পীর মেহের আলী শাহের সাথে তফসীর প্রতিযোগিতা: সত্তর দিনে কী ঘটেছিল?

একজন বললেন, আল্লাহ আমাকে কুরআন শিখিয়েছেন। আরেকজনও তাই দাবি করতেন। সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাব এলো: দুজনেই আরবিতে সূরা ফাতিহার তফসীর লিখুন। তারপর যা হলো, তা নিয়েই এই লেখা।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

গোলড়া শরীফের পীর মেহের আলী শাহ ছিলেন চিশতিয়া তরিকার একজন প্রসিদ্ধ পীর ও আলেম। পাঞ্জাবে তাঁর বিপুল ভক্ত ছিল। ১৯০০ সালে তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর দাবির বিরুদ্ধে একটি বই লিখলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কুফরের ফতোয়াকে আবার জোরালো করলেন।

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর দাবি ছিল, আল্লাহ তাঁকে ইলহামে বলেছেন: “আর-রাহমানু আল্লামাল কুরআন”, পরম দয়াময় তোমাকে কুরআন শিখিয়েছেন। অন্যদিকে পীর সাহেবের ভক্তরাও তাঁকে কুরআনের গভীর জ্ঞানের অধিকারী বলে মানতেন। তাহলে সাধারণ মানুষ বুঝবে কীভাবে, কার কথা সত্য?

প্রথম আহ্বান: লাহোরে, সবার সামনে

১৯০০ সালের ২০ জুলাই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইশতেহারে প্রস্তাব দিলেন: লাহোরে একটি প্রকাশ্য সভা হোক। লটারির মাধ্যমে কুরআনের একটি সূরা বাছাই করা হবে, আর দুই পক্ষ সাত ঘণ্টার মধ্যে সেই সূরার চল্লিশটি আয়াতের তফসীর অলঙ্কারপূর্ণ আরবিতে লিখবেন। তারপর বিদ্বানরা বিচার করবেন।

পীর সাহেব এই শর্তে রাজি হলেন না। তিনি লাহোরে এলেন, তবে নতুন শর্ত নিয়ে: আগে আকীদা নিয়ে মৌখিক বিতর্ক হবে, আর বিচারক হবেন মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন বাটালভীসহ কয়েকজন আলেম, যাঁরা আগে থেকেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ঘোষিত বিরোধী। অথচ তিনি ১৮৯৭ সালেই আঞ্জামে আথম গ্রন্থে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এই আলেমদের সাথে আর মৌখিক বিতর্কে যাবেন না। পীর সাহেবের অনুসারীরা প্রচার করলেন, প্রতিপক্ষ ময়দান ছেড়ে পালিয়েছেন।

দ্বিতীয় আহ্বান: সত্তর দিন, যত খুশি সাহায্যকারী

এবার এলো এমন একটি প্রস্তাব, যাতে পালানোর কোনো অজুহাত থাকে না। ১৯০০ সালের ১৫ ডিসেম্বরের ইশতেহারে, যা আরবাঈন চতুর্থ খণ্ডে ছাপা হয় (রূহানী খাযায়েন ১৭), তিনি লিখলেন:

দুজনেই নিজ নিজ ঘরে বসে সূরা ফাতিহার তফসীর লিখবেন, অলঙ্কারপূর্ণ আরবিতে। সময় ১৫ ডিসেম্বর ১৯০০ থেকে সত্তর দিন। পীর সাহেব চাইলে মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন বাটালভী, মৌলভী আব্দুল জাব্বার গযনভী, ভীন-এর মৌলভী মুহাম্মদ হাসান, এমনকি আরব দেশের সাহিত্যিকদেরও সাহায্য নিতে পারবেন। তারপর দুই পক্ষের সাথে সম্পর্কহীন তিনজন আরবি-বিশেষজ্ঞ শপথ করে যদি বলেন পীর সাহেবের লেখা ভাষায় ও কুরআনের তত্ত্ব বর্ণনায় উত্তম, তবে তিনি পীর সাহেবকে পাঁচশো টাকা পুরস্কার দেবেন।

এই দিনগুলোতে তিনি একটি ইলহামও প্রকাশ করলেন, যার অর্থ: এই তফসীর প্রতিযোগিতায় কেউ তোমার মোকাবিলা করতে পারবে না (আল হাকাম, ২৪ জানুয়ারি ১৯০১, পৃ. ১০)।

✦

সত্তর দিন পর

১৯০১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর আরবি তফসীর ই‘জাযুল মসীহ প্রকাশিত হলো এবং ডাকযোগে পীর সাহেবের কাছে পাঠানো হলো। প্রায় দুশো পৃষ্ঠার এই বইটি সূরা ফাতিহার পূর্ণ তফসীর।

পরে তিনি নুযূলুল মসীহ গ্রন্থে লেখেন, তিনি এই বই সত্তর দিনে প্রস্তুত করেছিলেন, যদিও মাঝে মাঝে বিঘ্ন ছিল এবং অনেকটা সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। সে সময় তাঁকে ইলহাম হয়েছিল: “মানা‘আহু মানি‘উন মিনাস সামা”, অর্থাৎ আকাশ থেকে এক বাধাদানকারী তাকে বাধা দিয়েছেন।

আর পীর সাহেব? সত্তর দিনে, তার পরেও, তাঁর পক্ষ থেকে সূরা ফাতিহার কোনো আরবি তফসীর প্রকাশিত হয়নি।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

পীর সাহেব তো লাহোরে এসেছিলেন, তাহলে কে পিছিয়ে গেলেন?

লাহোরে আসা আর প্রস্তাবিত প্রতিযোগিতায় নামা এক জিনিস নয়। প্রস্তাব ছিল লিখিত আরবি তফসীরের, যা ভাষার দক্ষতা আর কুরআনের জ্ঞান দুটোই নিরপেক্ষভাবে মাপে। পীর সাহেব তার বদলে মৌখিক বিতর্কের শর্ত দিলেন, আর বিচারক বানাতে চাইলেন প্রতিপক্ষের পুরোনো বিরোধীদের। এরপর সত্তর দিনের যে প্রস্তাব এলো, তাতে স্থান-কাল-সাহায্যকারী সবকিছু পীর সাহেবের সুবিধামতো রাখা হয়েছিল। যিনি পালাতে চান, তিনি প্রতিপক্ষকে এত সুবিধা দেন না।

এই পদ্ধতিটি কুরআনেরই শেখানো। কুরআন অস্বীকারকারীদের মুখের তর্কে নয়, লেখার চ্যালেঞ্জে ডেকেছে, সাহায্যকারী ডাকার অনুমতিও দিয়েছে:

وَاِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ۪ وَادۡعُوۡا شُہَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“এবং যদি তোমরা উহার সম্বন্ধে সন্দেহে থাক যাহা আমরা আমাদের বান্দার উপর নাযেল করিয়াছি তাহা হইলে তোমরা ইহার অনুরূপ একটি সুরা উপস্থাপন কর এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের অন্যান্য সাহায্যকারীকে আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”
সূরা আল-বাকারা ২:২৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:২৩।

অবশ্যই কোনো মানুষের লেখা কুরআনের সমান নয়, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এমন দাবিও করেননি। তাঁর দাবি ছিল, কুরআনের সেবকের হাতে আল্লাহ এমন জ্ঞান ও ভাষা দেন যা প্রতিপক্ষ মেলাতে পারে না, আর সেটিই কুরআনের সত্যতার সাক্ষ্য।

পীর সাহেব কি কোনো জবাব দেননি?

তিনি ১৯০২ সালে উর্দুতে একটি বই প্রকাশ করেন, সাইফে চিশতিয়াই। এটি সূরা ফাতিহার আরবি তফসীর ছিল না; ছিল ই‘জাযুল মসীহ ও শামসে বাযেগা বইয়ের সমালোচনা। এতে বলা হয়, ই‘জাযুল মসীহ-এর কিছু বাক্য “মাকামাতে হারীরী”-র মতো পুরোনো আরবি গ্রন্থ বা প্রচলিত প্রবাদ থেকে নেওয়া, আর কিছু ব্যাকরণগত ভুল আছে।

নুযূলুল মসীহ গ্রন্থে এর জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রায় বিশ হাজার বাক্যের একটি বইয়ে কয়েকটি বাক্য সুপরিচিত আরবি প্রবাদ বা বাক্যাংশের সাথে মিলে যাওয়াকে চুরি বলা যায় না; ভাষার প্রবাদ সবাই ব্যবহার করেন। আর দু-একটি ছাপার ভুলকে ব্যাকরণের ভুল বলা হয়েছিল।

একই গ্রন্থে একটি গুরুতর তথ্যও তুলে ধরা হয়। ভীন-এর প্রয়াত মৌলভী মুহাম্মদ হাসান এই দুটি বইয়ের মার্জিনে নিজের হাতে সমালোচনামূলক টীকা লিখেছিলেন। তাঁর পরিচিত কয়েকজন ভীন থেকে চিঠিতে জানান, তাঁরা বইগুলো সাইফে চিশতিয়াই-এর সাথে মিলিয়ে দেখেছেন, আর টীকাগুলো প্রায় হুবহু এতে তুলে দেওয়া হয়েছে, অথচ মূল লেখকের নাম কোথাও নেই। এক পোস্টকার্ডে পীর সাহেব টীকা ব্যবহারের কথা মেনে নিয়ে বলেন, মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় অনুমতি দিয়েছিলেন (নুযূলুল মসীহ, রূহানী খাযায়েন ১৮)। কিন্তু অনুমতি থাকলে বইয়ে তার উল্লেখ থাকাই ছিল সততার দাবি। যিনি ই‘জাযুল মসীহ-এর বিরুদ্ধে কয়েকটি বাক্য ধার করার অভিযোগ এনেছিলেন, তাঁর নিজের বইয়ের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠল।

একটি আরবি বই লেখা কি সত্যতার প্রমাণ হতে পারে?

এই প্রতিযোগিতার বিষয় শুধু আরবি ভাষা ছিল না, ছিল দুজন দাবিদারের দাবি যাচাই: আল্লাহ কাকে কুরআন শিখিয়েছেন। প্রতিযোগিতার শর্ত আগেই প্রকাশ্যে ঘোষিত হয়েছিল, সময় বাঁধা ছিল, বিচারের পদ্ধতিও ঠিক ছিল। এক পক্ষ সময়ের মধ্যে লিখে পাঠালেন, অন্য পক্ষ লিখলেন না। ফলাফল বিচার করার জন্য এর চেয়ে স্পষ্ট মাপকাঠি আর কী হতে পারে?

সংক্ষেপে

  1. ২০ জুলাই ১৯০০-এর প্রস্তাব ছিল লাহোরে প্রকাশ্য সভায় সাত ঘণ্টায় আরবি তফসীর লেখা; পীর সাহেব তার বদলে মৌখিক বিতর্কের শর্ত দেন।
  2. ১৫ ডিসেম্বর ১৯০০-এর প্রস্তাব: সত্তর দিনে সূরা ফাতিহার আরবি তফসীর, যত খুশি সাহায্যকারী, নিরপেক্ষ বিচারক ও পাঁচশো টাকা পুরস্কার।
  3. ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০১ তারিখে ই‘জাযুল মসীহ প্রকাশিত হয়ে পীর সাহেবের কাছে পাঠানো হয়; পীর সাহেবের পক্ষ থেকে কোনো আরবি তফসীর আসেনি।
  4. পরে প্রকাশিত উর্দু বই সাইফে চিশতিয়াই তফসীর ছিল না; নুযূলুল মসীহ-তে এর বিষয়বস্তু প্রয়াত মৌলভী মুহাম্মদ হাসানের টীকা থেকে নেওয়ার প্রমাণ তুলে ধরা হয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.