দাজ্জালের কথা উঠলেই চোখে ভাসে এক ভয়ংকর ছবি। এক চোখ কানা এক বিশাল মানুষ, কপালে লেখা “কাফির”, সঙ্গে আগুন আর পানি, বাতাসের বেগে পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। অনেকে আজও অপেক্ষায় আছেন, কবে এই দানব কোনো দ্বীপ থেকে বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক: মহানবী (সা.) দাজ্জালকে কোথায় দেখেছিলেন?
দৃশ্যটি ছিল একটি স্বপ্ন
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
এই একই স্বপ্নে এরপর তিনি আরেকজনকে দেখলেন: লালচে, ভারী দেহের, কোঁকড়া চুলের, ডান চোখ কানা একজন মানুষ। জিজ্ঞেস করলে বলা হলো, এ দাজ্জাল।
লক্ষ্য করুন, হাদীসটি শুরু হয়েছে “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম” দিয়ে। এটি একটি স্বপ্ন, নবীর সত্য স্বপ্ন। আর স্বপ্নের ভাষা হয় প্রতীকের ভাষা। মহানবী (সা.) নিজেই আরেকটি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি খেজুর গাছে ভরা এক দেশে হিজরত করছেন। তিনি ভেবেছিলেন সেটি ইয়ামামা বা হাজার, কিন্তু পরে দেখা গেল সেটি মদীনা (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৬২২)। একই স্বপ্নে তিনি একটি তলোয়ার ভেঙে যেতে দেখেছিলেন, যার অর্থ ছিল উহুদের দিনের বিপদ।
স্বপ্নে দেখা তলোয়ার যদি তলোয়ার না হয়ে একটি যুদ্ধের পরিণতি হয়, তাহলে স্বপ্নে দেখা দাজ্জালও আক্ষরিক এক দানব না হয়ে একটি বড় বাস্তবতার প্রতীক হতে পারে।
কুরআনে দাজ্জালের পরিচয়
কুরআনে “দাজ্জাল” শব্দটি নেই। কিন্তু মহানবী (সা.) নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন কুরআনের কোথায় এর রক্ষাকবচ আছে। হযরত আবুদ দারদা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন: “যে সূরা কাহফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জাল থেকে রক্ষা পাবে” (সহীহ মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন, হাদীস ৮০৯)।
প্রশ্ন হলো, শুধু মুখস্থ করলেই রক্ষা? কুরআন কোনো তাবিজ নয়। ওই দশ আয়াত খুললে দেখা যায়, সেখানে একটি বিশেষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে:
দাজ্জাল থেকে বাঁচার আয়াতগুলো সতর্ক করছে তাদের, যারা বলে আল্লাহর পুত্র আছে। অর্থাৎ দাজ্জালের ফিতনা হলো একজন মানুষকে খোদা বানানোর মিথ্যা, যে মিথ্যা প্রচার করে বেড়ায় এক বিশাল দল।
মহানবী (সা.) বলেছেন, এমন কোনো নবী আসেননি যিনি তাঁর উম্মতকে এই “কানা মিথ্যাবাদী” সম্পর্কে সতর্ক করেননি (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৭১৩১)। অর্থাৎ এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিতনা। আর কুরআনে কোন মিথ্যাকে সবচেয়ে ভয়ংকর বলা হয়েছে? সূরা মরিয়মে আল্লাহ্ বলেন, তারা রহমান আল্লাহর প্রতি পুত্র আরোপ করেছে বলে “আকাশসমূহ ফাটিয়া যাইবার ও পৃথিবী বিদীর্ণ হইবার এবং পর্বতমালা খণ্ডবিখণ্ড হইয়া পড়িয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে” (সূরা মারইয়াম ১৯:৯১-৯২)।
হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এখান থেকেই সিদ্ধান্ত টেনেছেন: সবচেয়ে বড় দাজ্জাল সেই দল, যারা একজন মানুষকে খোদা বানায়; কারণ আল্লাহ্ নিজের বাণীতে এই মিথ্যাকেই এত গুরুতর বলেছেন যে আকাশ ফেটে যাওয়ার উপক্রম (আনজামে আথম, রূহানী খাযায়েন, ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৮)।
দাজ্জাল একজন নয়, একটি দল
আরবি অভিধানেও “দাজ্জাল” শব্দটি দলের অর্থে আসে: চরম প্রতারক, যারা মিথ্যার উপর সত্যের প্রলেপ দেয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, দাজ্জাল কোনো এক ব্যক্তির নাম নয়; অভিধান অনুযায়ী এটি এমন একদল মানুষ, যারা নিজেদের বিশ্বস্ত ও পুণ্যবান বলে দেখায়, অথচ তাদের কথায় থাকে প্রতারণা। তিনি এর মধ্যে খ্রিষ্টান প্রচারক পাদ্রিদের সেই অংশকে চিহ্নিত করেছেন, যারা বিকৃত শিক্ষা ছড়ায় (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৩-২৪৪, পাদটীকা)।
খলীফাতুল মসীহ্ পঞ্চম (আই.) এক খুতবায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ভ্রান্ত খ্রিষ্টীয় মতবাদের যে আক্রমণ ঈমানের উপর এসেছে, সেটিকেই হাদীসে দাজ্জালের আক্রমণ বলা হয়েছে; আর এর সামনে মসীহ্ মওউদের প্রধান কাজ ঈমানকে আবার জীবিত করা।
এবার হাদীসের প্রতীকগুলো মিলিয়ে দেখুন। দাজ্জালের ডান চোখ কানা: সে দুনিয়ার চোখে তীক্ষ্ণ, কিন্তু ধর্মের চোখে অন্ধ। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, এরা তারা যাদের আছে কেবল দুনিয়ার চোখ, ঈমানের চোখ থেকে তারা বঞ্চিত (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪১-১৪৩, পাদটীকা)। হযরত নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে আছে, দাজ্জাল পৃথিবীতে চলবে “বাতাসে তাড়িত বৃষ্টির মতো” দ্রুত (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭)। আজ যে জাতিগুলো বিমান আর জাহাজে পৃথিবী চষে বেড়ায়, তাদের দিকে তাকালে এই ছবি অচেনা লাগে না।
মসীহ্ দাজ্জালকে কীভাবে পরাজিত করবেন
সহীহ মুসলিমে আছে, আল্লাহর শত্রু দাজ্জাল যখন ঈসা ইবনে মরিয়মকে দেখবে, “পানিতে লবণ যেভাবে গলে যায়, সেভাবে গলে যাবে” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৮৯৭)। লবণ গলে যায় তলোয়ারের আঘাতে নয়, পানির সংস্পর্শে।
হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মসীহ্ দাজ্জালকে হত্যা করবেন, এর অর্থ বন্দুক বা তলোয়ার দিয়ে হত্যা নয়; বরং ধর্মের সব প্রতারণাপূর্ণ বিদআতের অবসান ঘটানো। তিনি অকাট্য যুক্তির অস্ত্রে ক্রুশের মহিমা ভেঙে দেবেন। ঠিক তা-ই তিনি করেছেন: কুরআন ও ইতিহাস দিয়ে দেখিয়েছেন যে ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। ঈসা (আ.)-এর খোদা হওয়ার বিশ্বাসের মূল ভিত্তিটাই এতে ধসে যায়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
হাদীসে দাজ্জালের চেহারার এত বর্ণনা, তবুও কি সে এক ব্যক্তি নয়?
চেহারার বর্ণনা এসেছে স্বপ্নের দৃশ্য থেকে। স্বপ্নে প্রায়ই একজন মানুষকে দেখানো হয়, আর তার অর্থ হয় একটি জাতি বা দল। ঠিক যেমন স্বপ্নে দেখা গাভীগুলো ছিল উহুদের শহীদ মু’মিনদের দল। তা ছাড়া একটি সহজ প্রশ্ন ভাবুন। সহীহ মুসলিমে তামীম দারী (রা.)-এর একটি বর্ণনা আছে, যেখানে এক দ্বীপে শিকলে বাঁধা একজনকে দাজ্জাল বলা হয়েছে (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৪২)। অথচ মহানবী (সা.) জীবনের শেষ দিকে এক রাতে বলেছিলেন, আজ রাতে পৃথিবীর বুকে যারা আছে, একশো বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাদের কেউ বেঁচে থাকবে না (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম, হাদীস ১১৬)। দুটিকে আক্ষরিক অর্থে মেলানো যায় না। প্রতীকী অর্থ নিলেই বর্ণনাগুলো একে অপরের সাথে মেলে।
দাজ্জাল কা‘বা তাওয়াফ করবে কীভাবে? সে কি মুসলমান হয়ে যাবে?
বুখারীর স্বপ্নে ইবনে মরিয়ম আর দাজ্জাল দুজনই কা‘বা তাওয়াফ করছিল। আক্ষরিক অর্থ নিলে মানতে হয় দাজ্জাল মক্কায় ঢুকে মুসলমানের মতো তাওয়াফ করবে, যা অন্য হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এর সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: রাতে পাহারাদারও বাড়ির চারপাশে ঘোরে, চোরও ঘোরে। পাহারাদারের উদ্দেশ্য বাড়ি রক্ষা করা, চোরের উদ্দেশ্য সিঁধ কাটা। দাজ্জাল ইসলামের কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরবে তা ধ্বংস করার সুযোগ খুঁজতে, আর মসীহ্ মওউদ ঘুরবেন তা রক্ষা করতে ও চোরকে ধরতে (আইয়ামুস সুলহ, রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৪-২৭৫)।
খ্রিষ্টানদের দাজ্জাল বলা কি বিদ্বেষ নয়?
না। এখানে কোনো সাধারণ খ্রিষ্টান মানুষকে ঘৃণা করার কথা বলা হচ্ছে না। কথাটি একটি মতবাদ আর তার সংগঠিত প্রচার নিয়ে: একজন মানুষকে খোদা বানানো, আর সেই শিক্ষা প্রতারণার মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে ছড়ানো। উনিশ শতকে ভারতবর্ষে ঠিক এমন প্রচারই চলছিল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এর জবাব দিয়েছেন তলোয়ারে নয়, বই, যুক্তি আর দোয়ায়। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের মূলমন্ত্রও তাই: সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি ঘৃণা নয়।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখেছিলেন; স্বপ্নের দৃশ্য ব্যাখ্যা চায়, যেমন তাঁর হিজরত ও উহুদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হয়েছিল।
- দাজ্জাল থেকে রক্ষার জন্য যে কাহফের আয়াত পড়তে বলা হয়েছে, তা সতর্ক করে যারা আল্লাহর পুত্র আছে বলে তাদের বিরুদ্ধে।
- আরবি অভিধান ও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ব্যাখ্যায় দাজ্জাল একটি প্রতারক দল, যারা মানুষকে খোদা বানানোর মতবাদ প্রচার করে।
- মসীহ্ দাজ্জালকে পরাজিত করবেন যুক্তি আর আসমানী নিদর্শনে, যেভাবে পানিতে লবণ গলে যায়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Essence of Islam, Volume III (Dajjal or the Antichrist) · alislam.org
- The Promised Messiah and Mahdi (as) (Friday Sermon, 24 March 2023) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.