‘তুমি যা ইচ্ছা করো, তা হয়ে যায়’: এটি কি খোদায়ী ক্ষমতার দাবি?

বদরের দিনে মহানবী (সা.) এক মুঠো কাঁকর ছুড়েছিলেন, আর আল্লাহ বললেন, ‘তুমি ছোড়োনি, আল্লাহ ছুড়েছেন।’ এই আয়াতেই লুকিয়ে আছে ইলহামটির চাবি।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

বদরের প্রান্তর। মুসলমানরা সংখ্যায় অল্প, অস্ত্রেও দুর্বল। যুদ্ধের এক মুহূর্তে মহানবী (সা.) মাটি থেকে এক মুঠো কাঁকর তুলে শত্রুর দিকে ছুড়ে দিলেন। তারপর যা ঘটল, তা মানুষের হাতের সাধ্যের বাইরে। পরে কুরআন এই ঘটনা নিয়ে একটি বিস্ময়কর কথা বলল।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা রূহানী খাযায়েন ২২ খণ্ডের ১০৮ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, তাঁকে বলা হয়েছে, “তুমি যে কাজের ইচ্ছা করো, তা তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।” তাঁদের দাবি, “হও, আর হয়ে যায়” তো শুধু আল্লাহর গুণ। কুরআন বলে:

اِنَّمَاۤ اَمۡرُہٗۤ اِذَاۤ اَرَادَ شَیۡئًا اَنۡ یَّقُوۡلَ لَہٗ کُنۡ فَیَکُوۡنُ
“তাঁহার কার্যধারা তো এইরূপ যে, যখন তিনি কোন কিছু সম্বন্ধে ইচ্ছা করেন তখন তিনি উহাকে শুধু বলেন, ‘হও’, তখন উহা হইয়া যায়।”
সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮৩
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৩৬:৮২ ও ৮:১৭।

তাই তাঁদের প্রশ্ন, একজন মানুষের সম্পর্কে এমন কথা বলা কি আল্লাহর গুণে অংশীদারির দাবি নয়?

কার ইচ্ছা, কার কাজ

প্রথম কথা হলো, বাক্যটি কোনো দাবি নয়, একটি ইলহাম, অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে জানানো একটি খবর। আর খবরটির মূল কথা হলো: যে বান্দা নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছায় সম্পূর্ণ বিলীন করে দেয়, আল্লাহ তার ইচ্ছা ও দোয়া পূরণ করেন। কাজটি করেন আল্লাহ, বান্দা শুধু তাঁর ইচ্ছার প্রকাশস্থল।

সুফি পরিভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় “ফানা ফিল্লাহ”, আল্লাহর মাঝে নিজেকে বিলীন করা। এই স্তরে বান্দার নিজের কোনো আলাদা কামনা থাকে না; সে যা চায়, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ীই চায়। তাই আল্লাহ তার চাওয়া পূরণ করেন।

এবার বদরের সেই ঘটনায় কুরআন কী বলেছে, দেখুন:

وَمَا رَمَیۡتَ اِذۡ رَمَیۡتَ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ رَمٰی
“…এবং যখন তুমি (কংকর) নিক্ষেপ করিয়াছিলে, তুমি নিক্ষেপ কর নাই, বরং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করিয়াছিলেন…”
সূরা আল-আনফাল ৮:১৮

হাত ছিল মহানবী (সা.)-এর, কিন্তু আল্লাহ বলছেন কাজটি তাঁর নিজের। এর অর্থ এই নয় যে মহানবী (সা.) খোদা হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থ হলো, আল্লাহর প্রিয় বান্দার কাজে আল্লাহর শক্তি কাজ করে।

✦

আল্লাহর প্রিয় বান্দার চাওয়া

সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, নফল ইবাদতে বান্দা যখন তাঁর প্রিয় হয়ে যায়, তখন তিনি তার কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যান, এবং:

وَإِنْ سَأَلَنِي لأُعْطِيَنَّهُ
“…আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দেব।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদীস ৬৫০২

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, তাঁর প্রিয় বান্দা যা চায়, তিনি তা দেন। ইলহামটিও ঠিক এই কথাই বলছে, শুধু একটু ভিন্ন ভাষায়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কোনো মানুষের ইচ্ছা পূরণের নিশ্চয়তা কি থাকতে পারে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, কোনো মানুষের ব্যাপারে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া বাড়াবাড়ি। চলুন দেখি, মহানবী (সা.) কী বলেছেন। হযরত আনাস ইবনে নাযর (রা.) একবার আল্লাহর উপর ভরসা করে কসম খেয়েছিলেন, আর আল্লাহ সেটি পূর্ণ করেছিলেন। তখন মহানবী (সা.) বলেছিলেন:

إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা আল্লাহর উপর ভরসা করে কসম খেলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুস সুলহ, হাদীস ২৭০৩

সাধারণ একজন সাহাবীর ক্ষেত্রেই যদি এমন হয়, তাহলে আল্লাহর প্রেরিত বান্দার ক্ষেত্রে এটি আরও স্বাভাবিক।

তাহলে কি তাঁর কোনো দোয়াই অপূর্ণ থাকত না?

ইলহামটি বান্দার ক্ষমতার ঘোষণা নয়, আল্লাহর অনুগ্রহের ঘোষণা। “ফানা ফিল্লাহ” অবস্থায় বান্দা তা-ই চায়, যা আল্লাহ চান। তাই তার ইচ্ছা আর আল্লাহর ইচ্ছা আলাদা থাকে না। এটি আল্লাহর গুণে অংশীদারি নয়, বরং আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের ফল। “হও, আর হয়ে যায়” ক্ষমতাটি সবসময় আল্লাহরই থাকে; বান্দা শুধু তাঁর রহমতের সাক্ষী।

আল্লাহর অনুমতিতে নবীর হাতে অলৌকিক কাজ কি কুরআনে আছে?

হ্যাঁ, আর তা খুব স্পষ্ট ভাষায়। হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে কুরআন বলেছে, তিনি বনী ইসরাঈলকে বলেছিলেন:

اَنِّیۡۤ اَخۡلُقُ لَکُمۡ مِّنَ الطِّیۡنِ کَہَیۡـَٔۃِ الطَّیۡرِ فَاَنۡفُخُ فِیۡہِ فَیَکُوۡنُ طَیۡرًۢا بِاِذۡنِ اللّٰہِ
“…তোমাদের জন্য কাদা হইতে আমি পাখীর অবস্থার অনুরূপ সৃষ্টি করিব, অতঃপর উহার মধ্যে আমি ফুৎকার করিব, ফলে উহা আল্লাহ্‌র আদেশে উড্ডয়নশীল হইয়া যাইবে…”
সূরা আলে ইমরান ৩:৫০

লক্ষ করুন, আয়াতে ফা-ইয়াকূনু, অর্থাৎ “ফলে তা হয়ে যাবে”, শব্দটিই এসেছে, আর সঙ্গে আছে মূল শর্ত: বি-ইযনিল্লাহ, আল্লাহর আদেশে। আহমদীয়া মুসলিম জামাত এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আক্ষরিক সৃষ্টির অর্থ নেয় না, বরং আধ্যাত্মিক অর্থ নেয়। কিন্তু যে ব্যাখ্যাই নেওয়া হোক, একটি বিষয়ে সব মুসলমান একমত: নবীর হাতে কিছু “হয়ে যাওয়া” মানে নবী খোদা হয়ে যাওয়া নয়; আল্লাহই করেন, নবী শুধু মাধ্যম।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ইলহামও এই একই সূত্রে বাঁধা। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হয়, কারণ সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। আল্লাহর আদেশ ছাড়া কিছুই হয় না, এ কথা তাঁর পুরো শিক্ষার ভিত্তি।

শেষ কথা হলো, এই ইলহাম কোনো মানুষের ক্ষমতার ঘোষণা নয়। এটি আল্লাহর সঙ্গে এক বান্দার গভীর সম্পর্কের খবর, যেখানে বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু চায় না, আর আল্লাহ তার চাওয়া ফিরিয়ে দেন না। কুরআন ও সহীহ হাদীসে এই সম্পর্কের কথা বারবার এসেছে। তাই এই ইলহাম আল্লাহর একত্বের বিরোধী নয়, বরং তাওহীদেরই একটি গভীর রূপ: বান্দার নিজের বলে কিছুই নেই, সবই আল্লাহর।

সংক্ষেপে

  1. বাক্যটি একটি ইলহাম, যার অর্থ: আল্লাহর ইচ্ছায় বিলীন বান্দার ইচ্ছা ও দোয়া আল্লাহ পূরণ করেন।
  2. কুরআন নিজেই মহানবী (সা.)-এর নিক্ষেপকে আল্লাহর নিক্ষেপ বলেছে (৮:১৮); এতে নবী খোদা হয়ে যান না।
  3. সহীহ বুখারীর হাদীসে আল্লাহ প্রিয় বান্দার চাওয়া পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (৬৫০২), আর কিছু বান্দার কসম আল্লাহ পূর্ণ করেন (২৭০৩)।
  4. “হও, আর হয়ে যায়” ক্ষমতা কেবল আল্লাহর; ইলহামে সেই ক্ষমতা বান্দাকে দেওয়া হয়নি, বরং তাঁর অনুগ্রহের খবর দেওয়া হয়েছে।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.