প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী কোথা থেকে আসবেন?

মক্কা? মদীনা? নাকি দামেস্কের আকাশ? হাদীস বারবার একটি দিকের কথা বলেছে, পূর্ব দিক। আর এক পুরোনো কিতাবে লেখা আছে একটি গ্রামের নামও।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

ভোরবেলা পূর্ব আকাশে প্রথম আলো ফোটে। তারপর সেই আলো ধীরে ধীরে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। মহানবী (সা.) যখন শেষ যুগের প্রতিশ্রুত সংস্কারকের কথা বলেছেন, তখন বারবার তিনি একটি দিকের দিকে ইঙ্গিত করেছেন: পূর্ব দিক।

অনেকে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন, ইমাম মাহদী মক্কা বা মদীনায় আত্মপ্রকাশ করবেন, আর ঈসা (আ.) আকাশ থেকে দামেস্কে নামবেন। চলুন, হাদীসগুলো নিজেরাই খুলে দেখি, সেগুলো আসলে কী বলে।

দামেস্কের পূর্বে, সাদা মিনারের কাছে

সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর একটি দীর্ঘ বর্ণনা আছে। তাতে দাজ্জালের ফিতনার কথা বলার পর মহানবী (সা.) বলেছেন:

إِذْ بَعَثَ اللَّهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شَرْقِيَّ دِمَشْقَ
“…তখন আল্লাহ মসীহ ইবনে মারইয়ামকে প্রেরণ করবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন…”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭; সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৭৫

লক্ষ করুন, হাদীসে বলা হয়নি “দামেস্কে”, বলা হয়েছে “দামেস্কের পূর্বে”। দামেস্ক এখানে একটি দিক চেনানোর চিহ্ন, ঠিক যেমন আমরা বলি “ঢাকার উত্তরে”।

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) জন্মেছেন এবং দাবি করেছেন পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম কাদিয়ানে। মানচিত্র খুললেই দেখা যায়, কাদিয়ান দামেস্কের পূর্ব দিকে অবস্থিত। আহমদীয়া মুসলিম জামাত এই ভবিষ্যদ্বাণীর বাহ্যিক পূর্ণতা হিসেবে কাদিয়ানে একটি সাদা মিনারও নির্মাণ করেছে, যার নাম মিনারাতুল মসীহ।

পূর্ব দিক থেকে আসা মানুষেরা

শুধু একটি হাদীস নয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন হারিস (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:

يَخْرُجُ نَاسٌ مِنَ الْمَشْرِقِ فَيُوَطِّئُونَ لِلْمَهْدِيِّ
“পূর্ব দিক থেকে কিছু মানুষ বের হবে, তারা মাহদীর জন্য পথ প্রস্তুত করবে।” (বর্ণনাকারী বলেন, অর্থাৎ তাঁর কর্তৃত্বের জন্য।)
সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, বাব খুরুজিল মাহদী, হাদীস ৪০৮৮

আরেকটি বর্ণনায় হযরত সাওবান (রা.) জানাচ্ছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকা উঠবে। তারপর তিনি বললেন:

فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَبَايِعُوهُ وَلَوْ حَبْوًا عَلَى الثَّلْجِ فَإِنَّهُ خَلِيفَةُ اللَّهِ الْمَهْدِيُّ
“যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর হাতে বয়আত করবে, যদি বরফের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়েও যেতে হয়; কেননা তিনি আল্লাহর খলীফা আল-মাহদী।”
সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৪

আবারও সেই একই দিক: পূর্ব। আর মহানবী (সা.) এতটাই জোর দিয়েছেন যে, পথ যত কঠিনই হোক, তাঁর কাছে পৌঁছাতেই হবে।

✦

একটি গ্রামের নাম: কাদআ

এবার আরও একটু কাছে যাই। হিজরী ৮৪০ সনে শেখ আলী হামযা বিন আলী মালিক আত-তূসী জাওয়াহিরুল আসরার নামে একটি গ্রন্থ লেখেন। সেখানে প্রতিশ্রুত মাহদী সম্পর্কে লেখা আছে, মাহদী “কাদআ” নামের একটি গ্রাম থেকে আসবেন।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেছেন, “কাদআ” হলো কাদিয়ানেরই আরবি রূপ। তিনি আরও বলেছেন, শত শত বছর আগে লেখা বইয়ে নিজের গ্রামের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। হুযূর আনোয়ার (আই.) ২০২৩ সালের ২১ জুলাইয়ের জুমুআর খুতবায় এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।

এবার সব মিলিয়ে দেখুন। দিক পূর্ব। চিহ্ন: দামেস্কের পূর্বে। অঞ্চল: যেখানে বরফ পড়ে। আর গ্রামের নাম: কাদআ। এই সব চিহ্ন একসঙ্গে একটি জায়গার দিকেই আঙুল তোলে, পাঞ্জাবের কাদিয়ান।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“মাহদী তো মদীনা থেকে মক্কায় গিয়ে কাবার পাশে বয়আত নেবেন, এমন হাদীসও তো আছে?”

এখানে কেউ কেউ সুনান আবু দাউদের একটি বর্ণনা পেশ করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর সূত্রে তাতে আছে, একজন খলীফার মৃত্যুর সময় মতভেদ হবে, মদীনার এক ব্যক্তি মক্কায় পালিয়ে যাবেন, আর লোকেরা রুকন ও মাকামের মাঝে তাঁর হাতে বয়আত করবে (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৬)।

চলুন দেখি। প্রথমত, এই হাদীসে “মাহদী” শব্দটিই নেই। শুধু “এক ব্যক্তি” বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এর সনদে একজন অজ্ঞাত বর্ণনাকারী আছেন; শায়খ আলবানীসহ হাদীস-বিশারদরা একে দুর্বল বলেছেন। অন্যদিকে দামেস্কের পূর্বে অবতরণের হাদীসটি সহীহ মুসলিমের। একটি দুর্বল, নামহীন বর্ণনা দিয়ে সহীহ হাদীসের স্পষ্ট দিক-নির্দেশ বাতিল করা যায় না।

“হাদীসে তো বলা আছে মসীহ আকাশ থেকে নামবেন, কাদিয়ানে জন্ম নেবেন না?”

হাদীসে শব্দটি “নুযূল”, যার অর্থ অবতরণ বা আগমন। কুরআনে আল্লাহ লোহার ক্ষেত্রেও এই শব্দ ব্যবহার করেছেন: “আমরা লৌহ নাযেল করিয়াছি” (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৬)। পোশাকের ক্ষেত্রে বলেছেন: “আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক নাযেল করিয়াছি” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:২৭)। গৃহপালিত পশুর ক্ষেত্রেও বলেছেন, তিনি “আট জোড়া নাযেল করিয়াছেন” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৭)। অথচ লোহা, কাপড় বা গরু-ছাগল কেউ আকাশ থেকে পড়তে দেখেনি। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কল্যাণ বোঝাতেই এই শব্দ।

তা ছাড়া একই হাদীসে বলা হয়েছে, তিনি দুই ফেরেশতার ডানায় হাত রেখে নামবেন। আকাশ থেকে নামার কথা আক্ষরিক ধরলে, এই দৃশ্য কেউ চোখে দেখবে না, তাহলে মানুষ তাঁকে চিনবে কীভাবে? বোঝা যায়, এটি রূপক ভাষা: আল্লাহর সাহায্য আর ফেরেশতাদের সমর্থন নিয়ে তিনি আসবেন।

“দামেস্কের পূর্বে তো অসংখ্য শহর আছে, কাদিয়ানই কেন?”

প্রশ্নটি যুক্তিসংগত। শুধু একটি চিহ্ন দেখে কোনো জায়গা চিহ্নিত করা যায় না। কিন্তু এখানে চিহ্ন একটি নয়। একটি সহীহ হাদীস বলছে দামেস্কের পূর্বে। আরেকটি হাদীস বলছে পূর্ব দিকের মানুষ মাহদীর পথ তৈরি করবে। শত শত বছর পুরোনো একটি কিতাব গ্রামের নাম বলছে “কাদআ”।

আর সবচেয়ে বড় কথা, জায়গা একা কিছু প্রমাণ করে না, প্রমাণ করে মানুষ। দামেস্কের পূর্বের অসংখ্য শহরের মধ্যে একটিতেই একজন মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আর সেই গ্রামের নামই পুরোনো কিতাবে লেখা ছিল। সব চিহ্ন যখন একই জায়গায় এসে মেলে, তখন সেটি আর কাকতালীয় থাকে না।

সংক্ষেপে

  1. সহীহ মুসলিম অনুযায়ী প্রতিশ্রুত মসীহ আসবেন “দামেস্কের পূর্বে”, সাদা মিনারের কাছে; কাদিয়ান দামেস্কের পূর্বে অবস্থিত।
  2. ইবনে মাজাহর হাদীস বলে, পূর্ব দিকের মানুষ মাহদীর পথ প্রস্তুত করবে।
  3. হিজরী ৮৪০ সনে লেখা জাওয়াহিরুল আসরার-এ মাহদীর গ্রামের নাম “কাদআ”, যা কাদিয়ানের আরবি রূপ।
  4. মক্কা-মদীনায় আত্মপ্রকাশের বর্ণনাটিতে মাহদীর নামই নেই, আর হাদীস-বিশারদরা একে দুর্বল বলেছেন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.