বাজারে সোনা কিনতে গেলে দোকানদার কষ্টিপাথরে ঘষে দেখান। সোনার দাগ আলাদা, পিতলের দাগ আলাদা। কারো কথায় নয়, পরীক্ষায় বোঝা যায় কোনটা খাঁটি।
আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার দাবিদার কেউ সত্য কি না, তা যাচাইয়ের জন্যও কুরআন আমাদের হাতে কয়েকটি কষ্টিপাথর দিয়েছে। মজার কথা, এই কষ্টিপাথরগুলো দিয়েই কুরআন মহানবী (সা.)-এর সত্যতা প্রমাণ করেছে। তাই এগুলো নিয়ে কোনো মুসলমানের আপত্তি থাকার কথা নয়।
প্রথম কষ্টিপাথর: দাবির আগের জীবন
মক্কার লোকেরা যখন মহানবী (সা.)-কে অস্বীকার করছিল, আল্লাহ তাঁকে বলতে বললেন:
যে মানুষ চল্লিশ বছর ধরে মানুষের সাথেও কখনো মিথ্যা বলেননি, তিনি হঠাৎ আল্লাহর নামে মিথ্যা বলবেন, এটি বিবেক মানে না। সাফা পাহাড়ে কুরাইশরাও স্বীকার করেছিল, “আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯৭১)।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ওপরও হুবহু এই আয়াতটি ইলহাম হয়েছিল। আর তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন: “দাবির আগের আমার জীবনে তোমরা কোনো দোষ, প্রতারণা, মিথ্যা বা জালিয়াতি দেখাতে পারবে না… তোমাদের মধ্যে কে আমার জীবনে এমন দোষ দেখাতে পারে?” (তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৬৪)
হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.) লিখেছেন, পরবর্তীতে তীব্র বিরোধী হয়ে ওঠা মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী নিজেই তাঁর পত্রিকায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে হযরত মির্যা সাহেবের জীবন পবিত্র ও নির্দোষ (মি‘য়ারে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম, খণ্ড ৬)।
দ্বিতীয় কষ্টিপাথর: মিথ্যা ওহীর দাবিদার টিকে থাকে না
আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.) সম্পর্কে বলেন:
এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে: তিনি ওহীর দাবির পর তেইশ বছর বেঁচে ছিলেন, আল্লাহ তাঁকে ধরেননি। হযরত মির্যা সাহেব ১৮৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইলহাম পেতে শুরু করেন, আর ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইলহামের দাবি করে গেছেন। ১৯০৮ সালে তিনি স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করেন, তাঁর কাজ তখন বিশ্বজুড়ে ছড়াতে শুরু করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে: যদি একজন মিথ্যা দাবিদারও তেইশ বছরের বেশি টিকে থাকতে পারে, তাহলে এই আয়াত দিয়ে মহানবী (সা.)-এর সত্যতা প্রমাণ হবে কীভাবে? যুক্তিটি তখন নিজেই ভেঙে পড়ে। তাই আয়াতের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে মানতে হয়, আল্লাহ মিথ্যা ওহীর দাবিদারকে এত দীর্ঘ সময় দেন না।
তৃতীয় ও চতুর্থ কষ্টিপাথর: অদৃশ্যের সংবাদ আর শেষ পরিণতি
অনুমান কখনো কখনো মিলে যায়, কিন্তু বহু সংখ্যক স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী কেবল আল্লাহর মনোনীত বান্দার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকা তাঁর হাকীকাতুল ওহী গ্রন্থে বিস্তারিত আছে। যেমন ১৮৮৬ সালে তিনি একজন মহান পুত্রের জন্মের ভবিষ্যদ্বাণী করেন; ১৮৮৯ সালের ১২ জানুয়ারি হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরে জামাতের দ্বিতীয় খলীফা হন।
চতুর্থ কষ্টিপাথর হলো শেষ পরিণতি। কুরআন বলে:
যিনি একদিন কাদিয়ানে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন, যে গ্রামে সপ্তাহে একবার ডাক আসত, তাঁর ওপর ইলহাম হয়েছিল, আল্লাহ তাঁর বাণী পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.) প্রশ্ন রেখেছিলেন, আজ কে বলতে পারে যে তাঁর নাম পৃথিবীর প্রান্তে পৌঁছায়নি? এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও জামাত থামেনি, বরং প্রতিটি পরীক্ষার পর আরও এগিয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“৬৯:৪৫ আয়াত তো শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্য”
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি কেবল মহানবী (সা.)-এর কথা বলছে, অন্য কারো জন্য মাপকাঠি নয়। কিন্তু একটু ভাবুন: কোনো কিছু প্রমাণ হিসেবে তখনই কাজ করে, যখন তা একটি সাধারণ নিয়মের ওপর দাঁড়ায়। যদি আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের দীর্ঘ সময় দিতেন, তাহলে “আমি তেইশ বছর টিকে আছি” কোনো প্রমাণই হতো না। প্রমাণের শক্তি আসে এই নিয়ম থেকেই যে, আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারীকে আল্লাহ ছাড় দেন না।
“অনেক ভণ্ডও তো দীর্ঘদিন টিকে ছিল”
দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা এক কথা, আর আল্লাহর নামে নিয়মিত ওহীর দাবি করে, প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ দিয়ে, বিরোধীদের মোকাবেলায় সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে উন্নতি করতে থাকা আরেক কথা। কুরআনের নিয়ম শেষোক্ত দাবিদার নিয়ে। তা ছাড়া সত্যের মাপকাঠি একটি নয়, কয়েকটি একসাথে: পবিত্র অতীত, দীর্ঘ জীবন, পূর্ণ হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী, আর ক্রমাগত বিজয়। সবগুলো একসাথে কোনো মিথ্যাবাদীর জীবনে মেলে না।
“বিরোধিতা তো সবারই হয়, এটা কী প্রমাণ?”
শুধু বিরোধিতা কিছু প্রমাণ করে না, ঠিক। কিন্তু কুরআন বলে, প্রত্যেক রসূলকেই ঠাট্টা ও অস্বীকারের মুখোমুখি হতে হয়েছে (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩১)। তাই একজন দাবিদারের বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়া তাঁকে মিথ্যা প্রমাণ করে না; বরং বিরোধিতার মধ্যে তাঁর টিকে থাকা আর বেড়ে ওঠাই আসল সাক্ষ্য।
সংক্ষেপে
- কুরআন (১০:১৭) দাবির আগের পবিত্র জীবনকে সত্যতার প্রমাণ বলেছে; হযরত মির্যা সাহেবের অতীত জীবন নিয়ে তাঁর চ্যালেঞ্জের জবাব কেউ দিতে পারেনি।
- আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারীকে আল্লাহ ছাড় দেন না (৬৯:৪৫–৪৭); তিনি ৪৫ বছরেরও বেশি ইলহামের দাবি করে আল্লাহর সাহায্য পেয়েছেন।
- অদৃশ্যের সংবাদ কেবল মনোনীত রসূলকে দেওয়া হয় (৭২:২৭–২৮); তাঁর বহু ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে।
- আল্লাহ ও তাঁর রসূলরাই বিজয়ী হন (৫৮:২২); এক ব্যক্তির ডাক আজ পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছেছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Establishing the Truthfulness of the Promised Messiah (as) from the Holy Quran · alislam.org
- Truth of The Promised Messiah (as) (Friday Sermon, 25 March 2022) · alislam.org
- The Promised Messiah – Hazrat Mirza Ghulam Ahmad · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.