কিয়ামতের আলামত: সূরা তাকভীরে আমাদের যুগের ছবি

মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামত চোখের সামনে দেখতে চাইলে সূরা তাকভীর পড়ো। পড়ে দেখুন: উট বেকার হওয়া, বই ছড়িয়ে পড়া, মানুষ এক জায়গায় জড়ো হওয়া। এ কি দূর ভবিষ্যৎ, না আমাদের চারপাশ?

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

একদিন কয়েকজন সাহাবী বসে কিয়ামত নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মহানবী (সা.) উপরের ঘর থেকে তাঁদের দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কী নিয়ে কথা বলছ? তাঁরা বললেন, কিয়ামতের কথা।

তখন তিনি একটি তালিকা দিলেন। হযরত হুযায়ফা ইবনে আসীদ আল-গিফারী (রা.) সেই কথাগুলো বর্ণনা করেছেন:

إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ. فَذَكَرَ الدُّخَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَيَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلاَثَةَ خُسُوفٍ خَسْفٌ بِالْمَشْرِقِ وَخَسْفٌ بِالْمَغْرِبِ وَخَسْفٌ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسَ إِلَى مَحْشَرِهِمْ
“তোমরা এর আগে দশটি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত তা (কিয়ামত) কখনও সংঘটিত হবে না।” তারপর তিনি উল্লেখ করলেন: ধোঁয়া, দাজ্জাল, দাব্বাহ (ভূমির জীব), পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ঈসা ইবনে মরিয়মের অবতরণ, ইয়া’জুজ ও মা’জুজ, তিনটি ভূমিধস: একটি পূর্বে, একটি পশ্চিমে, একটি আরব উপদ্বীপে; আর এসবের শেষে ইয়েমেন থেকে একটি আগুন বের হবে, যা মানুষকে তাদের সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে তাড়িয়ে নেবে।
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতিস সাআ, হাদীস ২৯০১

এই তালিকায় ঈসা ইবনে মরিয়মের অবতরণ, অর্থাৎ মসীহ্ মওউদের আগমনও একটি নিদর্শন। তাই প্রশ্ন জাগে, আমরা কীভাবে বুঝব যে সেই যুগ এসে গেছে?

কিয়ামত দেখার একটি জানালা

মহানবী (সা.) নিজেই এর একটি পথ দেখিয়ে গেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন:

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُ رَأْىُ عَيْنٍ فَلْيَقْرَأْ: إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ، وَإِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ، وَإِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ
“যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিনকে এমনভাবে দেখতে চায় যেন নিজের চোখে দেখছে, সে যেন পড়ে: ইযাশ শামসু কুওভিরাত (সূরা তাকভীর), ইযাস সামাউন ফাতারাত (সূরা ইনফিতার) এবং ইযাস সামাউন শাক্কাত (সূরা ইনশিকাক)।”
জামে তিরমিযী, আবওয়াবু তফসীরিল কুরআন, হাদীস ৩৩৩৩

চলুন, প্রথম সূরাটি খুলি। সূরা আত-তাকভীরের শুরুতে একের পর এক “যখন” দিয়ে কিছু ঘটনার কথা বলা হয়েছে:

وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ ۝ وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ ۝ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ ۝ وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ ۝ وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ ۝ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ ۝ وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ
“এবং যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলি বেকার পরিত্যক্ত হইবে, এবং যখন বন্যজন্তুগুলিকে সমবেত করা হইবে, এবং যখন নদীসমূহকে শুকাইয়া দেওয়া হইবে, এবং যখন (বিভিন্ন জাতির) লোকদিগকে একত্রিত করা হইবে, এবং যখন জীবন্ত সমাধিস্থ বালিকা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হইবে— কি অপরাধে তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে?— এবং যখন পুস্তক-পুস্তিকা (ব্যাপকভাবে) বিস্তৃত করা হইবে,”
সূরা আত-তাকভীর ৮১:৫-১১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৮১:৪-১০।

গর্ভবতী উটনী কেন কিয়ামতের দিনে?

একটু থেমে ভাবুন। যদি এগুলো শুধু কিয়ামতের দিনের দৃশ্য হয়, যেদিন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, তাহলে সেদিন গর্ভবতী উটনী বেকার পড়ে থাকার কথা আসে কীভাবে? বই-পুস্তক ছড়িয়ে দেওয়ার কথা কেন?

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছেন। তিনি বলেছেন, যারা মনে করে এসব আয়াত কিয়ামতের দিনের কথা বলছে, তারা ভেবে দেখে না যে তখন উটনী গর্ভবতী থাকবে কীভাবে। এই আয়াতগুলো বলছে, চারদিকে নদী-খাল বইয়ে দেওয়া হবে আর প্রচুর বই ছাপা হবে; তাই এসব নিদর্শন সেই যুগের, যার কথা হচ্ছে, অর্থাৎ মসীহের যুগের (মালফূযাত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০)।

দশ মাসের গর্ভবতী উটনী ছিল আরবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর প্রধান বাহন। তা বেকার হয়ে যাবে, কারণ মানুষ এমন যানবাহন পাবে যার সামনে উট আর কাজে আসবে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, এখানে রেলগাড়ির যুগের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

✦

হাদীসেও একই কথা, একই মানুষের সাথে

সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, মহানবী (সা.) উট বেকার হওয়ার কথা বলেছেন ঠিক ইবনে মরিয়মের আগমনের সাথে মিলিয়ে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন:

وَاللَّهِ لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَادِلاً فَلَيَكْسِرَنَّ الصَّلِيبَ وَلَيَقْتُلَنَّ الْخِنْزِيرَ وَلَيَضَعَنَّ الْجِزْيَةَ وَلَتُتْرَكَنَّ الْقِلاَصُ فَلاَ يُسْعَى عَلَيْهَا
“আল্লাহর কসম! ইবনে মরিয়ম অবশ্যই ন্যায়বিচারক মীমাংসাকারী হয়ে নাযিল হবেন। তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া রহিত করবেন, আর তরুণী উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে, সেগুলোতে চড়ে কেউ যাতায়াত করবে না।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস ১৫৫

কুরআন বলছে উটনী বেকার হবে; হাদীস বলছে সেটা হবে ইবনে মরিয়মের যুগে। দুটি কথা একে অপরকে ব্যাখ্যা করছে।

এবার বাকি আলামতগুলোর দিকে তাকান। খলীফাতুল মসীহ্ পঞ্চম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) এক খুতবায় এগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন: বন্য প্রাণী একত্র করে চিড়িয়াখানা বানানো হয়েছে; সাগরে সাগরে খাল কেটে যুক্ত করা হয়েছে; যোগাযোগ এত সহজ হয়েছে যে মুহূর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কথা পৌঁছে যায়, যেন সব জাতি এক জায়গায় জড়ো হয়েছে; যে নারীদের একসময় নির্মমভাবে হত্যা করা হতো, তাদের অধিকারের প্রশ্ন আজ সারা বিশ্বে উঠেছে; আর বই, পত্রিকা ও জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীজুড়ে।

এগুলোর একটিও মহানবী (সা.)-এর যুগে ছিল না। প্রায় সবগুলোই শুরু হয়েছে উনিশ শতকে, রেল, ছাপাখানা আর খালের যুগে। ঠিক সেই সময়েই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করলেন যে আল্লাহ্ তাঁকে মসীহ্ মওউদ ও ইমাম মাহদী করে পাঠিয়েছেন।

হুযায়ফা (রা.)-এর হাদীসে বাকি যে নিদর্শনগুলো আছে, যেমন দাজ্জাল, ইয়া’জুজ-মা’জুজ, ধোঁয়া, দাব্বাতুল আরদ ও পশ্চিমে সূর্যোদয়, সেগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা লেখায় বিস্তারিত আলোচনা আছে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

সূরা তাকভীর তো কিয়ামতের দিনের বর্ণনা, এখানে দুনিয়ার যুগ আসে কীভাবে?

সূরাটির শেষে অবশ্যই চূড়ান্ত হিসাবের কথা আছে: “তখন প্রত্যেক আত্মা যাহা সে হাযির করিয়াছে উহা জানিতে পারিবে” (সূরা আত-তাকভীর ৮১:১৫)। কিন্তু তার আগের আয়াতগুলোতে এমন সব ঘটনা আছে, যা দুনিয়ার স্বাভাবিক জীবন চলমান না থাকলে ঘটতেই পারে না: গর্ভবতী উটনী, বইপত্র ছাপা, মানুষের মেলামেশা, মেয়েশিশু হত্যার বিচার চাওয়া। মহানবী (সা.)-ও বলেছেন, এই সূরা পড়লে কিয়ামত যেন চোখের সামনে দেখা যায়। অর্থাৎ এর আগের নিদর্শনগুলো এত স্পষ্ট হবে যে কিয়ামত কাছে চলে এসেছে বলে মনে হবে।

উট তো এখনও আছে, মরুভূমিতে মানুষ চড়েও?

ভবিষ্যদ্বাণীর ভাষাটা লক্ষ্য করুন: “সেগুলোতে চড়ে কেউ যাতায়াত করবে না”। অর্থাৎ উট দূরযাত্রার বাহন থাকবে না। একসময় মক্কা থেকে সিরিয়া বা ইয়েমেনের বাণিজ্য কাফেলা, এমনকি হজ্জের কাফেলাও চলত উটের পিঠে। আজ হাজীরা আসেন বিমানে, বাসে, ট্রেনে। উট পৃথিবী থেকে হারায়নি, কিন্তু যাতায়াতের প্রধান বাহন হিসেবে তার যুগ শেষ।

এসব তো বিজ্ঞানের অগ্রগতি, এর সাথে মসীহের সম্পর্ক কী?

সম্পর্কটা আমরা জুড়ে দিইনি, মহানবী (সা.) নিজেই জুড়েছেন। সহীহ মুসলিমের যে হাদীস উপরে দেখলাম, সেখানে একই বাক্যে ইবনে মরিয়মের অবতরণ আর উটনী পরিত্যক্ত হওয়ার কথা আছে। চৌদ্দশো বছর আগে মরুভূমির মাঝে বসে কেউ নিজে থেকে বলতে পারত না যে উট একদিন বেকার হবে। নিদর্শন পূর্ণ হয়েছে, আর সেই সময়েই একজন দাবিকারক উপস্থিত। দুটি একসাথে মিলে যাওয়াই নিদর্শনের অর্থ।

সংক্ষেপে

  1. সহীহ মুসলিমে কিয়ামতের আগের দশটি নিদর্শনের একটি হলো ঈসা ইবনে মরিয়মের আগমন।
  2. মহানবী (সা.) কিয়ামতের ছবি দেখতে সূরা তাকভীর, ইনফিতার ও ইনশিকাক পড়তে বলেছেন (তিরমিযী ৩৩৩৩)।
  3. সূরা তাকভীরের গর্ভবতী উটনী বেকার হওয়া, বই ছড়ানো, মানুষ একত্র হওয়া কিয়ামতের দিনের নয়, এই দুনিয়ার এক যুগের নিদর্শন।
  4. সহীহ মুসলিমে উটনী পরিত্যক্ত হওয়ার কথা ইবনে মরিয়মের আগমনের সাথেই বলা হয়েছে; আর আমাদের যুগে তা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.