একজন মানুষ কোনো কিছুর নাম জানেন না, কিন্তু জিনিসটি তাঁর হাতে আছে। প্রথমে তিনি সেটিকে চেনা একটি নামে ডাকেন। পরে যখন বোঝেন, নামটি জিনিসটির পুরো পরিচয় দেয় না, তখন সঠিক নামটি গ্রহণ করেন। জিনিসটি বদলায়নি; বদলেছে নাম বোঝার গভীরতা।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নবুওয়ত বিষয়ক লেখাগুলো বুঝতে এই ছোট উদাহরণটি মনে রাখা দরকার।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে তিনি নিজেকে “মুহাদ্দাস” বলেছেন এবং নবী হওয়া অস্বীকার করেছেন। আবার ১৯০১ সালের পুস্তিকা এক গলতী কা ইযালা-য় নবী হওয়ার দাবি করেছেন এবং “শুধু মুহাদ্দাস” পরিচয় অস্বীকার করেছেন। তাই তাঁদের মতে, তাঁর নিজের কথাতেই তিনি মুহাদ্দাসও নন, নবীও নন।
“মুহাদ্দাস” মানে এমন ব্যক্তি, যার সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেন, যদিও তিনি নবী নন। মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের আগের উম্মতগুলোতে মুহাদ্দাস ছিলেন; আমার উম্মতে যদি কেউ থাকেন, তিনি উমর।” (সহীহ বুখারী, কিতাবু ফাযাইলি আসহাবিন নবী, হাদীস ৩৬৮৯)
দাবি একটিই ছিল, বদলেছে শুধু নাম
বারাহীনে আহমদীয়া থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবির সারকথা ছিল একটিই: আল্লাহ তাঁর সঙ্গে প্রচুর কথা বলেন, আর অদৃশ্যের বহু খবর তাঁকে জানান। ওহীতে আল্লাহ তাঁকে “নবী” ও “রসূল” বলেও সম্বোধন করেছিলেন।
কিন্তু শুরুর দিকে তিনি নবুওয়তের সেই সংজ্ঞাই মানতেন, যা তখন মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তিনি নিজেই সেই সংজ্ঞা লিখেছেন: ইসলামের পরিভাষায় নবী বা রসূল তিনি, যিনি নতুন শরীয়ত আনেন, বা আগের শরীয়তের কিছু অংশ রহিত করেন, বা আগের কোনো নবীর উম্মত নন এবং কোনো নবীর মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। (মাকতুবাত, ১৭ আগস্ট ১৮৯৯)
এই সংজ্ঞা তাঁর ওপর খাটে না। তিনি তো মহানবী (সা.)-এর উম্মতি, আর কুরআনের বাইরে কোনো শরীয়ত তাঁর নেই। তাই বিনয়ের সঙ্গে তিনি ওহীর “নবী” শব্দটিকে রূপক অর্থে নিতেন এবং নিজেকে মুহাদ্দাস বলতেন। এমনকি তিনি মুসলমান ভাইদের অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর লেখায় “নবী” শব্দ খারাপ লাগলে সেখানে “মুহাদ্দাস” পড়ে নিতে, কারণ তিনি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ চান না। (ইশতেহারাত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৭)
তারপর ওহী বৃষ্টির মতো নামল
পরে কী হলো, তা তিনি নিজেই বলেছেন:
“পরবর্তীতে আল্লাহর ওহী বৃষ্টির মতো আমার ওপর নাযিল হলো। তা আমাকে আগের বিশ্বাসে থাকতে দিল না, আর স্পষ্টভাবে আমাকে নবী উপাধি দেওয়া হলো; তবে এভাবে যে, এক দিক থেকে নবী আর এক দিক থেকে উম্মতি।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৪৯–১৫০)
তিনি বুঝলেন, প্রচলিত সংজ্ঞায় একটি ভুল ছিল। নবী হওয়ার জন্য নতুন শরীয়ত আনা বা উম্মতি না হওয়া জরুরি নয়। কুরআন নিজেই নবুওয়তের মূল বৈশিষ্ট্য বলে দিয়েছে:
অদৃশ্যের খবর “বহুল পরিমাণে” পাওয়া: এটাই রসূলের চিহ্ন। তাই ১৯০১ সালের পর তিনি লিখলেন: “আমি যতদূর দেখি, নবী শুধু তিনিই, যার ওপর আল্লাহর বাণী সন্দেহাতীতভাবে এবং প্রচুর পরিমাণে নাযিল হয়, যাতে অদৃশ্যের জ্ঞান থাকে। এভাবেই আল্লাহ আমার নাম নবী রেখেছেন।” (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, পৃষ্ঠা ২৬)
“এক গলতী কা ইযালা” আসলে কী বলে?
এবার আপত্তির দ্বিতীয় বইটি খুলি। সেখানে তিনি লিখেছেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে অদৃশ্যের খবর পায়, তাকে যদি নবী বলা না হয়, তাহলে বলুন, তাকে কী নামে ডাকা হবে? যদি বলেন, তাকে মুহাদ্দাস বলা উচিত, তাহলে আমি বলব, কোনো অভিধানেই ‘তাহদীস’-এর অর্থ অদৃশ্য প্রকাশ করা নয়।”
লক্ষ করুন, এখানে তিনি “আমি মুহাদ্দাস নই” বলেননি। তিনি বলেছেন, শুধু “মুহাদ্দাস” নামটি তাঁর অবস্থার পুরো বর্ণনা দেয় না। প্রতিটি নবীর সঙ্গেই আল্লাহ কথা বলেন; তাই নবী মুহাদ্দাসের চেয়ে ছোট নন, বড়। বড় পরিচয় পেলে ছোট পরিচয়টি মিথ্যা হয়ে যায় না, শুধু অপূর্ণ প্রমাণিত হয়।
আর একই পুস্তিকায় তিনি সীমারেখাও টেনে দিয়েছেন: “যেখানে যেখানে আমি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছি, তা শুধু এই অর্থে যে আমি স্বতন্ত্র শরীয়ত আনিনি এবং আমি স্বতন্ত্র নবীও নই।”
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
অবস্থান বদলানো কি দুর্বলতার লক্ষণ নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, সত্যিকারের নবী শুরু থেকেই নিজের পদ জানেন। চলুন দেখি তিনি নিজে কী বলেছেন: “আমার কথায় কোনো বিরোধ নেই; আমি শুধু আল্লাহর ওহীর অনুসরণ করি। যতক্ষণ এই জ্ঞান আসেনি, ততক্ষণ আগের কথাই বলেছি; জ্ঞান আসার পর ভিন্ন কথা বলেছি। আমি একজন মানুষ মাত্র, অদৃশ্যের জ্ঞানী হওয়ার দাবি করি না।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৪৮–১৫০)
আল্লাহ যা জানান, নবী তা-ই জানেন। ধাপে ধাপে জানানো আল্লাহর সুন্নত। দাবি বদলায়নি; বদলেছে শুধু সেই দাবির সঠিক নাম বোঝা।
মুহাদ্দাস তো উম্মতে অনেকেই ছিলেন, তিনি আলাদা কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি হাকীকাতুল ওহী-তে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, অদৃশ্যের খবরের প্রাচুর্যে গত তেরোশো বছরে এই উম্মতের কোনো ওলী, আবদাল বা কুতুবকে যা দেওয়া হয়নি, তা তাঁকে দেওয়া হয়েছে; এই কারণেই শুধু তাঁকে নবী নামের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ৩৯০–৩৯১) মুহাদ্দাস আর নবীর পার্থক্য ওহীর পরিমাণ ও স্পষ্টতায়, শরীয়তে নয়।
তাহলে কি খাতামান্নাবিয়্যীনের পর নবী আসতে পারে?
নতুন শরীয়তের নবী বা স্বতন্ত্র নবী আসতে পারে না: এ বিষয়ে তিনি দৃঢ় ছিলেন। তাঁর ভাষায়: “এখন মুহাম্মদী নবুওয়ত ছাড়া সব নবুওয়ত বন্ধ। শরীয়তবিহীন নবীও আসতে পারবে না, শুধু সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে প্রথমে উম্মতি।” (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, পৃষ্ঠা ২৫) অর্থাৎ যে নবুওয়ত মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে জন্ম নেয়, তা তাঁর মোহরের ভেতরেই থাকে, বাইরে নয়।
সংক্ষেপে
- তাঁর দাবির সারকথা সব সময় এক ছিল: আল্লাহ তাঁর সঙ্গে প্রচুর কথা বলেন এবং অদৃশ্যের খবর জানান।
- প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি শুরুতে বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে মুহাদ্দাস বলতেন; ওহীর ধারাবাহিক প্রমাণে পরে সংজ্ঞাটি সংশোধন করেন।
- এক গলতী কা ইযালা-য় তিনি মুহাদ্দাস হওয়া অস্বীকার করেননি; বলেছেন, শুধু এই নাম তাঁর অবস্থার পূর্ণ বর্ণনা নয়।
- তিনি শরীয়তবাহী ও স্বতন্ত্র নবুওয়ত সব সময় অস্বীকার করেছেন; তাই “তিনি কিছুই নন” কথাটি তাঁর লেখা থেকে প্রমাণ হয় না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Truth Prevails, Chapter III · alislam.org
- A Misconception Removed · alislam.org
- Claim of the Promised Messiah · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.