ধরুন, আপনার বাড়ির পাশে একটি নদী আছে। একদিন কেউ বলল, “নদীটা শুকিয়ে গেছে।” আপনি গিয়ে দেখলেন, নদীর খাত ঠিকই আছে, পাড়ও আছে, শুধু পানি নেই। নদী কি তবে আছে, না নেই?
কুরআন নিয়ে যে আপত্তিটি আজ আলোচনা করব, তার উত্তর এই ছোট্ট উদাহরণেই লুকিয়ে আছে।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা রূহানী খাযায়েন ৩ খণ্ডের ৪৯০ পৃষ্ঠার একটি টীকার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করেছেন যে, কুরআনে নাকি বলা আছে ১৮৫৭ সালে কুরআন আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হবে। তাঁদের প্রশ্ন, কুরআন তো আজও আমাদের হাতে, তাহলে এমন কথা কীভাবে বলা যায়?
প্রথমে দেখি, তিনি কোন আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আকাশের পানি, আকাশের বাণী
কুরআনে বহু জায়গায় আকাশ থেকে নামা পানিকে ওহীর উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টি যেমন মরা মাটিকে জীবিত করে, আল্লাহর বাণীও তেমনি মরা হৃদয়কে জীবিত করে। এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তিনি যেমন পানি নামাতে পারেন, তেমনি তা উঠিয়েও নিতে পারেন।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এখানে বাহ্যিক পানির সঙ্গে আধ্যাত্মিক পানির দিকেও ইঙ্গিত দেখেছেন। আর আরবী অক্ষরের সংখ্যামান বা “আবজাদ” হিসাবের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছেন। আবজাদ হলো আরবী বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যামান, যা আমাদের পূর্বসূরি আলেমরাও বহু হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
আয়াতের শেষ অংশ ওয়া ইন্না আলা যাহাবিম বিহী লাকাদিরূন (وَإِنَّا عَلَى ذَهَابٍ بِهِ لَقَادِرُونَ), অর্থাৎ “আমরা উহা উঠিয়ে নিতেও সক্ষম”, এর অক্ষরগুলোর সংখ্যামান যোগ করলে দাঁড়ায় ১২৭৪। হিজরী ১২৭৪ সাল হলো খ্রিস্টীয় ১৮৫৭ সাল। ভারতবর্ষের মুসলমানদের ইতিহাসে এটি গভীর দুর্দশার বছর।
অর্থাৎ তাঁর কথার অর্থ এই নয় যে, কাগজে ছাপা কুরআন হারিয়ে যাবে। বরং কুরআনের প্রকৃত বুঝ, তার উপর আমল, তার আত্মা মানুষের হৃদয় থেকে উঠে যাবে। নদীর খাত থাকবে, পানি থাকবে না।
মহানবী (সা.) নিজেই এমন দিনের কথা বলেছেন
“কুরআন উঠিয়ে নেওয়া হবে”, এই কথা শুনে যাঁরা অবাক হন, তাঁরা হয়তো জানেন না যে মহানবী (সা.) নিজেই এমন একটি সময়ের খবর দিয়েছেন। হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) বর্ণনা করেছেন:
এই হাদীসেই বলা হয়েছে, মানুষ রোযা, নামায, কুরবানি, সদকা কিছুই বুঝবে না। বোঝা যায়, এখানে মূল কথা হলো কুরআনের শিক্ষা আর আমল হারিয়ে যাওয়া।
কুরআনও একটি দীর্ঘ সময়ের কথা বলে:
মহানবী (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের, তারপর যারা তাদের পরে আসবে, তারপর যারা তাদের পরে আসবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৫২)। এই উত্তম যুগগুলোর পর এক হাজার বছর ধরে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ধীরে ধীরে উঠে যাওয়ার ব্যাখ্যা আহমদীয়া সাহিত্যে দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাব হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এসে পৌঁছায়, আর ১৮৫৭ সাল সেই সময়েরই কাছাকাছি।
উঠে যাওয়া বাণী আবার ফিরে আসে
আল্লাহ শুধু উঠিয়ে নেওয়ার কথা বলেননি, রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন:
এই হেফাযতের একটি পথ হলো, অন্ধকার যুগে আল্লাহ এমন সংস্কারক পাঠান, যিনি কুরআনের হারানো বুঝ আবার মানুষের হৃদয়ে ফিরিয়ে আনেন। সহীহ বুখারীতে আছে, ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছেও চলে যায়, তবু পারস্য বংশের কিছু মানুষ বা একজন মানুষ তা ফিরিয়ে আনবেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৮৯৭)।
তাই ১৮৫৭ সালের কথা কুরআনের অবমাননা নয়। এটি মুসলমানদের সেই দুঃসময়ের দিকে ইশারা, যার পর আল্লাহ নিজ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কুরআনের জ্যোতি আবার ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছেন। আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কোন হিসাবে এই সাল বের করেছেন, তা তাঁর সেই টীকাতেই লেখা আছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআন তো হাফেজদের বুকে সংরক্ষিত, তাহলে উঠে যাওয়ার প্রশ্ন কোথায়?
ঠিক কথা, কুরআনের প্রতিটি শব্দ সংরক্ষিত আছে, আর থাকবে। কিন্তু ইবনে মাজাহর যে হাদীসটি আমরা দেখলাম, সেখানেও মানুষ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে, অথচ নামায-রোযা কী জিনিস তা জানবে না। অর্থাৎ শব্দ মুখে থাকবে, বুঝ আর আমল থাকবে না। সহীহ বুখারীর ৪৮৯৭ নম্বর হাদীসও বলে, ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে চলে যাবে, অথচ তখনো কুরআন মানুষের হাতেই থাকবে। তাই “উঠে যাওয়া” আর “শব্দ হারিয়ে যাওয়া” এক জিনিস নয়।
আবজাদ হিসাব দিয়ে কি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?
না, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আবজাদ দিয়ে কোনো বিধান বা আকীদা তৈরি করেননি। তিনি এটিকে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে মিলে যায়। মূল দলিল তো মহানবী (সা.)-এর হাদীস আর মুসলমানদের সেই সময়ের বাস্তব অবস্থা। ইঙ্গিতটি সেই দলিলের পাশে একটি সাক্ষী মাত্র।
এটা কি কুরআনের অবমাননা নয়?
কুরআনের অবমাননা হয় তখন, যখন তার শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়। মুসলমানদের দুর্দশার জন্য কুরআনকে নয়, কুরআন থেকে দূরে সরে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। আর সেই দূরত্ব ঘোচানোর জন্যই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সারা জীবন কুরআনের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।
সংক্ষেপে
- আপত্তির মূলে আছে সূরা আল-মু’মিনূনের আয়াত, যেখানে আল্লাহ আকাশের পানি উঠিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কথা বলেছেন।
- আয়াতের শেষ অংশের আবজাদ মান ১২৭৪, যা খ্রিস্টীয় ১৮৫৭ সাল।
- “উঠিয়ে নেওয়া” মানে কুরআনের প্রকৃত বুঝ ও আমল হারিয়ে যাওয়া; মহানবী (সা.)-ও এমন সময়ের খবর দিয়েছেন (ইবনে মাজাহ ৪০৪৯)।
- আল্লাহ কুরআন রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর সেই রক্ষার জন্যই শেষ যুগে সংস্কারক পাঠানো হয়েছে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.