মির্যা সাহেব কি নতুন শরীয়ত আনার দাবি করেছিলেন?

আরবাঈন গ্রন্থের একটি অনুচ্ছেদ দেখিয়ে বলা হয়, তিনি নিজেকে শরীয়তবাহী নবী বলেছেন। অথচ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই দাবিকে কুফরী বলে গেছেন। সত্যটা কী?

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

১৯০৮ সালের মে মাস। লাহোর। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর জীবনের শেষ দিনগুলো। মৃত্যুর ঠিক এক দিন আগে তিনি একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, যা ছাপা হলো লাহোরের আখবারে আম পত্রিকায়।

ঘোষণাটির বিষয় ছিল একটি অপবাদ, যা তাঁর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে ছড়ানো হচ্ছিল: তিনি নাকি নতুন শরীয়ত (ধর্মীয় বিধান) নিয়ে আসা নবী হওয়ার দাবি করেন। সেই একই অপবাদ আজও শোনা যায়। চলুন দেখি, ভিত্তিটা কোথায়।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা আরবাঈন গ্রন্থের একটি অংশ উদ্ধৃত করেন (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৫)। সেখানে তিনি লিখেছেন, শরীয়তবাহী বলতে যদি এমন কাউকে বোঝানো হয় যার ওহীতে আদেশ ও নিষেধ আছে, তাহলে তাঁর ওহীতেও আদেশ ও নিষেধ আছে। বিরোধীরা বলেন, এটাই শরীয়তবাহী নবী হওয়ার দাবি।

অনুচ্ছেদটি কোন বিতর্কের অংশ?

পুরো আলোচনাটি ছিল কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, কেউ মিথ্যা কথা রচনা করে তাঁর নামে চালালে তিনি তাকে ধরে ফেলবেন:

وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَیۡنَا بَعۡضَ الۡاَقَاوِیۡلِ لَاَخَذۡنَا مِنۡہُ بِالۡیَمِیۡنِ ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡہُ الۡوَتِیۡنَ
“এবং সে যদি কোন কথা মিথ্যা রচনা করিয়া আমাদের প্রতি আরোপ করিত, তাহা হইলে নিশ্চয় আমরা তাহাকে ডান হাতে ধৃত করিতাম, অতঃপর আমরা তাহার জীবন-শিরা কাটিয়া দিতাম,”
সূরা আল-হাক্কা ৬৯:৪৫–৪৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৬৯:৪৪–৪৬।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বলতেন, আল্লাহর নামে মিথ্যা ওহী রচনাকারীকে আল্লাহ দীর্ঘ সময় সুযোগ দেন না। তিনি নিজের দাবির পর দীর্ঘকাল বেঁচে থাকাকে নিজের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করতেন।

বিরোধীরা জবাবে বলেছিল, এই আয়াতের হুঁশিয়ারি শুধু শরীয়তবাহী নবীর বেলায় খাটে। আরবাঈন-এর অনুচ্ছেদটি এই কথারই জবাব। তিনি প্রশ্ন করলেন, “শরীয়তবাহী” বলতে তোমরা কী বোঝো? যদি বোঝো এমন কাউকে, যার ওহীতে আদেশ-নিষেধ আছে, তাহলে তোমাদের নিজেদের সংজ্ঞাতেই তোমরা আটকে গেলে, কারণ আমার ওহীতেও আদেশ-নিষেধ আছে।

এটি ছিল প্রতিপক্ষের সংজ্ঞা ধরে একটি যুক্তি। নিজের পদমর্যাদার ঘোষণা নয়।

✦

সেই “আদেশ-নিষেধ” আসলে কী ছিল?

ঠিক এর পরেই তিনি তাঁর একটি ওহীর উদাহরণ দিয়েছেন। সেটি কুরআনেরই একটি আয়াত, যা তাঁর ওপর নতুন করে নাযিল হয়েছিল:

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ
“তুমি মো’মেনদিগকে বল, তাহারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে।…”
সূরা আন-নূর ২৪:৩১

এটি কুরআনের আদেশ, নতুন কিছু নয়। ওই পৃষ্ঠার টীকায় তিনি নিজেই লিখেছেন, তাঁর ওহীতে আদেশ-নিষেধ এসেছে “তাজদীদ” হিসেবে, অর্থাৎ কুরআনের ভুলে যাওয়া শিক্ষাকে নতুন করে জাগানোর জন্য।

শরীয়তবাহী নবী তিনিই, যিনি নতুন বিধান আনেন এবং আগের বিধান রহিত করেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ওহী একটি বিধানও রহিত করেনি, একটি নতুন বিধানও যোগ করেনি।

তাঁর নিজের স্পষ্ট ঘোষণা

এবার সেই শেষ ঘোষণাটিতে ফিরি। তিনি লিখেছিলেন:

“আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ যে আমি এমন নবী হওয়ার দাবি করি, যার কুরআন করীম মানার প্রয়োজন নেই, আমি নিজের আলাদা কালেমা ও আলাদা কিবলা বানিয়েছি এবং ইসলামী শরীয়তকে রহিত বলেছি, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন নবুওয়তের দাবিকে আমি কুফরী মনে করি। শুধু আজ নয়, আমার প্রতিটি বইয়ে আমি এটাই লিখে এসেছি যে এমন কোনো নবুওয়তের দাবি আমার নেই।” (আখবারে আম, ২৬ মে ১৯০৮)

আরও কয়েকটি ঘোষণা:

“স্মরণ রাখো, মহানবী (সা.)-এর পর শরীয়তবাহী নবুওয়তের দরজা পুরোপুরি বন্ধ। কুরআনের পর এমন কোনো কিতাব নেই, যা নতুন আদেশ দিতে পারে বা কুরআনের কোনো আদেশ রহিত করতে পারে।” (আল-ওসিয়্যত, পৃষ্ঠা ১২)

“আমি নবী, কিন্তু আমার নবুওয়ত শরীয়তবাহী নয় যে আল্লাহর কিতাবকে রহিত করবে আর নতুন কিতাব চালু করবে। এমন দাবিকে আমি ইসলামে কুফরী মনে করি।” (বদর, ৫ মার্চ ১৯০৮)

যিনি বারবার এই কথা লিখে গেছেন, তাঁর একটি তর্কের বাক্যকে উল্টো অর্থে পড়া ন্যায়বিচার নয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ওহীতে আদেশ-নিষেধ থাকলেই কি শরীয়ত হয় না?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আদেশ-নিষেধ যেখানে, শরীয়ত সেখানে। চলুন একটু ভাবি। বনী ইসরাঈলের বহু নবী তওরাতের বিধান মেনে চলতেন এবং মানুষকে সেই বিধানই মানতে বলতেন। তাঁদের কথাতেও আদেশ-নিষেধ ছিল, কিন্তু তাঁরা নতুন শরীয়ত আনেননি। আদেশটি কোথা থেকে এসেছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ওহীতে যে আদেশ এসেছে, তা কুরআনেরই আদেশ। তাই এটি শরীয়ত নয়, শরীয়তের পুনর্জাগরণ।

কুরআনের শরীয়ত কি তাহলে অসম্পূর্ণ ছিল?

মোটেই না। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাসের ভিত্তিই হলো এই আয়াত:

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَرَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا
“…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ন করিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে (অনুগ্রহকে) সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন রূপে মনোনীত করিলাম।…”
সূরা আল-মায়েদা ৫:৪

যে দীন পূর্ণ, তাতে নতুন শরীয়তের প্রয়োজন নেই। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কাজ ছিল এই পূর্ণ শরীয়তকে মানুষের জীবনে আবার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি লিখেছেন, “যে কুরআনকে রহিত মনে করে এবং নিজের শরীয়ত চালাতে চায়, আল্লাহ তার শত্রু।” (চশমায়ে মারেফত, পৃষ্ঠা ৩২৪)

তাহলে তিনি নিজেকে নবী বলতেন কোন অর্থে?

তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন: “যেখানে যেখানে আমি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছি, তা শুধু এই অর্থে যে আমি স্বতন্ত্র শরীয়ত আনিনি এবং আমি স্বতন্ত্র নবীও নই।” (এক গলতী কা ইযালা) তাঁর নবুওয়ত মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের ফল, উম্মতি নবুওয়ত; তাতে কোনো নতুন বিধান নেই। একই ঘোষণায় তিনি বলেছেন, নিজেকে নবী বলার কারণ শুধু এই যে আল্লাহ তাঁর সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলেন এবং ভবিষ্যতের বহু খবর জানান। (আখবারে আম, ২৬ মে ১৯০৮)

সংক্ষেপে

  1. আরবাঈন-এর অনুচ্ছেদটি ছিল বিরোধীদের সংজ্ঞা ধরে দেওয়া একটি যুক্তি, নিজের শরীয়তবাহী হওয়ার দাবি নয়।
  2. যে “আদেশ-নিষেধ”-এর কথা বলা হয়েছে, তা কুরআনেরই আয়াত, সংস্কারের জন্য নতুন করে নাযিল হয়েছিল।
  3. মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন: শরীয়তবাহী নবুওয়তের দাবি কুফরী, আর এমন দাবি তাঁর নেই।
  4. তাই এই অভিযোগ তাঁর নিজের অসংখ্য স্পষ্ট লেখার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং টেকে না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.