একজন ডাক্তার রোগীকে বললেন, “আপনার ফুসফুসে পচন ধরেছে।” কথাটা শুনতে কঠিন, তিক্ত। কিন্তু কেউ কি বলবে, ডাক্তার রোগীকে গালি দিয়েছেন? তিনি তো রোগটার নাম বলেছেন, যাতে চিকিৎসা হয়।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে পুরোনো অভিযোগগুলোর একটি হলো, তিনি নাকি বিরোধীদের অকথ্য ভাষায় গালি দিয়েছেন। আজ এই অভিযোগটি শান্তভাবে খুলে দেখব।
আপত্তিটি কী
একটি আহমদী-বিরোধী পুস্তিকায় “মির্যা সাহেবের গালিগালাজ” শিরোনামে তাঁর লেখা থেকে কিছু কঠোর শব্দের একটি লম্বা তালিকা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে একটি আরবী শব্দবন্ধের উপর: যুররিয়্যাতুল বাগায়া। অভিযোগকারীরা এর অনুবাদ করেছেন একটি অত্যন্ত অপমানজনক অর্থে, আর বলেছেন যে তিনি এই শব্দে মুসলমানদের গালি দিয়েছেন।
গালি আর সত্যের বর্ণনা
প্রথমে শুনি, কঠোর ভাষা সম্পর্কে তিনি নিজে কী বলেছেন। ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, গালিগালাজ এক জিনিস, আর প্রকৃত ঘটনার বিবরণ, তা যত অপ্রিয় ও তিক্তই হোক, আরেক জিনিস। প্রত্যেক সত্যবাদীর দায়িত্ব হলো সত্য কথা উদাসীন বিরোধীর কানে পৌঁছে দেওয়া, তাতে বিরোধী অসন্তুষ্ট হলে হোক (রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, ইযালায়ে আওহাম, পৃষ্ঠা ২০)।
এই পার্থক্য কুরআনেও দেখা যায়। যারা সত্যকে জেনেশুনে অস্বীকার করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
আল্লাহর এই বাণীকে কেউ গালি বলেন না, বলেন সত্যের কঠোর বর্ণনা। নবীদের মুখেও এমন কঠোর বাক্য এসেছে:
হযরত দাউদ (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর মুখে অভিশাপ এসেছে বলে কেউ তাঁদের নবুওয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। কারণ এটি ছিল অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ।
“যুররিয়্যাতুল বাগায়া”: শব্দটি কোথায়, কী অর্থে
এবার মূল শব্দটিতে আসি। এটি আছে তাঁর আরবী রচনা আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম-এ (১৮৯৩)। সেখানে তিনি নিজের ইসলাম-সেবার কথা বলেছেন: আর্য সমাজ ও খ্রিস্টানদের জবাবে লেখা তাঁর বইগুলো মুসলমানরা শ্রদ্ধার চোখে দেখে, এবং তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করে, “যুররিয়্যাতুল বাগায়া ছাড়া, যাদের হৃদয়ে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন, তাই তারা গ্রহণ করে না।” (রূহানী খাযায়েন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৮)
লক্ষ করুন, একই বাক্যেই শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া আছে: যাদের হৃদয়ে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। অভিধান তাজুল উরূস অনুযায়ী এর অর্থ হেদায়াত থেকে বঞ্চিত লোক, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে এর অর্থ করেছেন দুষ্কৃতকারীদের বংশধর। আরেক জায়গায় তিনি এক বিরোধীকে “ইবনু বাগা” বলে সম্বোধন করে নিজেই অনুবাদ করেছেন, “হে বিদ্রোহী মানুষ”।
আরবীতে এমন বাগধারা খুব প্রচলিত। “ইবনুস সাবীল” মানে আক্ষরিকভাবে “পথের সন্তান”, কিন্তু কুরআনে এর অর্থ মুসাফির। কেউ এর আক্ষরিক অনুবাদ করলে তা হাস্যকর ভুল হবে। লেখক নিজে যখন নিজের শব্দের অর্থ বলে দিয়েছেন, তখন অন্য অর্থ চাপানোর অধিকার কারও নেই।
আরও একটি বিষয়। এই একই বইয়ে তিনি মুসলমানদের আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন রানী ভিক্টোরিয়ার ইসলাম গ্রহণের জন্য দোয়া করেন, আর আধ্যাত্মিক আলেমদের নবীদের উত্তরাধিকারী বলে প্রশংসা করেছেন। যে বইয়ে মুসলমানদের প্রতি এত মমতা, সেখানেই তাদের গালি দেওয়ার কথা যুক্তিতে টেকে না।
কঠোরতার শুরু কোথা থেকে
তাঁর নিজের ব্যাখ্যা হলো: তাঁর লেখায় বিরোধীদের বিরুদ্ধে কিছু কঠোরতা এসেছে, কিন্তু কঠোরতার সূচনা তিনি করেননি; সেই লেখাগুলো ছিল বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের জবাব (কিতাবুল বারিয়্যাহ)। একই জায়গায় তিনি দুটি কারণ বলেছেন: যাতে বিরোধীরা নিজেদের ভাষা সংযত করে, আর সাধারণ মুসলমানরা উত্তেজিত হয়ে কোনো বর্বর প্রতিশোধে না নামে। কিতাবুল বারিয়্যাহতে তিনি বিরোধীদের লেখা আর নিজের জবাব পাশাপাশি তুলে ধরেছেন, যাতে পাঠক নিজেই বিচার করতে পারেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
একজন নবীর কি কঠোর ভাষা ব্যবহার করা শোভা পায়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, প্রকৃত নবী সবসময় কোমল ভাষায় কথা বলেন। চলুন দেখি। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশ প্রতিনিধি উরওয়া সাহাবীদের সম্পর্কে অপমানজনক মন্তব্য করে বলেছিল, এরা বিপদে মহানবী (সা.)-কে ছেড়ে পালাবে। তখন মহানবী (সা.)-এর উপস্থিতিতেই হযরত আবু বকর (রা.) তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুশ শুরূত, হাদীস ২৭৩১)। কেউ একে হযরত আবু বকর (রা.)-এর চরিত্রের দোষ বলেন না। সবাই বোঝেন, এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষার আত্মমর্যাদা।
শেষ যুগের আলেমদের সম্পর্কে কঠোর কথা কি মুসলমানদের অপমান নয়?
শেষ যুগের কিছু আলেম সম্পর্কে সবচেয়ে কঠোর কথা মহানবী (সা.) নিজেই বলে গেছেন। মিশকাতুল মাসাবীহর কিতাবুল ইলমে একটি হাদীস আছে, শেষ যুগে কিছু আলেম আকাশের নিচে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হবে; তাদের থেকেই ফিতনা বের হবে আর তাদের দিকেই ফিরে যাবে। এটি সব আলেমের কথা নয়, বরং সেইসব লোকের কথা যারা ফিতনা ছড়ায়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-ও সৎ আলেমদের প্রশংসা করেছেন, আর কঠোর হয়েছেন শুধু তাদের প্রতি, যারা গালি আর মিথ্যা অপবাদে নেমেছিল।
তিনি কি সব মুসলমানকে এই শব্দে সম্বোধন করেছেন?
না। বাক্যটি নিজেই বলছে, অধিকাংশ মুসলমান তাঁর বইগুলোকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে; ব্যতিক্রম শুধু তারা, যাদের হৃদয়ে মোহর পড়ে গেছে। কোনো একটি ক্ষুদ্র দলের কথাকে সব মুসলমানের উপর চাপিয়ে দেওয়া বাক্যটির অর্থ বদলে দেওয়ার শামিল।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই গালি আর তিক্ত সত্যের বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য করেছেন (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন ৩, পৃ. ২০)।
- কুরআন ও নবীদের ভাষাতেও সত্য অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে কঠোর বাক্য আছে (৯৮:৭, ৫:৭৯)।
- “যুররিয়্যাতুল বাগায়া”-র অর্থ তিনি নিজেই দিয়েছেন: যাদের হৃদয়ে মোহর পড়েছে, বিদ্রোহী ও দুষ্কৃতকারী; এটি সব মুসলমানের জন্য নয়।
- কঠোরতার সূচনা বিরোধীদের পক্ষ থেকে হয়েছিল; তাঁর জবাব ছিল প্রতিরক্ষামূলক, আর উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানো।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Opponents of the Promised Messiah · alislam.org
- আপত্তি: মির্যা সাহেব বিরূদ্ধবাদীদের গালি গালাজ করেছেন · ahmadiyyabangla.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.