কেউ যদি বলে, “আমি এটি তোমার কাছে পাঠিয়েছি”, তখন প্রথম প্রশ্ন হয়: “এটি” কী? চিঠি, উপহার, নাকি খবর? সর্বনামের অর্থ বোঝা যায় প্রসঙ্গ থেকে। প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো অর্থ বসালে কথার মানে সম্পূর্ণ বদলে যায়।
আজকের আপত্তিটি একটি ছোট্ট সর্বনাম নিয়ে: আরবি “হু”, অর্থাৎ “একে”।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে বলা হয়, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কাছে এই ওহী এসেছে: “কুরআনকে আমি কাদিয়ানের কাছে অবতীর্ণ করেছি।” সূত্র: তাযকিরাহ, পৃষ্ঠা ৫৯ (৪র্থ সংস্করণ)। এতে বোঝানো হয়, তিনি কুরআনের সাথে কাদিয়ানকে জুড়ে নিজের মর্যাদা বাড়াতে চেয়েছেন।
ইলহামটি পুরোটা
ইলহামটি আরবিতে। তার উচ্চারণ: “ইন্না আনযালনাহু কারীবাম মিনাল কাদিয়ান, ওয়া বিল হাক্কি আনযালনাহু ওয়া বিল হাক্কি নাযালা, সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহু, ওয়া কানা আমরুল্লাহি মাফঊলা।”
পুরো বাক্যটি আবার পড়ুন। এতে “কুরআন” শব্দটি কোথাও নেই। আছে শুধু “আনযালনাহু”, অর্থাৎ “আমরা একে নাযিল করেছি”।
তাহলে “একে” মানে কী? ইলহামপ্রাপক নিজেই এর অর্থ লিখে দিয়েছেন। তাঁর অনুবাদ এমন: “আমরা এই নিদর্শনাবলি ও অলৌকিক বিষয়সমূহ, এবং প্রজ্ঞা ও তত্ত্বে ভরা এই ইলহামকে কাদিয়ানের নিকটে নাযিল করেছি। আমরা একে প্রকৃত প্রয়োজনে নাযিল করেছি, আর তা প্রকৃত প্রয়োজনেই নাযিল হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী তার নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ হয়েছে। আল্লাহর আদেশ কার্যকর হওয়ারই ছিল।” (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৮, পাদটীকা; রূহানী খাযায়েন ১ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৩)
অর্থাৎ “একে” মানে কুরআন নয়; মানে তাঁর কাছে আসা নিদর্শন আর ইলহাম। কুরআনের ওপর ভিত্তি করে তিনি যে জ্ঞান আর তত্ত্ব পেয়েছেন, তা নাযিল হয়েছে কাদিয়ানের কাছে, যেখানে তিনি থাকতেন।
কাদিয়ানের উল্লেখ কেন?
তাযকিরাহর একই পৃষ্ঠার পাদটীকায় ইযালায়ে আওহাম (পৃষ্ঠা ৭৩-৭৫, রূহানী খাযায়েন ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৮-১৩৯) থেকে তাঁর ব্যাখ্যা আছে: এই ইলহামে কাদিয়ানের উল্লেখ ইঙ্গিত দেয় যে কাদিয়ানে তাঁর আবির্ভাবের কথা আগের গ্রন্থগুলোতে বলা ছিল। আল্লাহর দৃষ্টিতে কাদিয়ান দামেস্কের সদৃশ; আর তিনি থাকতেন কাদিয়ানের পূর্ব প্রান্তে।
কেন দামেস্ক? কারণ মহানবী (সা.) প্রতিশ্রুত মসীহের আগমনের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন:
ইলহামের শেষাংশ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে” এই হাদীসের দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি নিজের আবির্ভাবস্থল কাদিয়ানকে, যা দামেস্কের পূর্ব দিকে, এই ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“ইন্না আনযালনাহু” তো কুরআনের ভাষা; এটা কি কুরআনের সাথে নিজেকে মেলানো নয়?
“আনযালনা” (আমরা নাযিল করেছি) শব্দটি কুরআনে শুধু কুরআনের জন্য আসেনি। আল্লাহ বলেন:
আরেক জায়গায়: “হে আদম সন্তানগণ! আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক নাযেল করিয়াছি…” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:২৭)। লোহা নাযিল হয়, পোশাক নাযিল হয়, কুরআনের বাইরেও আল্লাহর অনেক দান “নাযিল” হয়। তাই “আনযালনাহু” দেখেই কুরআন ধরে নেওয়া ঠিক নয়, বিশেষ করে যখন ইলহামপ্রাপক নিজেই বলে দিয়েছেন “একে” মানে কী।
তিনি কি স্বপ্নে কুরআনে কাদিয়ানের নাম লেখা দেখেননি?
হ্যাঁ, তাযকিরাহতে একটি কাশফ (দিব্যদর্শন) বর্ণিত আছে। একই দিনে তিনি দেখেন, তাঁর ভাই মির্যা গোলাম কাদির উচ্চস্বরে কুরআন পড়ছেন, আর তাতে এই বাক্যটি আছে। তিনি বিস্মিত হলেন, আর কাশফের মধ্যেই বললেন, কুরআনে তিনটি নাম সম্মানের সাথে এসেছে: মক্কা, মদীনা আর কাদিয়ান। (ইযালায়ে আওহাম, পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭, পাদটীকা; রূহানী খাযায়েন ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪০)
কিন্তু এটি স্বপ্নসদৃশ দর্শন, যার ব্যাখ্যা লাগে। তিনি নিজেই পাদটীকায় লিখেছেন, ভাইকে দেখার অর্থ তাঁর নামের সাথে সম্পর্কিত: “কাদির” (শক্তিমান) নাম ইঙ্গিত দেয় যে এ সব সর্বশক্তিমান আল্লাহর ফয়সালা। এটি দর্শনের ভেতরের দৃশ্য, ছাপা কুরআনের কোনো আয়াতের দাবি নয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যা যে আক্ষরিক হয় না, কুরআনই তার সাক্ষী: ইউসুফ (আ.) দেখেছিলেন এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য আর চাঁদ তাঁকে সেজদা করছে (সূরা ইউসুফ ১২:৫); বাস্তবে তার অর্থ ছিল তাঁর পরিবার (১২:১০১)।
তাহলে কি তিনি কুরআনের মর্যাদা কমিয়েছেন?
বরং উল্টো। এই ইলহামের ঠিক পরের ইলহাম, যা তাযকিরাহতে আছে: “মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের বংশধরদের প্রতি দরূদ পাঠাও, যিনি আদম সন্তানদের নেতা ও খাতামান নাবিয়্যীন।” আর তাঁর ব্যাখ্যা: এ সব অনুগ্রহ ও মর্যাদা মহানবী (সা.)-এর কারণে, তাঁকে ভালোবাসার পুরস্কার। যিনি নিজের সব প্রাপ্তি মহানবী (সা.)-এর দান বলেন, তিনি কুরআনের জায়গা নেওয়ার দাবি করেননি।
ওহীতে একটি গ্রামের নাম আসা কি অস্বাভাবিক?
মোটেই না। আল্লাহর বাণীতে স্থানের নাম আসে, যেখানে তাঁর সাহায্য বা নিদর্শন প্রকাশিত হয়। পবিত্র কুরআন বলে: “এবং (ইতিপূর্বে) বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে তখন আল্লাহ্ তোমাদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন” (সূরা আলে ইমরান ৩:১২৪); আর “নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদিগকে বহু রণক্ষেত্রে সাহায্য করিয়াছেন এবং হুনায়নের দিবসেও” (সূরা আত-তাওবা ৯:২৫)। বদর আর হুনায়ন ছিল আরবের সাধারণ জায়গা; আল্লাহর নিদর্শনের কারণে নাম দুটি অমর হয়ে গেছে।
কাদিয়ানের উল্লেখও এই অর্থে: এখানে আল্লাহর নিদর্শন আর ইলহাম নেমেছে। এতে কুরআনের সাথে কোনো প্রতিযোগিতা নেই; আছে একটি স্থানের সাক্ষ্য।
শেষ কথা
যে ইলহামে “কুরআন” শব্দটিই নেই, তাকে “কুরআন কাদিয়ানে নাযিল হয়েছে” বলে অনুবাদ করা ঠিক নয়। ইলহামপ্রাপক নিজে লিখে গেছেন: যা নাযিল হয়েছে তা নিদর্শন আর প্রজ্ঞাপূর্ণ ইলহাম, আর তা পূর্ণ করেছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী।
সংক্ষেপে
- ইলহামে “কুরআন” শব্দটি নেই; আছে “আনযালনাহু” (আমরা একে নাযিল করেছি)।
- তাঁর নিজের অনুবাদে “একে” মানে নিদর্শনাবলি আর প্রজ্ঞাপূর্ণ ইলহাম (বারাহীনে আহমদীয়া ৪র্থ খণ্ড; রূহানী খাযায়েন ১/৫৯৩)।
- কাদিয়ানের উল্লেখকে তিনি দামেস্কের পূর্বে শ্বেত মিনারের হাদীসের (মুসলিম ২৯৩৭) পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
- কুরআনে লোহা আর পোশাকও “নাযিল” হওয়ার কথা আছে (৫৭:২৬; ৭:২৭); তাই শব্দটি দেখেই কুরআন ধরে নেওয়া ভুল।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Tadhkirah · alislam.org
- Tadhkirah (English, PDF) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.