রমযানের রাত। মসজিদে তারাবীর নামায চলছে। হাফেয সাহেব মুখস্থ কুরআন পড়ছেন। হঠাৎ একটি আয়াত বাদ পড়ে গেল, বা এক জায়গার শব্দ আরেক জায়গায় চলে গেল। পেছন থেকে কেউ লুকমা দিলেন, হাফেয সাহেব শুধরে নিলেন।
এই দৃশ্য আমাদের সবার চেনা। কেউ কি সেদিন বলেন, হাফেয সাহেব কুরআন বিকৃত করছেন? না। সবাই বোঝেন, এটি মানুষের ভুলে যাওয়া, ইচ্ছাকৃত কিছু নয়। আজকের আপত্তিটি বুঝতে এই সহজ কথাটি মনে রাখা দরকার।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর শাহাদাতুল কুরআন পুস্তকে শেষ যুগের খলীফাদের সম্পর্কে হাদীসের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, সেই খলীফা সম্পর্কে আসমান থেকে ডাক আসবে: “হাযা খলীফাতুল্লাহিল মাহদী”, অর্থাৎ “ইনি আল্লাহর খলীফা মাহদী।” সেখানে তিনি এসব হাদীসকে বুখারীর হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিরোধীরা বলেন, এই শব্দগুলো সহীহ বুখারীতে নেই। তাদের দাবি, নিজের দাবিকে মজবুত করতে তিনি বুখারীর নামে এমন কথা চালিয়েছেন যা বুখারীতে নেই।
“খলীফাতুল্লাহিল মাহদী” কথাটি কারো মনগড়া নয়। হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয় কিতাবের একটি, সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে মহানবী (সা.) পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকার আগমনের কথা বলার পর বলেছেন:
তাহলে বিষয়বস্তু সঠিক, শব্দগুলোও হাদীসের ভাণ্ডারে আছে। প্রশ্ন শুধু এটুকু: কিতাবের নাম উল্লেখে ভুল হয়েছে কি না।
তিনি নিজেই জানতেন, বুখারী-মুসলিম মাহদীর হাদীস কী চোখে দেখেছে
যিনি ইচ্ছা করে বুখারীর নাম ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দিতে চান, তিনি মাহদী সম্পর্কিত হাদীসকে সবচেয়ে মজবুত বলে প্রচার করবেন। কিন্তু হযরত মসীহ মওউদ (আ.) করেছেন উল্টোটা।
তাঁর হাকীকাতুল মাহদী পুস্তকে (alislam.org-এ “The True Nature of the Mahdi” নামে প্রকাশিত) তিনি পরিষ্কার লিখেছেন, মাহদীর আগমন সম্পর্কে যত রকম হাদীস আছে, সেগুলো সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বা বিশুদ্ধ নয়। তিনি সেগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: কিছু বানানো, কিছু দুর্বল বা পরস্পরবিরোধী, আর কিছু বিশুদ্ধ, যেগুলো কেবল একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত মাহদীর সুসংবাদ দেয়, যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা নয়।
যিনি নিজে মাহদীর হাদীসের দুর্বলতা নিয়ে এত খোলাখুলি লিখেছেন, তিনি একই বিষয়ে বুখারীর নাম জাল করবেন, এটি যুক্তিতে টেকে না। অতএব এখানে যা ঘটেছে তা লেখার সময়ের স্মৃতিভ্রম বা কলমের ভুল, উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা নয়।
নবীরাও মানুষ, তাঁরাও ভুলে যান
কেউ বলতে পারেন, আল্লাহর প্রেরিত ব্যক্তির কি ভুল হতে পারে? কুরআন নিজেই এর উত্তর দেয়। হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
লক্ষ করুন, আল্লাহ নিজেই বলছেন ভুলটি ছিল ভুলে যাওয়া, ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা নয়। হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীর ঘটনাতেও একই কথা:
সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহানবী (সা.) নিজে। একবার তিনি চার রাকাতের নামায দুই রাকাতে শেষ করে সালাম ফেরালেন। যুল ইয়াদাইন নামে এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, নামায কি কমে গেছে, নাকি আপনি ভুলে গেছেন? তিনি বললেন, “আমি ভুলিনি, নামাযও কমেনি।” সাহাবী বললেন, “না, আপনি ভুলেছেন।” তখন তিনি বাকি নামায পড়ে নিলেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২২৯)।
আরেকবার নামাযে ভুল হওয়ার পর তিনি নিজেই বললেন:
এসব ঘটনায় কোনো মুসলমান নবীদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। কারণ নবুয়তের প্রমাণ হলো তাঁর শিক্ষা, তাঁর জীবন আর আল্লাহর সাহায্য; মানুষ হিসেবে কখনো কিছু ভুলে না যাওয়া নয়। তাহলে মহানবী (সা.)-এর একজন সেবকের লেখায় একটি কিতাবের নাম উল্লেখে ভুলকে “মিথ্যা” বলা ন্যায়সঙ্গত নয়।
শেষ কথা: যে মাপকাঠিতে এই আপত্তি তোলা হয়, সেই মাপকাঠি আদম (আ.), মূসা (আ.) আর মহানবী (সা.)-এর ওপর চালানো যায় না। তাই এটি ন্যায়ের মাপকাঠিও নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“ইবনে মাজাহর এই হাদীসকে তো অনেক মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন”
হ্যাঁ, এই বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদীস বিশারদদের মধ্যে আলোচনা আছে। কিন্তু লক্ষ করুন, এটি আমাদের কথাকেই মজবুত করে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজের দাবির ভিত্তি এই একটি বর্ণনার ওপর রাখেননি। উল্টো তিনি নিজেই লিখেছেন, মাহদী সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়।
তাঁর দাবির ভিত্তি ছিল কুরআন, মহানবী (সা.)-এর নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী, যুগের প্রয়োজন আর আল্লাহর নিদর্শন। যে উদ্ধৃতির ওপর দাবি দাঁড়িয়েই নেই, সেখানে কিতাবের নামে ভুলকে “দাবি মজবুত করার কৌশল” বলা যায় না।
“আল্লাহর প্রেরিত হলে তাঁর লেখায় ভুল থাকবে কেন?”
কারণ আল্লাহর প্রেরিতরা মানুষ, ফেরেশতা নন। কুরআন মহানবী (সা.)-কে দিয়েই এ কথা ঘোষণা করিয়েছে:
ওহী নির্ভুল, কারণ তা আল্লাহর। কিন্তু ওহীর বাইরে একজন মানুষ হিসেবে লেখা, স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া, কিতাবের নাম মনে রাখা, এসবে মানবীয় ভুল হতে পারে। মহানবী (সা.)-এর নামাযের ঘটনা সেটিই দেখায়। নবীর সত্যতা মাপা হয় তাঁর বাণী আর আল্লাহর সাহায্য দিয়ে, স্মৃতির নির্ভুলতা দিয়ে নয়।
“তাহলে কি যেকোনো ভুলকে ‘স্মৃতিভ্রম’ বলে পার পাওয়া যাবে?”
না। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা আর ভুলের পার্থক্য বোঝা যায় উদ্দেশ্য আর পরিপ্রেক্ষিত দেখে। এখানে উদ্ধৃত শব্দগুলো হাদীসের ভাণ্ডারেই আছে, লেখক নিজে মাহদীর হাদীসের দুর্বলতা নিয়ে খোলাখুলি লিখেছেন, আর তাঁর দাবি এই উদ্ধৃতির ওপর দাঁড়িয়েও নেই। ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির কোনো লক্ষণ এখানে নেই। তাই এটি সরল ভুল, আর সরল ভুলকে মিথ্যা বলা ন্যায় নয়।
সংক্ষেপে
- “খলীফাতুল্লাহিল মাহদী” শব্দগুলো মনগড়া নয়; সুনানে ইবনে মাজাহর হাদীস ৪০৮৪-তে এগুলো আছে।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই লিখেছেন, মাহদী সম্পর্কিত হাদীস সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়; তাই বুখারীর নাম ইচ্ছা করে ব্যবহারের কোনো কারণ ছিল না।
- কিতাবের নাম উল্লেখে ভুল মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিভ্রম।
- কুরআন ও বুখারী সাক্ষী, আদম (আ.), মূসা (আ.) ও মহানবী (সা.)-ও ভুলে গেছেন; এতে তাঁদের সত্যতা কমেনি।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.