কবিরা আবেগে কথা বলেন। প্রিয়জনকে চাঁদের সাথে তুলনা করেন, দুঃখকে সাগরের সাথে। এই ভাষার সৌন্দর্য আছে, কিন্তু আকিদা বা বিশ্বাসের প্রশ্নে কেউ কবিতার পঙক্তিকে আইনের ধারা বানায় না।
কোনো মুসলমান কবি আবেগে বাড়াবাড়ি করে ফেললে আমরা কি বলি, “এটাই ইসলামের আকিদা”? বলি না। আমরা কুরআন আর হাদীস দেখি। আজকের আপত্তিটিও এমনই এক কবিতা নিয়ে।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে উর্দু পত্রিকা বদর-এ (কাদিয়ান, ২৫ অক্টোবর ১৯০৬) ছাপা একটি কবিতার অনুবাদ দেওয়া হয়: “মুহাম্মদ পুনরায় আগমন করেছেন আমাদের মধ্যে, এবং পূর্বের থেকেও নিজ মর্যাদায় আরও অগ্রসর হয়েছেন। যে পূর্ণাঙ্গ মুহাম্মদকে দেখতে চাও, সে কাদিয়ানে গোলাম আহমদকে দেখে যাও।”
এরপর প্রশ্ন তোলা হয়: আহমদী মুসলমানদের কাছে কি তাহলে মির্যা সাহেব পূর্ণাঙ্গ, আর মহানবী (সা.) অপূর্ণাঙ্গ? নাউযুবিল্লাহ।
কবিতাটি কার?
এই পঙক্তিগুলো হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা নয়। এগুলো কাজী মুহাম্মদ যহুরুদ্দীন আকমল নামের একজন কবির। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের আকিদা কোনো কবির কবিতা থেকে নেওয়া হয় না; নেওয়া হয় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আর তাঁর খলীফাগণের লেখা থেকে।
আর এই কবিতার ব্যাপারে জামাতের খলীফার রায়ও আছে। উৎস প্রবন্ধ জানায়, পঙক্তিগুলো যখন হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), খলীফাতুল মসীহ সানীর সামনে উপস্থাপন করা হয়, তিনি বলেন, এই কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলো অপছন্দনীয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য অবমাননাকর (আল-ফযল, ১৯ আগস্ট ১৯৩৪, পৃষ্ঠা ৫)।
অর্থাৎ আপত্তিকারী যে কথা বলছেন, জামাতের খলীফা প্রায় নব্বই বছর আগে সেই কথাই বলে গেছেন। এ বিষয়ে আমাদের আর তাঁদের মধ্যে আসলে কোনো দ্বিমত নেই।
প্রতিষ্ঠাতা নিজে কী বলেছেন?
“মুহাম্মদ (সা.) আবার এসেছেন” ধারণাটির একটি সঠিক রূপ আছে, যা হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভিত্তি সূরা জুমুআর এই আয়াত:
অর্থাৎ পরবর্তী যুগের মানুষের মধ্যেও আল্লাহ সেই রাসূলকে আবির্ভূত করবেন। কীভাবে? এক গলতী কা ইযালায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তিনি বুরুয বা আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে মহানবী (সা.)-এর নাম পেয়েছেন; আর ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন হয় না। তাই মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; সব অবস্থায় নবী থাকেন মুহাম্মদ (সা.)-ই, আর কেউ নন।
একই পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, তাঁর ওপর যে অনুগ্রহ এসেছে তা সরাসরি আসেনি; আকাশে এক পবিত্র সত্তা আছেন যাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণ তাঁর সাথে আছে, তিনি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। ছায়া যত স্পষ্টই হোক, কায়ার চেয়ে বড় হয় না। কাজেই “পূর্বের চেয়ে বেশি মর্যাদা” কথাটি প্রতিষ্ঠাতার শিক্ষার সাথে খাপ খায় না, আর ঠিক এ কারণেই খলীফা (রা.) একে অপছন্দনীয় বলেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কবিতাটি তো জামাতের পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল?
কেউ কেউ বলেন, জামাতের পত্রিকায় ছাপা মানেই জামাতের অনুমোদন। কিন্তু পত্রিকায় সদস্যদের অনেক লেখা, কবিতা, চিঠি ছাপা হয়। মুসলমানদের পত্রিকাতেও কত না’তে রাসূল (সা.)-এর প্রশংসায় আবেগের বাড়াবাড়ি থাকে; সেগুলো কেউ আকিদার দলিল মনে করে না। আকিদা নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠাতা ও খলীফাগণের লেখা দিয়ে, আর এখানে খলীফার রায় স্পষ্টভাবে কবিতার শব্দের বিপক্ষে।
“মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন” ধারণাটিই কি ভুল নয়?
এ ধারণার ভিত্তি কুরআনের আয়াত (৬২:৪) আর মহানবী (সা.)-এর ব্যাখ্যা। আয়াতটি নাজিল হলে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এরা কারা। মহানবী (সা.) হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর ওপর হাত রেখে বলেছিলেন: ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছে চলে গেলেও এদের মধ্য থেকে কিছু লোক, অথবা একজন লোক, তা ফিরিয়ে আনবে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৮৯৭)। অর্থাৎ শেষ যুগে তাঁর এক অনুসারীর মাধ্যমে তাঁরই শিক্ষা নতুন করে জীবন পাবে। এটিই বুরুযী আগমন: সত্তা নয়, শিক্ষা আর গুণের প্রতিফলন।
তাহলে আহমদী মুসলমানরা মহানবী (সা.)-কে কী মনে করে?
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের ভাষায়: তিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসারী না হলে, তাঁর আনুগত্য না করলে, নেক আমল পাহাড়ের চূড়া ছুঁলেও আল্লাহর সাথে বাক্যালাপের সম্মান পেতেন না (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, পৃষ্ঠা ২৪)। যিনি নিজের সব প্রাপ্তি মহানবী (সা.)-এর দান বলেন, তাঁর অনুসারীরা মহানবী (সা.)-কে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না।
কোনো অনুসারীকে “মুহাম্মদ” বলাই কি অন্যায় নয়?
মহানবী (সা.) নিজেই শেষ যুগের প্রতিশ্রুত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সাথে মিলবে: “ইউওয়াতিউ ইসমুহু ইসমী” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮২)। এক গলতী কা ইযালায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, মহানবী (সা.) প্রতিশ্রুত মাহদীকে নিজের নাম দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি হবেন তাঁর বুরুয, আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি, যেমন ইউশা (আ.) ছিলেন মূসা (আ.)-এর।
তাই নামের মিল নিয়ে আপত্তি নেই; আপত্তি হতে পারে কেবল তখন, যখন প্রতিচ্ছবিকে মূলের চেয়ে বড় বলা হয়। আর ঠিক সেই বাড়াবাড়ির কারণেই খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) কবিতাটির শব্দগুলোকে অপছন্দনীয় বলেছেন। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের অবস্থান এখানে পরিষ্কার: নাম প্রতিচ্ছবির, মর্যাদা মূলের।
শেষ কথা
একজন কবির আবেগী পঙক্তি দিয়ে একটি জামাতের আকিদা বিচার করা যায় না, বিশেষ করে যখন সেই জামাতের খলীফা নিজেই সেই শব্দগুলোকে অপছন্দনীয় ঘোষণা করেছেন। প্রতিষ্ঠাতার লেখা পরিষ্কার: মহানবী (সা.) মূল, তিনি ছায়া।
সংক্ষেপে
- পঙক্তিগুলো কবি কাজী যহুরুদ্দীন আকমলের, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নয়।
- উৎস প্রবন্ধ অনুযায়ী খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) এই শব্দগুলোকে অপছন্দনীয় ও রাসূল (সা.)-এর জন্য অবমাননাকর বলেছেন (আল-ফযল, ১৯ আগস্ট ১৯৩৪)।
- প্রতিষ্ঠাতার শিক্ষা: ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন নয়; নবী সব অবস্থায় মুহাম্মদ (সা.)-ই।
- মহানবী (সা.)-এর বুরুযী আগমনের ভিত্তি সূরা জুমুআ ৬২:৪ আর বুখারী ৪৮৯৭; এতে তাঁর মর্যাদা ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো কথা নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala), PDF · alislam.org
- Claim of the Promised Messiah · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.