পাতিয়ালা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন এক সহকারী সার্জন, ডা. আব্দুল হাকীম খান। প্রায় বিশ বছর তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর অনুসারী ছিলেন, এমনকি এক সময় লিখেছিলেন, তিনি তাঁকে মসীহ বলেই বিশ্বাস করেন।
তারপর একটি প্রশ্নে বিচ্ছেদ হলো। ডা. আব্দুল হাকীমের মত ছিল, কেউ যদি এক আল্লাহয় বিশ্বাস রাখে, তবে মহানবী (সা.)-এর ওপর ঈমান না আনলেও সে মুক্তি পাবে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন: সত্যিকারের তৌহিদ মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ছাড়া পাওয়া যায় না (হকীকাতুল ওহী)। এরপর ডা. আব্দুল হাকীম জামাত ছেড়ে দিলেন, আর অল্পদিনেই হয়ে উঠলেন সবচেয়ে কঠোর বিরোধীদের একজন।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, ডা. আব্দুল হাকীম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মির্যা সাহেব চৌদ্দ মাসের মধ্যে মারা যাবেন, আর তিনি সত্যিই সেই সময়ের মধ্যে, ১৯০৮ সালের মে মাসে, মারা গেলেন। অথচ তিনি নিজে ইলহাম প্রকাশ করেছিলেন, “আমি তোমার আয়ুও বাড়িয়ে দেব।” তাই তাঁদের মতে ডা. আব্দুল হাকীম জিতেছেন।
এই আপত্তির জবাব দিতে হলে তারিখগুলো পাশাপাশি সাজাতে হবে। কারণ গল্পের আসল চাবি লুকিয়ে আছে তারিখেই।
তারিখের পর তারিখ
১২ জুলাই ১৯০৬: ডা. আব্দুল হাকীম ঘোষণা করলেন, তাঁকে জানানো হয়েছে যে মির্যা সাহেব মিথ্যাবাদী, আর সত্যবাদীর সামনে তিনি ধ্বংস হবেন; মেয়াদ তিন বছর। অর্থাৎ ১৯০৯ সালের জুলাই পর্যন্ত।
এর জবাবে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইলহাম প্রকাশ করলেন, যা হকীকাতুল ওহী-তে আছে। তার ভাব: আল্লাহর মকবুল বান্দাদের মধ্যে কবুলিয়তের নিদর্শন থাকে, তাদের বলা হয় শান্তির রাজপুত্র, কেউ তাদের ওপর জয়ী হতে পারে না; ফেরেশতাদের খোলা তলোয়ার তোমার সামনে; আর দোয়া: “রব্বি ফাররিক বাইনা সাদিকিন ওয়া কাযিবিন”, হে আমার প্রভু, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করে দাও।
১ জুলাই ১৯০৭: ডা. আব্দুল হাকীম নিজের ভবিষ্যদ্বাণী বদলালেন। লিখলেন, তিন বছরের মেয়াদ থেকে দশ মাস এগারো দিন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে; এখন থেকে চৌদ্দ মাসের মধ্যে মির্যা সাহেব মারা যাবেন।
৫ নভেম্বর ১৯০৭: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ইশতেহারে এলো উর্দু ইলহাম, “ম্যাঁয় তেরী উমর কো ভী বাড়হা দূঁগা”, আমি তোমার আয়ুও বাড়িয়ে দেব। সঙ্গে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা লিখলেন: যে শত্রুরা বলে যে জুলাই ১৯০৭ থেকে আমার আয়ু মাত্র চৌদ্দ মাস বাকি, অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদে আমার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করে, আল্লাহ তাদের মিথ্যা প্রমাণ করবেন (বদর, ১০ নভেম্বর ১৯০৭)। লক্ষ করুন, ইলহামটি সরাসরি এই নির্দিষ্ট দাবির জবাব।
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯০৮: ডা. আব্দুল হাকীম আবার বদলালেন। এবার বললেন, মির্যা সাহেব ২১ শ্রাবণ ১৯৬৫ বিক্রমী, অর্থাৎ ৪ আগস্ট ১৯০৮-এর মধ্যে মারা যাবেন। এর জবাবে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) চশমায়ে মারেফত-এ লিখলেন, আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন যে সে নিজেই শাস্তিতে পড়বে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন, আর তিনি তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবেন (রূহানী খাযায়েন ২৩, পৃ. ৩৩৭)।
৮ মে ১৯০৮: ডা. আব্দুল হাকীম শেষবারের মতো ঘোষণা পাঠালেন, যা ১৫ মে ১৯০৮ তারিখের “পয়সা আখবার” ও “আহলে হাদীস” পত্রিকায় ছাপা হলো: মির্যা সাহেব মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে ২১ শ্রাবণ, অর্থাৎ ৪ আগস্ট ১৯০৮ তারিখে মারা যাবেন। এবার আর “মধ্যে” নয়, একটি নির্দিষ্ট দিন।
২৬ মে ১৯০৮: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লাহোরে ইন্তেকাল করলেন। ৪ আগস্ট নয়। ডা. আব্দুল হাকীমের শেষ এবং সবচেয়ে নির্দিষ্ট দাবিটি মিথ্যা প্রমাণিত হলো।
সবচেয়ে বড় সাক্ষ্যটি এসেছে বিরোধী শিবির থেকেই। মৌলভী সানাউল্লাহ অমৃতসরী তাঁর পত্রিকায় দুঃখ করে লিখলেন: ডাক্তার সাহেব যদি আগের চৌদ্দ মাসের কথাতেই থেমে থাকতেন, নির্দিষ্ট তারিখ না দিতেন, তাহলে আজ তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে যে আপত্তি উঠছে, তা উঠত না (আহলে হাদীস, ১২ জুন ১৯০৮)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“আয়ু বাড়িয়ে দেব” বলার পরও কয়েক মাসে মৃত্যু হলো কেন?
ইলহামের সাথে লেখা ব্যাখ্যাটিই এর উত্তর: যারা নির্দিষ্ট মেয়াদে মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করে, আল্লাহ তাদের মিথ্যা প্রমাণ করবেন। ডা. আব্দুল হাকীম নিজেই তিন বছর, তারপর চৌদ্দ মাস, তারপর “৪ আগস্টের মধ্যে”, সবশেষে “৪ আগস্টে” বলে আগের সব দাবি বাতিল করলেন। শেষ যে দাবির ওপর তিনি দাঁড়ালেন, সেটিই ভাঙল। কুরআনের সেই মু’মিন ব্যক্তির কথা মনে পড়ে:
তাহলে কি তাঁর মৃত্যু ডা. আব্দুল হাকীমের চৌদ্দ মাসের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করেনি?
যে ভবিষ্যদ্বাণী তার দাবিদার নিজেই দুবার বাতিল করেছেন, তাকে পরে পূর্ণ বলা যায় না। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কথা মানুষ নিজের মর্জিতে কমায়-বাড়ায় না। তা ছাড়া নিজের মৃত্যু নিকটবর্তী হওয়ার খবর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) অনেক আগেই দিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে, ডা. আব্দুল হাকীমের প্রথম ঘোষণারও আগে, তিনি আল ওসীয়্যত পুস্তিকায় লিখেছিলেন যে বারবার ইলহামে তাঁকে জানানো হয়েছে, তাঁর নির্ধারিত সময় কাছে এসে গেছে। যে মৃত্যুর খবর তিনি নিজেই আগে দিয়েছেন, তার কৃতিত্ব পরে অন্য কেউ দাবি করতে পারেন না।
ডা. আব্দুল হাকীমের নিজের পরিণতি কী হয়েছিল?
চশমায়ে মারেফত-এ বলা হয়েছিল, তিনি নিজেই শাস্তিতে পড়বেন এবং ধ্বংস হবেন; কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়নি। কুরআনও মহানবী (সা.)-কে বলেছে, বিরোধীদের পরিণতির কিছু অংশ তাঁকে দেখানো হতে পারে, অথবা তার আগেই তাঁকে তুলে নেওয়া হতে পারে:
ডা. আব্দুল হাকীম ১৯১৯ সালে যক্ষ্মা রোগে মারা যান (আল ফযল, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯২০)। তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর ইলহাম অনুযায়ী মির্যা সাহেবের ভিত্তি উপড়ে যাবে। আজ তাঁর নিজের কোনো অনুসারী দল খুঁজে পাওয়া যায় না, অথচ যাঁর বিরুদ্ধে তিনি এই দাবি করেছিলেন, তাঁর বাণী পৃথিবীর বহু দেশে পৌঁছে গেছে। কে কার সামনে টিকে রইলেন, ইতিহাসই তার সাক্ষী।
সংক্ষেপে
- ডা. আব্দুল হাকীম তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী তিনবার বদলান: তিন বছর, তারপর চৌদ্দ মাস, তারপর ৪ আগস্ট ১৯০৮।
- “আয়ু বাড়িয়ে দেব” ইলহাম ছিল নির্দিষ্ট মেয়াদ বেঁধে দেওয়া বিরোধীদের মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য, এ কথা সাথেই লেখা হয়েছিল।
- শেষ ঘোষণায় তিনি নির্দিষ্ট দিন, ৪ আগস্ট ১৯০৮, বলেছিলেন; ইন্তেকাল হয় ২৬ মে ১৯০৮, তাই সেই দাবি মিথ্যা হয়।
- মৌলভী সানাউল্লাহ নিজেই স্বীকার করেন, নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়াতেই ডাক্তার সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী আপত্তির মুখে পড়েছে।
- নিজের মৃত্যু নিকটবর্তী হওয়ার খবর ১৯০৫ সালেই আল ওসীয়্যতে দেওয়া হয়েছিল, ডা. আব্দুল হাকীমের ঘোষণার আগে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The age of the Promised Messiah - Part II · alhakam.org
- An imposter is surely destroyed: The fate of Abdul Hakeem Patialvi · alhakam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.