ঈসা (আ.)-এর চারপাশে তখন শত্রুরা ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। তারা ঠিক করেছে, তাঁকে ক্রুশে চড়িয়ে মারবে, যাতে প্রমাণ হয় তিনি অভিশপ্ত। কাছের মানুষরাও ভয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।
এমন সময়ে আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে সান্ত্বনা দিলেন। একটি নয়, পরপর চারটি প্রতিশ্রুতি দিলেন। কুরআন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো হুবহু সংরক্ষণ করেছে।
চারটি প্রতিশ্রুতি, একটি ক্রম
আয়াতটি ধীরে ধীরে পড়ুন। আল্লাহ চারটি কাজের কথা বলছেন, আর প্রতিটির মাঝে আছে “এবং” (আরবিতে ওয়াও)। ক্রমটি এ রকম:
এক, “আমি তোমাকে মৃত্যু দিব।” দুই, “আমার দিকে তোমাকে উন্নীত করিব।” তিন, অস্বীকারকারীদের অপবাদ থেকে তোমাকে পবিত্র করিব। চার, তোমার অনুসারীদের কিয়ামত পর্যন্ত অস্বীকারকারীদের ওপর প্রাধান্য দিব।
এখন একটি সহজ প্রশ্ন। এই চারটির কোনগুলো পূর্ণ হয়েছে?
যাঁরা বিশ্বাস করেন ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত, তাঁরাও মানেন যে তাঁকে আল্লাহ উন্নীত করেছেন। মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে কুরআন তাঁকে ইহুদিদের সব অপবাদ থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছে। আর তাঁর অনুসারীরা দুই হাজার বছর ধরে তাঁর অস্বীকারকারী ইহুদিদের ওপর প্রাধান্য পেয়ে আসছে। অর্থাৎ দুই, তিন আর চার নম্বর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ।
কিন্তু তাঁরা বলেন, প্রথমটি, অর্থাৎ মৃত্যু, এখনো বাকি। ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নেমে আসার পর সেটি পূর্ণ হবে।
সিঁড়ির প্রথম ধাপ বাদ দিয়ে ওপরে ওঠা যায় না
একটি সিঁড়ির কথা ভাবুন। কেউ যদি বলে সে দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপে উঠে গেছে, অথচ প্রথম ধাপে এখনো পা রাখেনি, কথাটি অদ্ভুত শোনায়। আল্লাহ যে ক্রমে কথা বলেছেন, সেই ক্রম উল্টে দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই।
মহানবী (সা.) নিজেও এই শিক্ষা দিয়েছেন। হজের সময় সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাঈ শুরু করার আগে তিনি কুরআনের আয়াত পড়ে বললেন:
আয়াতে আল্লাহ শুরু করেছেন “মৃত্যু” দিয়ে, তারপর “উন্নীত করা”। তাই আগে মৃত্যু, তারপর উন্নতি। যদি পরের তিনটি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে প্রথমটিও অবশ্যই পূর্ণ হয়েছে।
“মুতাওয়াফ্ফীকা” শব্দের অর্থ
আয়াতের প্রথম প্রতিশ্রুতির আরবি শব্দ ইন্নী মুতাওয়াফ্ফীকা। এর অর্থ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই, শ্রেষ্ঠ মুফাসসির হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)। সহীহ বুখারীতে ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন:
যখন আল্লাহ কর্তা আর একজন মানুষ কর্ম, তখন এই শব্দের অর্থ সব সময় রূহ কবজ করা, অর্থাৎ মৃত্যু দেওয়া। বিখ্যাত আরবি ভাষাবিদ ও মুফাসসির যামাখশারী (রহ.) তাঁর তফসীর আল-কাশ্শাফে এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ তোমাকে শত্রুদের হাতে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করবেন, তোমার নির্ধারিত আয়ু পূর্ণ করাবেন, আর তোমাকে স্বাভাবিক মৃত্যু দেবেন।
আল-আযহারের এক মহান আলেমের সিদ্ধান্ত
এ কথা শুধু আহমদী মুসলমানরাই বলেন না। মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর শায়খ মাহমুদ শালতুত (রহ.) এ বিষয়ে একটি ফতোয়া দিয়েছিলেন। তিনি এই আয়াতকে সূরা আন-নিসার আয়াত “বরং আল্লাহ্ তাহাকে তাঁহার দিকে উন্নীত করিয়াছেন” (৪:১৫৯)-এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়েছেন।
তাঁর ব্যাখ্যা ছিল খুব পরিষ্কার: সূরা আলে ইমরানের আয়াতে একটি প্রতিশ্রুতি, আর সূরা আন-নিসার আয়াতে সেই প্রতিশ্রুতির পূরণ। আল্লাহ বলেছিলেন মৃত্যু দেবেন, উন্নীত করবেন আর অপবাদমুক্ত করবেন, এবং তিনি তা-ই করেছেন। “উন্নীত করা” শব্দটি মৃত্যুর পরে এসেছে, তাই এর মানে মর্যাদার উন্নতি, শরীর আকাশে তোলা নয়। তিনি এটাও লিখেছেন, ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে জীবিত আছেন, এমন বিশ্বাসের পক্ষে কুরআন বা সহীহ হাদীসে কিছুই নেই।
আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো অপূর্ণ থাকে না, আর তিনি যে ক্রমে বলেন সেটিই সঠিক ক্রম। চারটি প্রতিশ্রুতির তিনটি যখন পূর্ণ, প্রথমটিও পূর্ণ হয়েছে: হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর তারপর আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আরবিতে “ওয়াও” তো সব সময় ক্রম বোঝায় না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, “এবং” দিয়ে জোড়া কাজগুলো আগে-পরে যেকোনো ক্রমে ঘটতে পারে। ব্যাকরণের দিক থেকে কথাটির একটা ভিত্তি আছে। কিন্তু চলুন দেখি মহানবী (সা.) নিজে কী করেছেন। কুরআনে আছে, “নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াহ্ আল্লাহ্র নিদর্শনসমূহের অন্যতম” (সূরা আল-বাকারা ২:১৫৯)। এখানেও দুটি নাম শুধু “ও” দিয়ে জোড়া। তবু মহানবী (সা.) বললেন, “আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমরাও তা দিয়েই শুরু করব,” আর সাফা থেকেই সাঈ শুরু করলেন। অর্থাৎ বিনা কারণে আল্লাহর বাণীর ক্রম উল্টে দেওয়া মহানবী (সা.)-এর পথ নয়।
তা ছাড়া এখানে আরেকটি প্রমাণ আছে। সূরা আন-নিসায় আল্লাহ অতীত কালে বলেছেন, “বরং আল্লাহ্ তাহাকে তাঁহার দিকে উন্নীত করিয়াছেন” (৪:১৫৯)। অর্থাৎ উন্নীত করা ঘটে গেছে। আর সূরা আলে ইমরানে মৃত্যুর প্রতিশ্রুতি এসেছে উন্নীত করার আগে। শায়খ শালতুত (রহ.) ঠিক এই দুটি আয়াত মিলিয়েই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
“মুতাওয়াফ্ফীকা” মানে কি “আমি তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নেব” নয়?
অনেকে এই অনুবাদ করেন, যাতে শরীরসহ তুলে নেওয়ার অর্থ বের হয়। কিন্তু এই আয়াতের অর্থ যিনি সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো জানতেন, সেই ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব।” শায়খ শালতুত (রহ.) বিখ্যাত মুফাসসির আলূসী (রহ.)-এর ব্যাখ্যাও উল্লেখ করেছেন: আল্লাহ ঈসা (আ.)-এর আয়ু পূর্ণ করাবেন আর তাঁকে শত্রুর হাতে নিহত হতে না দিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু দেবেন। “পূর্ণ করা” যদি বলতেই হয়, তা আয়ু পূর্ণ করা, শরীর তুলে নেওয়া নয়।
“আমার দিকে উন্নীত করা” মানে কি আকাশে নিয়ে যাওয়া নয়?
আল্লাহ কোনো একটি দিকে বা আকাশের কোনো কোণে সীমাবদ্ধ নন। কুরআনে এক ব্যক্তির কথা আছে, যাকে আল্লাহ চাইলে “উচ্চ মর্যাদা দিতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকিয়া পড়িল” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৭৭)। এখানে “উন্নীত করা”র বিপরীতে রাখা হয়েছে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া। এই তুলনা তখনই অর্থবহ, যখন উন্নতি মানে আধ্যাত্মিক মর্যাদা। ঈসা (আ.)-এর উন্নতিও তাই: অভিশপ্ত মৃত্যুর অপবাদের বদলে আল্লাহর নৈকট্যের সম্মান।
সংক্ষেপে
- সূরা আলে ইমরানের ৫৬ আয়াতে আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে ক্রমানুসারে চারটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রথমটি মৃত্যু।
- পরের তিনটি পূর্ণ হয়েছে বলে সবাই মানেন; ক্রম অনুযায়ী প্রথমটিও তাই পূর্ণ হয়েছে।
- মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন: আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেন, আমরাও তা দিয়েই শুরু করি।
- হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে “মুতাওয়াফ্ফীকা” অর্থ “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব”; আল-আযহারের শায়খ শালতুতও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The ‘Ascension’ of Jesus (Shaikh Mahmoud Shaltout) · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.