“মক্কা-মদীনার দুধ কি শুকিয়ে যায়নি?”: একটি উপমার সঠিক পাঠ

হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.)-এর এক বক্তৃতার একটি উপমাকে মক্কা ও মদীনার অবমাননা বলা হয়। অথচ উপমাটি বলছে সময়ের কথা: নবীর সরাসরি সান্নিধ্য চিরকাল থাকে না, তাই সুযোগ থাকতেই তা কাজে লাগাও।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

একটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ সবচেয়ে খাঁটি খাবার। কিন্তু প্রতিটি মা জানেন, এই সময় চিরকাল থাকে না। একদিন দুধ শুকিয়ে যায়, শিশু বড় হয়, অন্য খাবারে অভ্যস্ত হয়। তাই বুদ্ধিমান মা চান, যতদিন দুধ আছে, শিশু যেন তা থেকে পুরো উপকার পায়।

এই সাধারণ উপমাটি দিয়েই হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), আহমদীয়া মুসলিম জামাতের দ্বিতীয় খলীফা, তাঁর এক বক্তৃতায় একটি কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। সেই কথাটিকেই আজ মক্কা ও মদীনার অবমাননা হিসেবে প্রচার করা হয়।

আপত্তিটি কী

একটি আপত্তি হলো: “হাকীকাতুর রুইয়া” নামে প্রকাশিত বক্তৃতার ৪৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বারবার তাগিদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি বারবার কাদিয়ানে আসবে না, তার ঈমান নিয়ে আশঙ্কা আছে; যে কাদিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এরপর বলা হয়েছে, এই তাজা দুধ আর কতদিন থাকবে? মায়েদের দুধও একদিন শুকিয়ে যায়; মক্কা ও মদীনার বুক থেকে কি সেই দুধ শুকিয়ে যায়নি? আপত্তিকারীরা বলেন, এতে মক্কা ও মদীনাকে ছোট করা হয়েছে।

প্রথমেই একটি তথ্য পরিষ্কার করা দরকার। বক্তব্যটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা নয়; এটি তাঁর ইন্তেকালের পরে দ্বিতীয় খলীফার একটি বক্তৃতা, যেখানে তিনি মসীহ মওউদ (আ.)-এর উপদেশের কথা স্মরণ করাচ্ছেন।

উপমাটি কী বলছে

উপমাটির মূল শব্দ হলো “তাজা দুধ”। মায়ের দুধ শিশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের নেয়ামত। বক্তা বলছেন, আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ আর তাঁর সরাসরি সাহচর্যে বেড়ে ওঠা মানুষদের কাছ থেকে শেখার সুযোগও তেমনি একটি সময়ের নেয়ামত। সেই সময় চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না।

এরপর প্রশ্ন: মক্কা ও মদীনার বুক থেকে কি সেই দুধ শুকিয়ে যায়নি? মক্কা ও মদীনার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য ছিল, সেখানে স্বয়ং মহানবী (সা.) বাস করতেন। সাহাবীরা সরাসরি তাঁর মুখ থেকে কুরআন শুনতেন, তাঁর পেছনে নামায পড়তেন, তাঁর কাছ থেকে দীন শিখতেন। এই সরাসরি সাহচর্যের যুগটি তাঁর ইন্তেকালের সঙ্গে শেষ হয়েছে।

সেই দিনের কথা সহীহ বুখারীতে আছে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর অনেকে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। তখন হযরত আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন:

أَلاَ مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَىٌّ لاَ يَمُوتُ
“শোনো! তোমাদের মধ্যে যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন; আর যে আল্লাহর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি মরেন না।”
সহীহ বুখারী, কিতাবু ফাযায়িলি আসহাবিন নবী (সা.), হাদীস ৩৬৬৮

এরপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন:

وَمَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ ؕ وَمَنۡ یَّنۡقَلِبۡ عَلٰی عَقِبَیۡہِ فَلَنۡ یَّضُرَّ اللّٰہَ شَیۡئًا ؕ وَسَیَجۡزِی اللّٰہُ الشّٰکِرِیۡنَ
“এবং মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল। তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে। অতএব, সে যদি মৃত্যু বরণ করে অথবা নিহত হয়, তাহা হইলে তোমরা কি তোমাদের গোড়ালির উপর (তৎক্ষণাৎ পশ্চাতে) ফিরিয়া যাইবে? এবং যে ব্যক্তি তাহার গোড়ালিদ্বয়ের উপর ফিরিয়া যাইবে সে আদৌ আল্লাহ্‌র কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এবং অচিরেই আল্লাহ্ কৃতজ্ঞ ব্যক্তিগণকে প্রতিদান দিবেন।”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩:১৪৪।

এই সত্য স্বীকার করা কি মক্কা-মদীনার অবমাননা? না। এটি আল্লাহর নিয়ম। নবীর সরাসরি উপস্থিতির যুগ শেষ হয়, তারপর আসে পরীক্ষা। প্রসঙ্গসহ পড়লে বক্তব্যটির স্বাভাবিক অর্থ দাঁড়ায় এই: যেমন মহানবী (সা.)-এর সরাসরি সাহচর্যের যুগ একদিন শেষ হয়েছে, তেমনি মসীহ মওউদ (আ.)-এর সাহাবীদের যুগও চিরকাল থাকবে না; কাজেই সুযোগ থাকতে কেন্দ্রে এসে দীন শেখো।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“আহমদী মুসলমানরা কি কাদিয়ানকে মক্কার বিকল্প মনে করে?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, এমন বক্তব্যে বোঝা যায় আহমদী মুসলমানদের কাছে কাদিয়ানই আসল কেন্দ্র। চলুন দেখি জামাতের ইমাম কী বলেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বরের জুমুআর খুতবায় বলেছেন: “আমরা, নাউযুবিল্লাহ, বলি না যে জলসার মর্যাদা হজ্জের মতো, যেমন আমাদের কিছু বিরোধী অভিযোগ করে যে আমরা কাদিয়ানে গিয়ে একে হজ্জের মর্যাদা দিই। এটা ভুল।”

ইসলামে দুটি স্থান সবচেয়ে পবিত্র: মক্কার কা'বা, আর মহানবী (সা.)-এর শহর মদীনা। কুরআন বলছে, মানুষের জন্য প্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বাক্কায় (মক্কায়), তা বরকতময় এবং সমগ্র জগতের হেদায়াতের কারণ (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)। আহমদী মুসলমানরা দিনে পাঁচবার সেই কা'বার দিকেই মুখ করে নামায পড়েন।

“হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজে কা'বাকে কোন চোখে দেখতেন?”

নিজের ওহীর সত্যতা নিয়ে সবচেয়ে কঠিন শপথ করার সময় তিনি কা'বাকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, তিনি “বাইতুল্লাহর চত্বরে দাঁড়িয়ে” কসম খেতে প্রস্তুত যে তাঁর ওপর অবতীর্ণ ওহী সেই আল্লাহরই বাণী, যিনি মূসা (আ.), ঈসা (আ.) ও মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলেছেন (এক গলতী কা ইযালা, ইংরেজি অনুবাদ A Misconception Removed, পৃ. ৯-১০)। মানুষ সবচেয়ে বড় শপথের জন্য সবচেয়ে পবিত্র স্থানটিকেই বেছে নেয়। আর “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যার ওপর হজ্জ ফরয হয়েছে এবং কোনো বাধা নেই, সে যেন হজ্জ করে।

“‘যে কাদিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, সে বিচ্ছিন্ন হবে’ কথাটি কি কঠোর নয়?”

প্রতিটি জামাতের একটি কেন্দ্র থাকে, যেখান থেকে শিক্ষা ও নির্দেশনা আসে। মহানবী (সা.)-এর যুগে মুসলমানরা দূর-দূরান্ত থেকে মদীনায় আসতেন দীন শিখতে। কুরআন নির্দেশ দেয়, “তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)। কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলে মানুষ ধীরে ধীরে জামাত থেকে দূরে সরে যায়, এটি অভিজ্ঞতার কথা। এখানে মক্কা-মদীনার সঙ্গে প্রতিযোগিতার কোনো প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো যুগের ইমামের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হওয়া।

সিদ্ধান্ত: উপমাটি মক্কা-মদীনার মর্যাদা নিয়ে নয়, সময় নিয়ে। নবীর সরাসরি সাহচর্য একটি সীমিত নেয়ামত; সেই সত্য মনে করিয়ে দেওয়া অবমাননা নয়, উপদেশ।

সংক্ষেপে

  1. উদ্ধৃত বক্তব্যটি দ্বিতীয় খলীফা হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-এর বক্তৃতা, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর লেখা নয়।
  2. “তাজা দুধ” উপমার অর্থ, আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের সরাসরি সাহচর্যের সীমিত সময়; মক্কা-মদীনায় মহানবী (সা.)-এর সাহচর্যের যুগও তাঁর ইন্তেকালের সঙ্গে শেষ হয়েছে।
  3. জামাতের ইমাম স্পষ্ট বলেছেন, কাদিয়ানের জলসাকে হজ্জের মর্যাদা দেওয়া হয় না; ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মক্কা ও মদীনা।
  4. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সবচেয়ে বড় শপথের জন্য বাইতুল্লাহকেই বেছে নিয়েছেন; তাই অবমাননার অভিযোগ টেকে না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.