ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত: যে দলিলগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো কী বলে?

মক্কার কাফেররা একদিন মহানবী (সা.)-কে আকাশে উঠে দেখাতে বলেছিল। তাঁর উত্তরেই লুকিয়ে আছে পুরো আলোচনার চাবি।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

মক্কার কুরাইশ নেতারা একদিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সামনে দাবির লম্বা তালিকা নিয়ে হাজির হলো। মাটি থেকে ঝরনা বের করে দেখাও। খেজুর আর আঙুরের বাগান বানাও। সোনার একটা ঘর বানাও। আর শেষ দাবিটি ছিল সবচেয়ে বড়: আকাশে উঠে দেখাও।

তারা আরও বলল, শুধু উঠলেই হবে না, সেখান থেকে একটা কিতাব নামিয়ে আনতে হবে, যা আমরা নিজেরা পড়ব। মহানবী (সা.) কী উত্তর দিয়েছিলেন, কুরআন তা সংরক্ষণ করেছে:

اَوۡ تَرۡقٰی فِی السَّمَآءِ ؕ وَلَنۡ نُّؤۡمِنَ لِرُقِیِّکَ حَتّٰی تُنَزِّلَ عَلَیۡنَا کِتٰبًا نَّقۡرَؤُہٗ ؕ قُلۡ سُبۡحَانَ رَبِّیۡ ہَلۡ کُنۡتُ اِلَّا بَشَرًا رَّسُوۡلًا
“…অথবা তুমি আকাশে আরোহণ কর এবং আমরা তোমার (আকাশ) আরোহণে কখনও বিশ্বাস করিব না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের উপর কোন কিতাব নাযেল কর যাহা আমরা পাঠ করিতে পারি।’ তুমি বল, ‘আমার প্রতিপালক পবিত্র! আমি কেবল একজন মানব-রসূল।’”
সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৯৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ১৭:৯৩।

“আমি তো একজন মানুষ”

উত্তরটি খুব ছোট, কিন্তু গভীর। আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম নবীকে দিয়ে বলালেন: আমার প্রভু পবিত্র, আমি তো একজন মানুষ, একজন রসূল মাত্র। অর্থাৎ সশরীরে আকাশে ওঠা মানুষের জন্য আল্লাহর নিয়ম নয়।

এখন একটি সহজ প্রশ্ন। যে কাজ সব নবীর সেরা, মহানবী (সা.)-এর জন্য আল্লাহ করেননি, সেই কাজ কি ঈসা (আ.)-এর জন্য করা হয়েছে? তাহলে তো ঈসা (আ.)-কে মহানবী (সা.)-এর চেয়েও বড় মর্যাদা দিয়ে ফেলা হয়। ঠিক এই কথাই বলা যায়: কোনো মানুষ যদি সশরীরে আকাশে যাওয়ার যোগ্য হতেন, তিনি হতেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। অথচ তিনি এই পৃথিবীতেই ইন্তেকাল করেছেন, মদিনায় সমাহিত আছেন।

তবুও অনেক আলেম কুরআন আর হাদীস থেকে কিছু দলিল পেশ করেন, যা দিয়ে তাঁরা বোঝাতে চান যে ঈসা (আ.) আজও আকাশে জীবিত। চলুন, সেগুলো একে একে দেখি।

যে দলিলগুলো পেশ করা হয়

১. “মা কাতালুহু ওয়া মা সালাবুহু” (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮)। বলা হয়, ঈসা (আ.)-কে ক্রুশেই দেওয়া হয়নি, তাঁর চেহারা অন্য কারো ওপর ফেলা হয়েছিল। অথচ আয়াতটি অস্বীকার করছে ক্রুশে তাঁর মৃত্যু, ক্রুশে চড়ানো নয়। আর অন্য কারো চেহারা বদলানোর কথা আয়াতে কোথাও নেই।

২. “বাল রাফাআহুল্লাহু ইলাইহি” (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯)। বলা হয়, আল্লাহ তাঁকে আকাশে তুলে নিয়েছেন। অথচ আয়াতে আকাশ শব্দটিই নেই। আছে “আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন।” আল্লাহ যখন কোনো মানুষকে “রাফা” দেন, কুরআনে তার অর্থ সবসময় মর্যাদা বাড়ানো।

৩. “আহলে কিতাবের প্রত্যেকে ঈমান আনবে” (সূরা আন-নিসা ৪:১৬০)। বলা হয়, সব ইহুদি-খ্রিস্টান একদিন তাঁর ওপর ঈমান আনবে, তাই তিনি জীবিত। অথচ কোটি কোটি আহলে কিতাব ঈমান না এনেই মারা গেছেন। আর কুরআন নিজেই বলেছে, কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিভেদ থাকবে (সূরা আল-মায়েদা ৫:১৫)।

৪. “তিনি কিয়ামতের নিদর্শন” (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৬২)। বলা হয়, এর মানে তিনি কিয়ামতের আগে ফিরে আসবেন। অথচ বহু তফসীরকারক এখানে “সে” বলতে কুরআনকে বুঝিয়েছেন, আর আয়াতের কথাগুলো ভবিষ্যতের কোনো আগমনের দিকে ইঙ্গিত করে না।

৫. “আল্লাহ মসীহকে ধ্বংস করতে চাইলে কে বাধা দেবে?” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১৮)। বলা হয়, আল্লাহ এখনো তা চাননি, তাই তিনি জীবিত। অথচ একই আয়াতে তাঁর মা আর পৃথিবীর সব মানুষের কথাও আছে। মরিয়ম (আ.) কি তাহলে আজও জীবিত?

৬. “তিনি প্রৌঢ় বয়সে কথা বলবেন” (সূরা আলে ইমরান ৩:৪৭)। বলা হয়, তিনি সেই বয়সে পৌঁছানোর আগেই আকাশে চলে গেছেন, তাই ফিরে এসে কথা বলবেন। অথচ আয়াতটি বরং ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কম বয়সে মারা যাবেন না, পরিণত বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন।

৭. “ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৯)। বলা হয়, নাযিল মানে আকাশ থেকে নামা। অথচ হাদীসে “আকাশ থেকে” কথাটি নেই। কুরআনে লোহা, পশু, পোশাক, এমনকি মহানবী (সা.)-এর আগমনের জন্যও একই শব্দ ব্যবহার হয়েছে।

এই প্রতিটি দলিলের বিস্তারিত আলোচনা এই সাইটে আলাদা আলাদা লেখায় করা হয়েছে।

✦

স্পষ্ট আয়াত আগে, দ্ব্যর্থবোধক আয়াত পরে

লক্ষ করুন, ওপরের একটি আয়াতেও স্পষ্ট করে বলা নেই যে ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে আছেন। প্রত্যেকটিতে একটি শব্দের অর্থ টেনে বা একটি সর্বনামের ব্যাখ্যা বদলে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

অন্যদিকে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর কথা কুরআনে এসেছে একেবারে পরিষ্কার ভাষায়। যেমন: “তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫)। কুরআন নিজেই শিখিয়েছে, এমন অবস্থায় কী করতে হয়:

مِنۡہُ اٰیٰتٌ مُّحۡکَمٰتٌ ہُنَّ اُمُّ الۡکِتٰبِ وَاُخَرُ مُتَشٰبِہٰتٌ
“…যাহার কতক আয়াত সুস্পষ্ট-দ্ব্যর্থহীন, যেগুলি এই কিতাবের মুল; এবং অন্যগুলি পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ, রূপক (এবং বিভিন্ন ব্যাখ্যাবাহী)…”
সূরা আলে ইমরান ৩:৮

অর্থাৎ যে আয়াতের একাধিক অর্থ হতে পারে, তাকে বুঝতে হবে স্পষ্ট আয়াতের আলোয়। স্পষ্ট আয়াত বলছে, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই বাকি আয়াতগুলোর এমন অর্থ নিতে হবে, যা এর সঙ্গে মেলে। আর আমরা দেখব, প্রতিটির এমন সুন্দর ও স্বাভাবিক অর্থ আছে, যা প্রসঙ্গের সাথেও মেলে, আরবি ভাষার সাথেও।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

উম্মতের বেশিরভাগ আলেম তো আকাশে জীবিত থাকার কথাই বলেছেন, তাঁরা সবাই কি ভুল?

প্রশ্নটা স্বাভাবিক। তবে সত্য বিচার হয় কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর কথা দিয়ে, সংখ্যা দিয়ে নয়। আর উম্মতের ইতিহাসে এই প্রশ্নে সবাই একমত ছিলেন, এমনও নয়।

কুরআনের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারদের একজন হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) মুতাওয়াফফীকা শব্দের অর্থ করেছেন “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব”, যা ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থের তফসীর অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৬)-এর বরাতে উল্লেখ আছে, ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর আধুনিক যুগে আল-আজহারের প্রধান শায়খ মাহমুদ শালতূত ফতোয়া দিয়েছেন, কুরআন বা সহীহ হাদীসে এমন কিছু নেই যা থেকে প্রমাণ হয় ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে জীবিত আছেন।

সাহাবীরা (রা.) কী বিশ্বাস করতেন?

এর উত্তর পাওয়া যায় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন দিনে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের খবরে হযরত উমর (রা.) শোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, মানতেই পারছিলেন না যে তিনি মারা গেছেন। তখন হযরত আবু বকর (রা.) এসে সবার সামনে সূরা আলে ইমরানের সেই আয়াতটি পাঠ করলেন: মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল, তাঁর আগের সব রসূল গত হয়েছেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৫৪)।

বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা যেন আয়াতটি সেদিনই প্রথম শুনল, আর সবাই তা পড়তে লাগল। হযরত উমর (রা.) বলেছেন, আয়াতটি শুনে তাঁর পা আর তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। সেখানে উপস্থিত একজন সাহাবীও বলেননি, “সব রসূল তো মারা যাননি, ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত আছেন।” তাই এই ঘটনা সাহাবীদের প্রথম ঐকমত্য বলে গণ্য: মহানবী (সা.)-এর আগের সব নবী মৃত্যুবরণ করেছেন।

সংক্ষেপে

  1. আকাশে ওঠার দাবির জবাবে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “আমি কেবল একজন মানব-রসূল।”
  2. মহানবী (সা.)-এর জন্য যা হয়নি, ঈসা (আ.)-এর জন্য তা মানলে তাঁকে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় করা হয়।
  3. আকাশে জীবিত থাকার পক্ষে দেওয়া সাতটি দলিলের কোনোটিতেই “সশরীরে আকাশে” কথাটি নেই।
  4. দ্ব্যর্থবোধক আয়াত বুঝতে হয় স্পষ্ট আয়াতের আলোয়, আর স্পষ্ট আয়াত ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর কথা বলে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.