মদীনায় একদিন মহানবী (সা.) কয়েকজন অনারব শাসকের কাছে চিঠি পাঠাতে চাইলেন। সাহাবীরা জানালেন, ওই রাজারা মোহর ছাড়া কোনো চিঠি গ্রহণ করেন না। তখন তিনি একটি রুপার আংটি বানিয়ে নিলেন। তাতে খোদাই করা হলো: মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ।
হযরত আনাস (রা.) বলতেন, সেই আংটির ঝলক আমি যেন আজও চোখের সামনে দেখতে পাই (সহীহ বুখারী, কিতাবুল লিবাস, হাদীস ৫৮৭২)। হাদীসে এই আংটিকে বলা হয়েছে খাতাম।
কুরআনে মহানবী (সা.)-কে এই শব্দ দিয়েই সম্মানিত করা হয়েছে:
একটি যবর, একটি যের
আরবিতে শব্দটি দুইভাবে পড়া যায়। “খাতেম” (তা-এর নিচে যের) মানে যে শেষ করে বা মোহর লাগায়। আর “খাতাম” (তা-এর উপর যবর) মানে মোহর বা সিলমোহরের আংটি, যা দিয়ে ছাপ দেওয়া হয়।
কুরআনের এই আয়াতে শব্দটি এসেছে যবর দিয়ে: খাতাম। তাজুল উরূস, লিসানুল আরব আর কামূসের মতো বিখ্যাত অভিধানে খাতাম শব্দের মূল অর্থ লেখা আছে মোহর। আহমদীয়া মুসলিম জামাত তাই আয়াতের অনুবাদ করে “নবীগণের মোহর”।
মোহর কী কাজ করে?
মোহর একটি চিঠিকে প্রামাণ্য করে। মোহর দেখলেই বোঝা যায়, চিঠিটি আসল, এটি সত্যিই অমুকের কাছ থেকে এসেছে।
মহানবী (সা.) ঠিক এই অর্থে নবীগণের মোহর। পৃথিবীর সব প্রান্তে আসা সব নবীর সত্যতার সাক্ষ্য তিনি দিয়েছেন। কুরআন মুসলমানদের শিখিয়েছে আল্লাহর সব রসূলের উপর ঈমান আনতে। হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) প্রশ্ন রেখেছিলেন: আর কোন নবী নিজের জাতির বাইরের সব নবীর সত্যতা ঘোষণা করেছেন? এমন একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সত্যায়নের এই মোহর শুধু মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে।
আর ভবিষ্যতেও যদি কেউ আল্লাহর কাছ থেকে মর্যাদা পান, তাঁকে আসতে হবে এই মোহরের সত্যায়ন নিয়েই, মহানবী (সা.)-এর অনুসারী হয়ে।
“খাতাম” মানে সেরা
আরবি ভাষার আরেকটি প্রচলিত রীতি আছে। কোনো দলের নামের সঙ্গে “খাতাম” যুক্ত হলে সাধারণত অর্থ হয় সেই দলের সেরা জন। কয়েকটি উদাহরণ আলইসলাম ডট অর্গে উল্লেখ করা হয়েছে:
কবি হাসান বিন ওয়াহাব বিখ্যাত কবি আবু তাম্মামকে বলেছেন খাতামুশ শুআরা, কবিদের খাতাম (ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ইবনে খাল্লিকান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩)। আবু তাম্মাম শেষ কবি ছিলেন না। তাঁর পরে অগণিত কবি এসেছেন।
হযরত আলী (রা.)-কে বলা হয়েছে খাতামুল আউলিয়া (তফসীরে সাফী, সূরা আহযাবের ৪১ নম্বর আয়াতের অধীনে)। তাঁর পরে কি আর কোনো ওলী আসেননি? অবশ্যই এসেছেন।
মহানবী (সা.) নিজে তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-কে বলেছেন খাতামুল মুহাজিরীন (কানযুল উম্মাল, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৭৮)। অথচ তাঁর পরেও বহু মানুষ হিজরত করেছেন।
বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) লিখেছেন, “খাতাম” শব্দের অর্থ সর্বোত্তম হওয়াই আবশ্যক; মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন বলে আসলে নবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে (তফসীরে কবীর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩১)।
আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই দুই অর্থে কোনো বিরোধ নেই। যিনি নবীদের মোহর, তিনিই স্বাভাবিকভাবে নবীদের মধ্যে সেরা।
তাহলে কি “শেষ” অর্থ একেবারে ভুল?
না। আহমদী মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, মহানবী (সা.) শরীয়তের দিক থেকে শেষ নবী। কুরআনের পর আর কোনো নতুন শরীয়ত আসবে না, তাঁর শরীয়ত রহিত করার মতো কোনো নবী আসবেন না।
হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) তফসীরে সগীরে আরেকটি সুন্দর দিক দেখিয়েছেন। মিরাজের রাতে মহানবী (সা.) এক এক আসমানে এক এক নবীকে দেখেছেন, আর নিজে উঠে গেছেন সবার উপরে। পৃথিবী থেকে তাকালে প্রথমে দেখা যাবে আদম (আ.)-কে, আর সবার শেষে মুহাম্মদ (সা.)-কে। এই অর্থে তিনি শেষ, কারণ মর্যাদায় তিনিই সবার উপরে (তফসীরে সগীর, পৃষ্ঠা ৫৫১)।
তাই “খাতাম” শব্দটি কোনো সময়ের তালিকার শেষ ঘর নয়। এটি এক সিলমোহর, এক মুকুট। এই শব্দ মহানবী (সা.)-কে নবীদের সারির শেষে দাঁড় করায় না, দাঁড় করায় সবার মাথার উপরে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“খাতামুশ শুআরা” তো মানুষের দেওয়া উপাধি; কুরআনের শব্দকে কি এভাবে মাপা যায়?
প্রশ্নটি ন্যায্য। তাই দেখা যাক, মহানবী (সা.) নিজে এই শব্দকে কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন। আমরা আগেই দেখেছি, তাঁর আংটিকে হাদীসে “খাতাম” বলা হয়েছে, আর সেটি ছিল সত্যায়নের মোহর (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৮৭২)। তিনি নিজে চাচা আব্বাস (রা.)-কে “খাতামুল মুহাজিরীন” বলেছেন, অথচ হিজরত তাঁর পরে থামেনি। কুরআনের ভাষা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হলো স্বয়ং মহানবী (সা.)-এর ব্যবহার। আর সেখানে শব্দটি মোহর ও শ্রেষ্ঠত্বের অর্থেই এসেছে।
হাদীসে তো আছে “আমার মাধ্যমে নবীদের খতম করা হয়েছে”, এর কী হবে?
সহীহ মুসলিমের কিতাবুল মাসাজিদে একটি হাদীস আছে, যেখানে মহানবী (সা.) ছয়টি বিশেষ মর্যাদার কথা বলেছেন। তার একটি হলো খুতিমা বিয়ান নাবিয়্যূন। আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যায় এর অর্থ দাঁড়ায়, নবীদের ধারা তাঁর মাধ্যমে মোহরাঙ্কিত বা প্রামাণ্য হয়েছে। লক্ষ করুন, এখানে এটি এসেছে শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায়। শুধু সময়ের দিক থেকে শেষে আসা কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নয়; শ্রেষ্ঠত্ব হলো সব নবীর সত্যায়ক হওয়া আর এমন শরীয়ত পাওয়া, যা আর কখনো রহিত হবে না।
একই শব্দের দুই অর্থ, “মোহর” আর “সেরা”, একসঙ্গে কীভাবে?
আলইসলাম ডট অর্গে এর উত্তর সহজভাবে দেওয়া হয়েছে। মূল অর্থ মোহর; আর কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হলে ভাষার প্রচলিত রীতিতে অর্থ দাঁড়ায় সেই দলের সেরা। দ্বিতীয় অর্থটি প্রথমটি থেকেই জন্মায়: যিনি সবার সত্যায়নের মোহর, তিনিই স্বাভাবিকভাবে সবার সেরা। তাই দুই অর্থ পরস্পরবিরোধী নয়, একটি আরেকটিকে পূর্ণ করে।
সংক্ষেপে
- কুরআনে শব্দটি “খাতাম” (যবর দিয়ে), যার মূল অর্থ মোহর বা সিলমোহরের আংটি; মহানবী (সা.)-এর আংটিকেও হাদীসে খাতাম বলা হয়েছে।
- মোহর সত্যায়ন করে; মহানবী (সা.) অতীতের সব নবীর সত্যায়নকারী, আর ভবিষ্যতে কেউ মর্যাদা পেলে তা তাঁর মোহর নিয়েই।
- কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হলে “খাতাম” মানে সেরা: খাতামুশ শুআরা, খাতামুল আউলিয়া, খাতামুল মুহাজিরীন।
- শরীয়তের দিক থেকে তিনি শেষ নবী, আর মর্যাদার দিক থেকে সবার উপরে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Structure and Application of the word Khatam · alislam.org
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- Profound Interpretations of Khatamun-Nabiyyin by Muslim Thinkers · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.