উনিশ শতকের শেষভাগ। কাদিয়ানের কাছেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কিছু নিকটাত্মীয় থাকতেন। তাঁরা শুধু ধর্ম থেকে দূরে ছিলেন না, ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্যে ঠাট্টা করতেন। এই পরিবারের প্রধান মির্যা আহমদ বেগ ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করতেন, কুরআনে সন্দেহ পোষণ করতেন, এমনকি আল্লাহর অস্তিত্বও অস্বীকার করতেন। তাঁরা হযরত মির্যা সাহেবের কাছে আল্লাহর অস্তিত্বের নিদর্শন চেয়েছিলেন।
এই প্রেক্ষাপট না জানলে ভবিষ্যদ্বাণীটি বোঝা অসম্ভব।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে মির্যা আহমদ বেগের কন্যা মুহাম্মদী বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হবে। তিনি একটি ইলহাম “বিকরুন ওয়া সাইয়্যেবুন” (কুমারী ও বিধবা) থেকেও এই অর্থ করেছিলেন যে, একজন কুমারী ও পরে একজন বিধবা তাঁর স্ত্রী হবেন। কিন্তু মুহাম্মদী বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়নি। তাই তাঁদের দাবি, ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
মূল ভবিষ্যদ্বাণী: শাস্তি, তবে শর্তসহ
বিরোধী লেখায় সাধারণত যে অংশটি দেখানো হয় না, তা হলো মূল ভবিষ্যদ্বাণী। আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম (১৮৯৩) গ্রন্থের ৫৬৬-৫৬৭ পৃষ্ঠায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই পরিবারের অবস্থা বর্ণনা করেছেন, আর ৫৬৯ পৃষ্ঠায় তাদের সম্পর্কে প্রাপ্ত ইলহামের অনুবাদ দিয়েছেন। তার ভাব এমন: আমি তাদের অবাধ্যতা দেখেছি, তাদের নানা বিপদে ফেলব; কিন্তু তাদের এক নিমিষে ধ্বংস করব না, বরং পর্যায়ক্রমে শাস্তি দেব, যেন তারা ফিরে আসে এবং তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৮৮৮ সালের জুলাইয়ের ঘোষণায় ইলহামের শব্দ ছিল: “তওবা করো, তওবা করো, কারণ বিপদ তোমার উপর এসে পড়ছে।” সেখানে বলা হয়েছিল, আহমদ বেগ যদি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে সে একের পর এক বিপদে পড়বে, যার শেষটি হবে তিন বছরের মধ্যে তার মৃত্যু।
অর্থাৎ পুরো ভবিষ্যদ্বাণীর কেন্দ্রে ছিল একটি সতর্কবাণী, আর তার সঙ্গে ছিল একটি শর্ত: তওবা। বিয়ের প্রস্তাবটি ছিল সেই সতর্কবাণীর অংশ, যাতে এই পরিবার আল্লাহর জীবন্ত নিদর্শনের কাছে এসে রক্ষা পায়। মহানবী (সা.)-ও ইসলামের ঘোর শত্রু আবু সুফিয়ানের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, যার মাধ্যমে সেই পরিবার নবুওয়তের আলোর কাছে এসেছিল।
তারপর যা ঘটল
মির্যা আহমদ বেগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মুহাম্মদী বেগমকে মির্যা সুলতান মুহাম্মদের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই, ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, মির্যা আহমদ বেগ মারা গেলেন। এতে পুরো পরিবার গভীরভাবে নাড়া খেল। তারা ভয় পেল, অনুতপ্ত হলো, তওবা করল।
ভবিষ্যদ্বাণীর সবচেয়ে কঠোর বিরোধীদের একজন মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন বাটালভীও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে, যদিও তিনি বলেছিলেন তা নাকি ইলহামে নয়, জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে হয়েছে (ইশাআতুস সুন্নাহ, ৫ম খণ্ড)।
পরিবার তওবা করায় শর্ত অনুযায়ী বাকি শাস্তি স্থগিত হয়ে গেল। মুহাম্মদী বেগমের স্বামী সুলতান মুহাম্মদ বেঁচে রইলেন। তাঁর একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, তিনি প্রয়াত মির্যা সাহেবকে সবসময় একজন নেক ও সম্মানিত মানুষ মনে করে এসেছেন।
আর সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য: যে পরিবারের বিরুদ্ধে এই সতর্কবাণী ছিল, তাদের অনেকেই পরে আহমদীয়া মুসলিম জামাতে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মির্যা আহমদ বেগের বিধবা স্ত্রী, অর্থাৎ মুহাম্মদী বেগমের মা, আহমদ বেগের পুত্র, কয়েকজন কন্যা, নাতি এবং দুই জামাতা। মুহাম্মদী বেগমের পুত্র মির্যা ইসহাক বেগও আহমদীয়া মুসলিম জামাতে যোগ দেন। কোনো মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণীর শিকার পরিবার কি এভাবে সেই ব্যক্তিকে সত্য বলে গ্রহণ করে?
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
শাস্তির ভবিষ্যদ্বাণী কি বদলাতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী একবার করা হলে তা হুবহু ঘটতেই হবে। চলুন কুরআন দেখি। শাস্তির সতর্কবাণী তওবায় সরে যায়, এটি আল্লাহর সুন্নত:
হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতির কথাও কুরআন বলেছে:
হযরত ইউনুস (আ.) তাঁর জাতির উপর শাস্তির খবর দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা ঈমান আনায় শাস্তি সরে গেল। কেউ বলেন না যে হযরত ইউনুস (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা ছিল। এখানেও একই নিয়ম কাজ করেছে।
তিনি নিজেই তো বিয়ে হবে বলে বুঝেছিলেন, তাহলে?
সত্য, তিনি দীর্ঘদিন তা-ই বুঝেছিলেন। কিন্তু নবীদের নিজস্ব অনুমান (ইজতিহাদ) আর আল্লাহর প্রকৃত অভিপ্রায় সবসময় এক রকম হয় না, আর এতে তাঁদের সত্যতা কমে না। হযরত নূহ (আ.) ভেবেছিলেন, তাঁর পুত্র “পরিবারের” অন্তর্ভুক্ত বলে রক্ষা পাবে:
মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি খেজুর বাগানের দেশে হিজরত করছেন; ভেবেছিলেন তা ইয়ামামা বা হাজার, কিন্তু তা ছিল মদীনা (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৬২২)। তিনি স্বপ্নে নিজেদের মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে দেখে উমরার জন্য রওনা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই বছর তা হয়নি; পরে আল্লাহ জানালেন, স্বপ্নটি সত্যই ছিল (সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৮)। ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণ অর্থ অনেক সময় ঘটনার পরেই খোলে।
“কুমারী ও বিধবা” ইলহামের কী হলো?
পরবর্তী ঘটনা দেখিয়েছে, এই ইলহাম পূর্ণ হয়েছে তাঁর সহধর্মিণী হযরত নুসরত জাহান বেগম (রা.)-এর মাধ্যমে। তিনি কুমারী অবস্থায় তাঁর স্ত্রী হয়ে এসেছিলেন, আর স্বামীর ইন্তেকালের পর বিধবা হিসেবে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন। একই ব্যক্তির মধ্যে দুটি অবস্থাই পূর্ণ হয়েছে।
সংক্ষেপে
- ভবিষ্যদ্বাণীটি ছিল ধর্মবিদ্বেষী এক পরিবারের জন্য সতর্কবাণী, যার কেন্দ্রে ছিল তওবার শর্ত।
- মির্যা আহমদ বেগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং কন্যার বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মারা যান।
- পরিবার তওবা করায় বাকি শাস্তি স্থগিত হয়; কুরআনেও শাস্তির সতর্কবাণী তওবায় সরে যাওয়ার নিয়ম আছে (৮:৩৪, ১০:৯৯)।
- সেই পরিবারের বহু সদস্য পরে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন, আর মুহাম্মদী বেগমের স্বামী তাঁকে নেক মানুষ বলে স্বীকার করেন।
- “কুমারী ও বিধবা” ইলহাম হযরত নুসরত জাহান বেগম (রা.)-এর মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Prophecy relating to Muhammadi Begum · alislam.org
- আপত্তি: মুহাম্মদী বেগম এবং আহমদ বেগ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়নি · ahmadiyyabangla.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.