বেহেশতী মাকবারা: টাকা দিয়ে কি জান্নাত কেনা যায়?

অভিযোগ: সম্পত্তির দশ ভাগের এক ভাগ দিলেই নাকি এক বিশেষ কবরস্থানে জায়গা আর জান্নাতের নিশ্চয়তা মেলে। ১৯০৫ সালের পুস্তিকা “আল-ওসীয়্যত” নিজে কী বলে, চলুন লাইন ধরে দেখি।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

১৯০৫ সালের শেষ দিক। কাদিয়ানে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একের পর এক ইলহামে জানতে পারছেন, তাঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছে। একজন মানুষ যখন জানেন তিনি আর বেশি দিন নেই, তখন তিনি কী নিয়ে ভাবেন? তিনি ভাবলেন, তাঁর পরে তাঁর জামাত কীভাবে চলবে, আর ইসলামের প্রচারের খরচ কোথা থেকে আসবে।

এই চিন্তা থেকেই ২০ ডিসেম্বর ১৯০৫ তারিখে প্রকাশিত হলো ছোট একটি পুস্তিকা: আল-ওসীয়্যত, অর্থাৎ “অসিয়ত”। এর একটি অংশে একটি কবরস্থানের কথা আছে, যার নাম দেওয়া হলো “বেহেশতী মাকবারা”। আর এই নাম নিয়েই আপত্তি।

আপত্তিটি কী?

বলা হয়, মির্যা সাহেব ঘোষণা করেছেন, যে তার সম্পত্তির দশ ভাগের এক ভাগ দান করবে, সে এই কবরস্থানে দাফন হবে এবং জান্নাতে যাবে। অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা হয়েছে।

কথাটি শুনতে গুরুতর। কিন্তু অভিযোগটি যে বই নিয়ে, সেই বইয়ে আসলে কী শর্ত দেওয়া আছে, আগে সেটি দেখা দরকার।

“আল-ওসীয়্যত”-এ দাফনের তিনটি শর্ত

পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, আল্লাহ তাঁর মনে এই ভাবনা দিয়েছেন যে এই কবরস্থানে দাফনের জন্য কিছু শর্ত থাকবে, আর কেবল তাঁরাই সেখানে স্থান পাবেন, যাঁরা তাঁদের সত্যবাদিতা ও পূর্ণ তাকওয়ার কারণে সেই শর্তগুলো পূরণ করবেন। তারপর শর্তগুলো এসেছে:

প্রথম শর্ত: কবরস্থানের জমি তিনি নিজের পক্ষ থেকে দিয়েছেন; বাকি জমি কেনা, গাছ লাগানো, কূপ খোঁড়া আর একটি সাঁকো তৈরির খরচে যিনি এখানে দাফন হতে চান, তিনি সাধ্যমতো সাহায্য করবেন।

দ্বিতীয় শর্ত: জামাতের যে সদস্য এখানে দাফন হতে চান, তিনি অসিয়ত করবেন যে তাঁর সমগ্র সম্পত্তির অন্তত দশ ভাগের এক ভাগ ইসলাম ও কুরআনের শিক্ষা প্রচারে ব্যয় হবে। এই অর্থ খরচ হবে ইসলামের প্রসার, কুরআনের জ্ঞান বিস্তার, ধর্মীয় বই প্রকাশ, মুবাল্লিগদের খরচ, আর এতিম, গরিব ও অভাবী নওমুসলিমদের সাহায্যে।

তৃতীয় শর্ত: এখানে যিনি দাফন হবেন, তাঁকে মুত্তাকী হতে হবে, সব হারাম থেকে বিরত থাকতে হবে, শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত থাকতে হবে, আর একজন সত্যিকারের ও খাঁটি মুসলমান হতে হবে।

এর পরেই একটি কথা যোগ করা হয়েছে, যা পুরো আপত্তিটিকে উল্টে দেয়: যে নেককার মানুষের কোনো সম্পত্তি নেই এবং যিনি কোনো আর্থিক সেবা দিতে পারেন না, তিনিও এখানে দাফন হতে পারবেন, যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি দীনের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং নেককার ছিলেন। (আল-ওসীয়্যত; ইংরেজি অনুবাদ The Will, ২০২৩ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৬–২৯)

যে ব্যবস্থায় একজন কপর্দকহীন মানুষও একই সম্মান পান, সেটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয় কীভাবে?

✦

কবরস্থান মানুষকে জান্নাতি বানায় না

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই এই ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা করেছিলেন। তাই একই পুস্তিকার একটি পাদটীকায় তিনি পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন:

“কেউ যেন অবাক না হয় যে শুধু এই কবরস্থানে দাফন হলেই কেউ কীভাবে জান্নাতে যাবে। এর উদ্দেশ্য এই নয় যে এই মাটি কাউকে জান্নাতের যোগ্য বানাবে; বরং আল্লাহর বাণীর অর্থ হলো, এখানে কেবল তাঁরাই দাফন হবেন, যাঁরা জান্নাতের যোগ্য।” (আল-ওসীয়্যত; The Will, পৃষ্ঠা ৩২)

অর্থাৎ ক্রমটি উল্টো। কবর জান্নাত দেয় না; বরং যাঁদের জীবন তাকওয়া, কুরবানি আর সেবায় কেটেছে, তাঁদের একসাথে এক জায়গায় রাখা হয়, যেন পরের প্রজন্ম তাঁদের দেখে ঈমান মজবুত করে।

পরবর্তী নির্দেশনায় আরও স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে: শুধু সম্পত্তির দশ ভাগের এক ভাগ অসিয়ত করাই যথেষ্ট নয়; অসিয়তকারীকে সাধ্যমতো ইসলামের বিধান মানতে হবে, তাকওয়া ও পবিত্রতার জন্য চেষ্টা করতে হবে, এক আল্লাহয় বিশ্বাসী মুসলমান হতে হবে, তাঁর রসূলের প্রতি খাঁটি ঈমান রাখতে হবে, এবং মানুষের হক নষ্ট করা চলবে না। (আল-ওসীয়্যত-এর পরিশিষ্ট; The Will, পৃষ্ঠা ৪১)

সম্পদের কুরবানি আর জান্নাতের সুসংবাদ: কুরআনের ভাষা

জান্নাতের সাথে সম্পদের কুরবানির কথা জোড়া দেওয়া কি নতুন কিছু? কুরআন নিজেই এই ভাষা ব্যবহার করেছে:

اِنَّ اللّٰہَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَہُمۡ وَاَمۡوَالَہُمۡ بِاَنَّ لَہُمُ الۡجَنَّۃَ
“নিশ্চয় আল্লাহ্ মো’মেনগণের নিকট হইতে তাহাদের জীবন এবং তাহাদের ধন-সম্পদ ক্রয় করিয়া লইয়াছেন এই জন্য যে, তাহাদের জন্য জান্নাত আছে;…”
সূরা আত-তওবা ৯:১১১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৯:১১১।

কেউ কি বলবেন, কুরআন জান্নাত “বিক্রি” করছে? না। কুরআন শেখায়, জান ও মালের কুরবানি ঈমানের প্রমাণ, আর আল্লাহ তার প্রতিদান দেন। অসিয়তের ব্যবস্থা এই শিক্ষারই একটি সংগঠিত রূপ। আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেছেন:

لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ
“তোমরা কখনও পুণ্য অর্জন করিতে পারিবে না যে পর্যন্ত না তোমরা যাহা ভালবাস উহা হইতে খরচ কর,…”
সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কোনো মানুষ কি কারও জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিতে পারেন?

নবীরা আল্লাহর জানানো অনুযায়ী এমন সুসংবাদ দিয়েছেন। বদরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাহাবীদের সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, হয়তো আল্লাহ বদরবাসীদের দিকে তাকিয়ে বলেছেন, “তোমরা যা খুশি কর, তোমাদের জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে গেছে।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস ৩৯৮৩) আর দশজন সাহাবীর নাম ধরে তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। (জামে তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৭৪৭)

মজার বিষয়, আগমনকারী মসীহের একটি কাজ হিসেবেও এ কথা হাদীসে এসেছে। সহীহ মুসলিমের দাজ্জাল-সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদীসে বলা হয়েছে, মসীহ ঈমানদারদের কাছে আসবেন এবং:

وَيُحَدِّثُهُمْ بِدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ
“এবং তিনি তাদেরকে জান্নাতে তাদের মর্যাদার কথা জানাবেন।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭

তাই যে মসীহ জান্নাতের মর্যাদার সুসংবাদ দেবেন বলে মহানবী (সা.) বলে গেছেন, তিনি নেককারদের জন্য একটি কবরস্থানকে “বেহেশতী” বললে তাতে আপত্তির কিছু নেই। সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে আমল আর তাকওয়ার শর্তে, টাকার বিনিময়ে নয়।

দশ ভাগের এক ভাগ, এই অঙ্ক কেন?

এটি সর্বনিম্ন সীমা; ইচ্ছা করলে কেউ বেশি দিতে পারেন। ইসলামী শরীয়তে অসিয়তের সীমাও মহানবী (সা.) নিজে ঠিক করে দিয়েছেন। হযরত সা’দ (রা.) সব সম্পদ অসিয়ত করতে চাইলে তিনি নিষেধ করলেন, অর্ধেকও নিষেধ করলেন, আর এক-তৃতীয়াংশের কথায় বললেন:

فَالثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ
“তবে এক-তৃতীয়াংশ, আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল ওয়াসায়া, হাদীস ২৭৪২

অসিয়তের ব্যবস্থা এই সীমার ভেতরেই থাকে: সর্বনিম্ন এক-দশমাংশ, সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ। বাকি সম্পদ উত্তরাধিকারীদের হক হিসেবেই থাকে।

এই টাকা কি কারও ব্যক্তিগত কাজে যায়?

আল-ওসীয়্যত-এ খরচের খাত লিখে দেওয়া আছে: ইসলামের প্রচার, কুরআনের জ্ঞান, ধর্মীয় বই, মুবাল্লিগ, এতিম ও অভাবী মানুষ। আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) সেখানে নিজের একটি ভয়ের কথাও লিখেছেন: তাঁর চিন্তা টাকা কোথা থেকে আসবে তা নিয়ে নয়, বরং তাঁর পরে যাঁদের হাতে এই অর্থ থাকবে, তাঁরা যেন প্রাচুর্য দেখে দুনিয়ার প্রেমে পড়ে না যান। (The Will, পৃষ্ঠা ২৮) যে মানুষ এই দোয়া রেখে যান, তিনি জান্নাত বিক্রির ব্যবসা খোলেননি।

সংক্ষেপে

  1. আল-ওসীয়্যত (১৯০৫) অনুযায়ী বেহেশতী মাকবারায় দাফনের শর্ত শুধু অর্থ নয়: তাকওয়া, শিরক-বিদআত থেকে মুক্ত থাকা আর খাঁটি মুসলমান হওয়া আবশ্যক।
  2. যাঁর কোনো সম্পদ নেই, দীনের সেবায় জীবন উৎসর্গকারী এমন নেককার মানুষও সেখানে দাফন হতে পারেন।
  3. পুস্তিকাতেই লেখা আছে, মাটি কাউকে জান্নাতি বানায় না; কেবল জান্নাতের যোগ্যরাই সেখানে দাফন হন।
  4. কুরআন নিজেই জান-মালের কুরবানির সাথে জান্নাতের প্রতিশ্রুতির কথা বলে, আর হাদীসে আছে মসীহ মুমিনদের জান্নাতের মর্যাদার সংবাদ দেবেন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.