উনিশ শতকের শেষ দিকে পাঞ্জাবে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচার তুঙ্গে। বাজারে, মেলায়, ছাপাখানায় তাঁদের বই আর পুস্তিকা। সেগুলোর অনেকগুলোতে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে এমন নোংরা ভাষা আর মিথ্যা অপবাদ, যা একজন মুসলমান মুখেও আনতে পারেন না।
এমনই এক দিনে গুরদাসপুর জেলার ফতেহগড়ের পাদরি ফতেহ মসীহ কাদিয়ানে একটি চিঠি পাঠালেন। সেই চিঠিতে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) চুপ থাকলেন না। আর তাঁর জবাব থেকেই আজকের আপত্তির জন্ম।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা তাঁর কিছু লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি হযরত ঈসা (আ.)-এর নামে কঠোর ও অসম্মানজনক কথা লিখেছেন। একজন নবীর অবমাননা ঈমানের পরিপন্থী, তাই তাঁর দাবি সত্য হতে পারে না।
প্রথমেই একটি প্রশ্ন ভেবে দেখুন। তাঁর মূল দাবিই ছিল, তিনি ঈসা (আ.)-এর সদৃশ, তাঁর আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজেই লিখেছেন, আমি যেহেতু ঈসা (আ.)-এর সাদৃশ্যের দাবি করি, সবাই বুঝবে যে আমি তাঁর নিন্দা করলে নিজেকেই মন্দ বলে স্বীকার করতাম। (ইশতেহার, ২৭ ডিসেম্বর ১৮৯৮) যে মানুষ কারও প্রতিচ্ছবি হওয়ার দাবি করেন, তিনি সেই মূল মানুষটিকে কেন গালি দেবেন?
হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর নিজের কথা
তাঁর লেখায় ঈসা (আ.)-এর প্রতি সম্মানের কথা ছড়িয়ে আছে। কয়েকটি উদাহরণ:
“আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ দিয়েছেন যেন আমি ঘোষণা করি, হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর একজন সত্য, পবিত্র ও সৎ নবী ছিলেন, এবং তাঁর নবুওয়তের ওপর ঈমান রাখি।” (আইয়ামুস সুলেহ, প্রথম শিরোনাম পৃষ্ঠা)
“মসীহ আল্লাহর গৃহীত ও প্রিয় বান্দা ছিলেন। যারা তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, তারা দুষ্ট।” (ইজাযে আহমদী, পৃষ্ঠা ১৫)
“আমি শপথ করে বলছি, মসীহের প্রতি আমার যে সত্যিকারের ভালোবাসা আছে, তা তোমাদের নেই… নিঃসন্দেহে তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় ও মনোনীত নবী ছিলেন।” (দাওয়াতে হক, হাকীকাতুল ওহীর সাথে সংযুক্ত)
এই কথাগুলো কুরআনের সেই ঈসা (আ.)-এর জন্য, যাঁর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
দুটি আলাদা চরিত্র
তাহলে কঠোর কথাগুলো কার সম্পর্কে? তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন। তাঁর কাছে কুরআনের ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) আর খ্রিস্টান পাদরিদের প্রচারিত “যিশু” এক নন। প্রথমজন আল্লাহর বান্দা ও নবী; দ্বিতীয়জন এমন এক কাল্পনিক চরিত্র, যে নিজেকে খোদা দাবি করে, আগের নবীদের চোর-ডাকাত বলে, আর পরে আসা সব নবীকে মিথ্যা বলে। এই দ্বিতীয় চরিত্রটিকে বোঝাতে তিনি কখনো কখনো খ্রিস্টানদের ব্যবহৃত নাম “ইয়াসু” ব্যবহার করেছেন।
তাঁর ভাষায়: “মসীহ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস খুবই উত্তম। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর সত্য নবী ও প্রিয় ছিলেন… কিন্তু খ্রিস্টানরা যে যিশুকে উপস্থাপন করে, যে খোদা হওয়ার দাবি করেছিল এবং নিজে ছাড়া আগের-পরের সবাইকে অভিশপ্ত বলেছিল, তাকে আমরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত মনে করি। কুরআন এমন ধৃষ্ট যিশুর কোনো উল্লেখ করেনি… আমাদের লেখায় খ্রিস্টানদের এই কাল্পনিক যিশুই আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহর বিনয়ী বান্দা ঈসা ইবনে মরিয়ম, যিনি নবী ছিলেন এবং যাঁর কথা কুরআনে আছে, তিনি আমাদের কঠোর কথার লক্ষ্য নন।” (নূরুল কুরআন, ২য় সংখ্যা)
অন্য জায়গায়: “আমি মসীহ সম্পর্কে কোনো অসম্মানের কথা বলিনি; এটি বিরোধীদের অপবাদ।… আমি সেই মসীহ ইবনে মরিয়মের ওপর ঈমান রাখি, যিনি নিজেকে আল্লাহর বান্দা ও রসূল বলেন এবং খাতামুল আম্বিয়ার সত্যতা স্বীকার করেন।” (তিরইয়াকুল কুলূব, পৃষ্ঠা ৭৭)
কুরআনের ঈসা (আ.) সত্যিই নিজের পরিচয় এভাবেই দিয়েছেন:
কেন এই পথ বেছে নিতে হলো
তিনি লিখেছেন, পাদরিদের হাতে মহানবী (সা.)-এর অবমাননা চল্লিশ বছর সহ্য করার পর এই পদ্ধতি নিতে হয়েছে। (নূরুল কুরআন, ২য় সংখ্যা) পাদরি ফতেহ মসীহের চিঠির জবাবে লেখা পুস্তিকায় তিনি বলেছেন, খ্রিস্টান পাদরিরা যেন এর ভাষায় কষ্ট না পান, কারণ এই সুর ফতেহ মসীহের গালিরই জবাব; তবু সত্যিকারের মসীহের পবিত্র মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি, তাই তাঁর জবাবে একটি কাল্পনিক যিশুর ছবি আঁকা হয়েছে, তাও প্রচণ্ড বাধ্য হয়ে। (নূরুল কুরআন, ২য় সংখ্যা)
পদ্ধতিটি সহজ: পাদরিরা যে বই থেকে মহানবী (সা.)-কে আক্রমণ করছিলেন, তিনি সেই বাইবেল থেকেই তাদের যিশুর ছবি তুলে ধরলেন, যেন তারা বোঝেন অন্যের ধর্মের ওপর এমন আক্রমণ কতটা আঘাত দেয়। আর কাজও হয়েছিল: মিশনারিরা আক্রমণ ছেড়ে নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত হলেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
যিশু তো একজনই; “দুই যিশু” বলা কি কথার মারপ্যাঁচ নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, নাম যেহেতু এক, মানুষটিও এক। চলুন ভাবি। খ্রিস্টানরা যে যিশুকে খোদা, খোদার পুত্র ও মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্তকারী বলেন, কোনো মুসলমান কি সেই যিশুতে বিশ্বাস করেন? না। কুরআন নিজেই সেই বিশ্বাস খণ্ডন করে বলে, মসীহ ছিলেন কেবল একজন রসূল। (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৬) মুসলমানরা প্রতিদিনই এই দুই ছবির পার্থক্য করেন। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) শুধু সেই পার্থক্যটি স্পষ্ট নাম দিয়ে বলেছেন এবং বারবার সতর্ক করেছেন যে কুরআনের ঈসা (আ.) তাঁর কঠোর কথার লক্ষ্য নন। যিনি নিজের লেখায় বারবার এই সীমারেখা টেনে দিয়েছেন, তাঁর লেখা থেকে সেই সীমারেখা মুছে উদ্ধৃতি দেওয়া ন্যায়বিচার নয়।
তবুও কি এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করা উচিত ছিল?
তিনি নিজে এটিকে আদর্শ ভাষা বলেননি; বলেছেন “প্রচণ্ড বাধ্য হয়ে”। যাঁরা মহানবী (সা.)-কে ব্যভিচারী পর্যন্ত বলছিলেন, তাঁদের জবাব দেওয়া হয়েছে তাঁদেরই কিতাব থেকে, তাঁদেরই বিশ্বাসের ভিত্তিতে। তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে প্রকাশিত গালিগালাজ পড়ে তাঁর হৃদয় এত ব্যথিত যে, শত্রুরা তাঁর সন্তানদের চোখের সামনে হত্যা করলেও এত কষ্ট হতো না। (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, পৃষ্ঠা ৫১) এই কঠোরতার উৎস ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, ঈসা (আ.)-এর প্রতি বিদ্বেষ নয়।
তিনি কি বলেননি যে তিনি ঈসা (আ.)-এর চেয়ে উত্তম?
তাঁর দাবি ছিল, মহানবী (সা.)-এর উম্মতের মসীহ, মহানবী (সা.)-এর কল্যাণে, পূর্ববর্তী মসীহের চেয়ে বেশি অনুগ্রহ পেয়েছেন। এটি মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ, ঈসা (আ.)-এর অবমাননা নয়। মর্যাদার তুলনা আর অপমান এক জিনিস নয়; কুরআনও বলেছে আল্লাহ কিছু রসূলকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৪), অথচ তাতে কোনো নবীর অবমাননা হয় না। আর তিনি নিজেই লিখেছেন, ঈসা (আ.)-এর মতো পুণ্যবানদের সম্পর্কে ধৃষ্টতা দেখিয়ে কেউ এক রাতও টিকতে পারে না। (The Miracle of Ahmad, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৬৬)
সংক্ষেপে
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর সত্য, পবিত্র ও প্রিয় নবী বলেছেন এবং নিজেকে তাঁর সদৃশ দাবি করেছেন।
- তাঁর কঠোর কথাগুলো খ্রিস্টান পাদরিদের প্রচারিত কাল্পনিক “যিশু”-র উদ্দেশে, যে খোদা হওয়ার দাবি করে ও নবীদের নিন্দা করে; কুরআনে এমন কারও উল্লেখ নেই।
- এই জবাব এসেছিল মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে পাদরিদের দীর্ঘ গালিগালাজের পর, তাদেরই কিতাবের ভিত্তিতে।
- তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, কুরআনের ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) তাঁর কঠোর কথার লক্ষ্য নন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.