতকে জীবিত করা মানে না। আমার উত্তর হলো, আমি মসীহের মুজেযা হিসেবে জীবিত করা ও সৃষ্টি করা মানি; কিন্তু এ কথা মানি না যে তিনি খোদার মতো মৃতকে জীবিত করেছেন বা সত্যিকারের পাখি সৃষ্টি করেছেন।” তিনি মূসা (আ.)-এর লাঠির উদাহরণ দিয়েছেন: তা সাপের মতো চলত, কিন্তু নিজের আসল অবস্থা কখনো চিরতরে ছেড়ে দেয়নি। (হামামাতুল বুশরা, পৃষ্ঠা ৯০)
আধ্যাত্মিক অর্থ কি জোর করে চাপানো ব্যাখ্যা নয়?
কুরআন নিজেই “জীবন দেওয়া” শব্দটি আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যবহার করে। মহানবী (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
মহানবী (সা.) যদি মানুষকে “জীবিত” করেন আধ্যাত্মিক অর্থে, তাহলে ঈসা (আ.)-এর “পাখি” ও “জীবন দান”-কেও সেই অর্থে বোঝা কুরআনের নিজের ভাষারই অনুসরণ। আলইসলামের Study of Islam গ্রন্থও বলে, এই পাখিরা আসলে মানুষ, যাদের আধ্যাত্মিক উড়ানের শক্তি দেওয়া হয়েছিল।
সংক্ষেপে
- কুরআন বলে, আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা; অন্য কেউ তাঁর মতো সৃষ্টি করলে সৃষ্টি একাকার হয়ে যায়, যা শিরক।
- পূর্ববর্তী তফসীরকারকরাও আক্ষরিক অর্থে স্থায়ী জীবন্ত পাখি মানেননি।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মুজেযা মেনেছেন, কিন্তু ঈসা (আ.)-কে স্রষ্টা বানানো প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক দুই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
- এই ব্যাখ্যা “অদ্ভুত” নয়; এটি তওহীদ রক্ষার জন্য কুরআনের ভাষা থেকেই নেওয়া।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Jesus Son of Mary · alislam.org
- Study of Islam: Prophets · alislam.org
- Truth Prevails, Chapter VII · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.