ধরুন, একজন আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ এই এই নোংরা অভিযোগ এনেছে। দেখুন, এগুলো কতটা ভিত্তিহীন।” পরদিন কেউ শুধু অভিযোগের অংশটুকু কেটে নিয়ে প্রচার করল, “দেখুন, আইনজীবী নিজেই স্বীকার করেছেন!”
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও আজকের আপত্তিটি ঠিক এমনই একটি ঘটনা।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা আহমদীয়া মুসলিম জামাতের মুখপত্র আল-ফযল পত্রিকার ৩১ আগস্ট ১৯৩৮ সংখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সেখানে নাকি ছাপা হয়েছে যে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মাঝে মাঝে গুরুতর পাপে লিপ্ত হতেন, আর দ্বিতীয় খলীফা সম্পর্কেও একই রকম নোংরা কথা বলা হয়েছে। তাঁদের দাবি, আহমদী মুসলমানরা নিজেদের পত্রিকায় এটি স্বীকার করেছে, নাউযুবিল্লাহ।
একটু থেমে ভাবুন
যেকোনো সুস্থ মানুষ প্রথমেই প্রশ্ন করবেন: কোনো জামাত কি নিজের প্রতিষ্ঠাতা আর নিজের খলীফা সম্পর্কে এমন কথা নিজের মুখপত্রে “স্বীকারোক্তি” হিসেবে ছাপতে পারে? দুনিয়ার সবচেয়ে বস্তুবাদী সংগঠনও নিজের নেতাকে নিয়ে এমন কথা ছাপে না। একটি আধ্যাত্মিক জামাত তো দূরের কথা।
তাহলে আসল ঘটনা কী?
আসল প্রসঙ্গ
আহমদীয়া বাংলার প্রকাশিত জবাব অনুযায়ী, সেই সময় এক বিরোধী ব্যক্তি এই জঘন্য অপবাদটি ছড়িয়েছিল। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের দ্বিতীয় খলীফা হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) একটি বক্তৃতায় দেখিয়েছিলেন যে, একজন বিদ্বেষী মানুষ আধ্যাত্মিক জামাতের বিরোধিতায় কতটা নিচে নামতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সেই অপবাদকারীর কথাগুলো উদ্ধৃত করেন, আর তারপর তার জবাব দেন।
জবাবে তিনি বলেন, এই লোক বাহ্যত তাঁর বিরোধিতা করছে, কিন্তু আসলে তার আক্রমণ জামাতের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে। তার কথার কোনো ভিত্তি নেই। আর তিনি প্রশ্ন রাখেন: যার সম্পর্কে এমন পাপ প্রমাণিত হয়, সে কি কখনো সাধু পুরুষ হতে পারে? অর্থাৎ তিনি অপবাদটিকে খণ্ডন করেছিলেন। সেই বক্তৃতাই আল-ফযলে ছাপা হয়।
পরে অপবাদকারীর অংশটুকু কেটে নিয়ে, খলীফার জবাব বাদ দিয়ে, পুরো কথাটিকে আহমদী মুসলমানদের “স্বীকারোক্তি” বানিয়ে প্রচার করা হলো।
শোনা কথা ছড়ানোর আগে
মহানবী (সা.) এমন আচরণ সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্ক করেছেন:
আর কুরআন অপবাদের সময় মুমিনদের কী করা উচিত ছিল, তা শিখিয়েছে:
এই আয়াত নাযিল হয়েছিল উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপবাদের প্রেক্ষাপটে। সেদিনও কিছু লোক শোনা কথা ছড়িয়েছিল। কুরআন শিখিয়েছে, এমন কথা শুনলে মুমিনের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত: “এটা ডাহা অপবাদ।”
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
পত্রিকায় তো কথাগুলো ছাপা হয়েছে, তাহলে উদ্ধৃতি ভুল কীভাবে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, শব্দগুলো যেহেতু আল-ফযলে আছে, তাই উদ্ধৃতি ঠিক। চলুন দেখি। কুরআনেও ফেরাউনের কথা আছে: “আমি তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।” (সূরা আন-নাযিআত ৭৯:২৫)। কেউ যদি শুধু এই অংশ তুলে বলে, “কুরআনে লেখা আছে, আমি তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক”, সেটা কি সঠিক উদ্ধৃতি হবে? শব্দ ছাপা থাকলেই হয় না; কে বলেছে, কোন প্রসঙ্গে বলেছে, আর লেখক নিজে তার কী জবাব দিয়েছেন, তা দেখাতে হয়। এখানে কথাগুলো ছিল এক অপবাদকারীর, আর খলীফা তা খণ্ডন করেছিলেন।
যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁরা কী বলেছেন?
একজন মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে বড় সাক্ষী তাঁর সমসাময়িকরা, বিশেষ করে যাঁরা তাঁর অনুসারী নন। অমৃতসরের উকিল পত্রিকার সম্পাদক মৌলানা আব্দুল্লাহ আল-এমাদী লিখেছিলেন: চরিত্রের দিক দিয়ে মির্যা সাহেবের আঁচলে একটি ক্ষুদ্র দাগও দেখা যায়নি; তিনি এক পবিত্র জীবন যাপন করেছেন (উকিল পত্রিকা, ৩০ মে ১৯০৮)। লাহোরের জমিদার পত্রিকার মৌলবী সিরাজুদ্দীন, যিনি তাঁকে যৌবনে শিয়ালকোটে দেখেছিলেন, সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি তখন অত্যন্ত নেক ও খোদাভীরু মানুষ ছিলেন (জমিদার পত্রিকা, ৮ জুন ১৯০৮)।
এই সাক্ষ্যগুলো এসেছে তাঁর ইন্তেকালের পরপরই, এমন মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা আহমদী ছিলেন না। তাঁদের সাক্ষ্যের সামনে ত্রিশ বছর পরের এক অপবাদকারীর কথা টেকে না।
এমন গুরুতর অভিযোগ তুলতে ইসলামে কী শর্ত আছে?
এখানে আরেকটি কথা ভাবার আছে। কারও চরিত্র নিয়ে এই ধরনের অভিযোগ ইসলামে খুবই গুরুতর বিষয়। কুরআন এর জন্য কঠোর শর্ত রেখেছে:
আল্লাহ এই অপবাদকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছাড়া এমন অভিযোগ তোলাকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেছেন। আর অপবাদদাতাকে “দুষ্কৃতকারী” বলেছেন। এখানে চারজন সাক্ষী তো দূরের কথা, একজনও নেই। আছে শুধু এক বিরোধীর মুখের কথা, যাকে খলীফা নিজেই ভিত্তিহীন বলে খণ্ডন করেছিলেন।
তাই একজন মুসলমানের জন্য পথ একটাই: কুরআনের নির্দেশ মেনে এমন কথা শুনলে বলা, “এটা ডাহা অপবাদ।” কোনো পত্রিকার পাতা থেকে অর্ধেক বাক্য কেটে এনে তা ছড়িয়ে দেওয়া কুরআনের এই শিক্ষার একেবারে বিপরীত।
সংক্ষেপে
- আল-ফযল (৩১ আগস্ট ১৯৩৮)-এ ছাপা কথাগুলো ছিল এক বিরোধী অপবাদকারীর, আহমদী মুসলমানদের স্বীকারোক্তি নয়।
- দ্বিতীয় খলীফা (রা.) সেই অপবাদ উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করে খণ্ডন করেছিলেন; জবাবের অংশ বাদ দিয়ে প্রচার করা হয়েছে।
- শোনা কথা যাচাই না করে ছড়ানো গুনাহ (আবু দাউদ ৪৯৯২); অপবাদ শুনলে মুমিনের কর্তব্য তা প্রত্যাখ্যান করা (সূরা আন-নূর ২৪:১৩)।
- অ-আহমদী সমসাময়িকরা তাঁর জীবনকে নিষ্কলঙ্ক ও পবিত্র বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- আপত্তি : মির্যা কাদিয়ানী কখনও কখনও যিনা-ব্যভিচার করতেন (নাউযুবিল্লাহ্) · ahmadiyyabangla.org
- মির্যা সাহেবের মৃত্যুতে বিখ্যাত মনীষীরা কী বলেছিলেন · ahmadiyyabangla.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.