আপনার দাদার পুরনো চিঠিগুলো বিভিন্ন খাতায়, পত্রিকায়, ডায়েরিতে ছড়িয়ে আছে। তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পর পরিবারের কয়েকজন মিলে সেগুলো এক জায়গায় জড়ো করে একটি বই বানালেন, আর নাম দিলেন “স্মৃতি”। এখন কেউ যদি বলেন, “দাদা নিজের লেখার নাম ‘স্মৃতি’ রেখেছেন,” কথাটি কি ঠিক হবে?
“তাযকিরা” নিয়ে আপত্তিটি অনেকটা এমনই।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর ওপর নাযিল হওয়া ওহীর সংকলনের নাম রেখেছেন “তাযকিরা”, অথচ এটি কুরআনেরই একটি নাম। আপত্তিকারীদের মতে, এভাবে তিনি নিজের ইলহামকে কুরআনের আসনে বসাতে চেয়েছেন।
এই আপত্তির দুটি অংশ। এক, নামটি কে রেখেছেন। দুই, “তাযকিরা” কি সত্যিই শুধু কুরআনের জন্য সংরক্ষিত কোনো নাম। দুটোই যাচাই করা যায়।
সংকলনটি কখন, কে তৈরি করেছেন
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইন্তেকাল করেন ১৯০৮ সালের ২৬ মে, লাহোরে। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর ইলহামগুলো কোনো একক বই আকারে ছাপা হয়নি। সেগুলো ছড়িয়ে ছিল তাঁর বিভিন্ন বইয়ে, বিজ্ঞাপনে, আর “আল-হাকাম” ও “বদর”-এর মতো পত্রিকায়।
“তাযকিরা”-র ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকায় স্পষ্ট লেখা আছে, মূল সংকলনটি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন বই, সাময়িকী ও পত্রিকা থেকে, যেখানে এই উপাদান সমসাময়িকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রথম সংস্করণ তৈরি করেছিল হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি, যা হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) গঠন করেছিলেন, আর বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে। (Tadhkirah, Foreword to the First and Second English Editions, alislam.org)
অর্থাৎ বইটি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ইন্তেকালের প্রায় সাতাশ বছর পরে। যিনি তখন জীবিতই ছিলেন না, তিনি বইটির নাম রেখেছেন, এ কথা বলা যায় না। আপত্তির প্রথম অংশ এখানেই শেষ হয়ে যায়।
ভূমিকায় আরও জানানো হয়েছে, এরপর ১৯৫৬, ১৯৬৯ ও পরবর্তী বছরগুলোতে নতুন নতুন সংস্করণ বেরিয়েছে, আর প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেছেন হযরত চৌধুরী মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান (রা.), যা ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ পুরো কাজটিই পরবর্তী প্রজন্মের সংকলন ও সম্পাদনা।
কুরআনে “তাযকিরা” শব্দটি
এবার দ্বিতীয় অংশ। “তাযকিরা” আরবি শব্দ, অর্থ “স্মারক”, “উপদেশ”, বা “যা মনে করিয়ে দেয়”। কুরআন নিজেকে এই শব্দে বর্ণনা করেছে, তা ঠিক:
কিন্তু একই কুরআন এই শব্দটি অন্য জিনিসের জন্যও ব্যবহার করেছে। নূহ (আ.)-এর যুগে প্লাবনের সময় নৌকায় তুলে রক্ষা করার ঘটনা বলার পর আল্লাহ বলছেন:
আর মানুষ যে আগুন জ্বালায়, তার সম্পর্কে বলছেন:
এই দুই আয়াতের মূল আরবিতে একই শব্দ: “তাযকিরাতান”। নূহের নৌকার ঘটনা আর মানুষের জ্বালানো আগুনকেও আল্লাহ “তাযকিরা” বলেছেন। তাহলে শব্দটি কুরআনের একচেটিয়া নাম হলো কীভাবে? এটি একটি সাধারণ শব্দ, যা যেকোনো শিক্ষণীয় জিনিসের জন্য ব্যবহার হতে পারে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“তবু কুরআনের একটি গুণবাচক নাম নিজের বইয়ে লাগানো কি বেয়াদবি নয়?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, শব্দটি সাধারণ হলেও কুরআনের নাম হিসেবে পরিচিত বলে এটি এড়ানো উচিত ছিল। চলুন দেখি মুসলিম ঐতিহ্য কী বলে। ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর মৃত্যু ও পরকাল বিষয়ক বিখ্যাত বইয়ের নাম “আত-তাযকিরা”। হযরত ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ.)-এর ওলী-আল্লাহদের জীবনী গ্রন্থের নাম “তাযকিরাতুল আউলিয়া”। শত শত বছর ধরে মুসলমানরা এই বইগুলো পড়ছেন, কেউ এগুলোকে কুরআনের অবমাননা বলেননি।
কুরআনের আরও অনেক নাম আছে, যেমন “নূর” (আলো), “হুদা” (হেদায়াত), “যিকর” (স্মরণ)। মুসলমানরা হরহামেশা এসব শব্দ বইয়ের নামে, এমনকি সন্তানের নামে ব্যবহার করেন। সাধারণ শব্দ ব্যবহারে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না কেউ দাবি করেন যে এটি কুরআনের সমান। আহমদীয়া জামাত এমন দাবি কখনো করেনি।
“কুরআন তো একজন রসূলকেও ‘যিকর’ বলেছে; তাহলে নামের মিলে দোষ কোথায়?”
ঠিক তাই। কুরআন নিজে মহানবী (সা.)-কে আল্লাহর পাঠানো “স্মারক” বলেছে:
এখানে “স্মারক” বলতে রসূলকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যা মানুষকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়, কুরআনের ভাষায় তা-ই স্মারক। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ইলহাম মানুষকে কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাই এর সংকলনের নাম “তাযকিরা” রাখা অর্থের দিক থেকে সম্পূর্ণ মানানসই।
“তাযকিরা কি আহমদীদের কাছে কুরআনের মতো শরীয়তের বই?”
না। ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা একে বলে স্বপ্ন, কাশফ ও ইলহামের সংকলন, যার অনেক ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে। আহমদীদের শরীয়ত কুরআন, সুন্নাহ ও কুরআন-অনুকূল হাদীস। “তাযকিরা”-য় কোনো নামায, রোযা বা হালাল-হারামের নতুন বিধান নেই। এটি একটি জীবন্ত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সাক্ষ্য, যা কুরআনের শিক্ষার ওপর চলার ফল।
সিদ্ধান্ত: নামটি তিনি রাখেননি, আর রাখলেও এতে দোষ হতো না, কারণ কুরআন নিজেই শব্দটি নৌকা, আগুন আর রসূলের প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছে।
সংক্ষেপে
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ১৯০৮ সালে ইন্তেকাল করেন; তাঁর ইলহামের সংকলন “তাযকিরা” প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে, একটি কমিটির হাতে।
- “তাযকিরা” অর্থ স্মারক বা উপদেশ; কুরআন শব্দটি নূহের নৌকা ও আগুনের জন্যও ব্যবহার করেছে।
- ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর “আত-তাযকিরা” ও “তাযকিরাতুল আউলিয়া”-র মতো বইয়ের নাম মুসলিম ঐতিহ্যে বহুদিনের।
- “তাযকিরা” শরীয়তের বই নয়; তাই নাম নিয়ে আপত্তির কোনো ভিত্তি নেই।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.