মদীনায় শোকের ছায়া। মহানবী (সা.)-এর শিশুপুত্র ইবরাহীম মারা গেছেন। নবী (সা.) নিজে তাঁর জানাযার নামায পড়ালেন। তারপর ভারী মনে এমন একটি কথা বললেন, যা আজও আলেমদের ভাবায়।
মনে রাখুন, খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াত নাযিল হয়েছিল হিজরী পঞ্চম বছরে। আলইসলাম ডট অর্গের হিসাব অনুযায়ী ইবরাহীমের মৃত্যু তার প্রায় চার বছর পরে।
একটি বাক্য, অনেক উত্তর
ভাবুন, মহানবী (সা.) যদি খাতামান নাবিয়্যীন বলতে বুঝতেন যে তাঁর পরে আর কোনো ধরনের নবী আসাই অসম্ভব, তাহলে তিনি কী বলতেন? হয়তো বলতেন, “ছেলেটি পবিত্র ছিল, কিন্তু হাজার বছর বাঁচলেও নবী হতো না, কারণ নবুয়্যতের দরজা বন্ধ।”
কিন্তু তিনি তা বলেননি। তিনি বললেন, বেঁচে থাকলে সে নবী হতো। খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন: কোনো জিনিস একেবারে অসম্ভব হলে, “বেঁচে থাকলে হতো” কথাটির কোনো অর্থ থাকে না।
পরবর্তী যুগের বড় আলেমরাও এই অর্থ বুঝেছেন। বিখ্যাত হানাফী আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন: ইবরাহীম যদি বেঁচে থেকে নবী হতেন, তিনি হতেন মহানবী (সা.)-এর অনুসারী নবী, আর তা খাতামান নাবিয়্যীনের পরিপন্থী হতো না; কারণ খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি তাঁর শরীয়ত রহিত করবেন এবং তাঁর উম্মতের নন (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)।
সৃষ্টির শুরুতেই খাতাম
আরেকটি হাদীস খাতামিয়্যাতকে সময়ের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে দেয়। হযরত ইরবায বিন সারিয়া (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন: আমি আল্লাহর কাছে তখনই খাতামান নাবিয়্যীন হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম, যখন আদম (আ.) তখনো তাঁর মাটির খামিরে মিশে ছিলেন (মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল ফাযায়েল, বাবু ফাযায়েলি সাইয়িদিল মুরসালীন)।
হযরত খলীফাতুল মসীহ খামেস (আই.)-এর একটি উত্তরে উল্লেখ করা হয়েছে, এরপরেই বহু নবী পৃথিবীতে এসেছেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.) খাতাম ছিলেন, আর তার পরেও নবীরা এসেছেন। খাতামিয়্যাত সময়ের তালিকার শেষ ঘর নয়, মর্যাদার সর্বোচ্চ আসন।
শেষ যুগের মসীহকে “আল্লাহর নবী” বলা
সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে শেষ যুগের ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আগমনকারী মসীহকে মহানবী (সা.) চারবার বলেছেন নাবিয়ুল্লাহ ঈসা, আল্লাহর নবী ঈসা।
আর হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
লক্ষ করুন, “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” কথাটির মধ্যেই আছে, তিনি নিজে একজন নবী। নইলে “মাঝে” শব্দের কোনো অর্থ থাকে না।
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর উক্তিও এই সুরে বাঁধা: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ইবনে মাজাহতেই তো আছে, “তাঁর পরে কোনো নবী নেই, তাই ইবরাহীম বাঁচেননি”?
হ্যাঁ, ঠিক আগের হাদীসে (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৫১০) ইসমাঈল বিন আবু খালিদ বলেন, তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আবু আওফা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সাহাবী উত্তর দেন, যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর পরে কোনো নবী হওয়া নির্ধারিত থাকত, তাঁর ছেলে বেঁচে থাকত।
দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখুন। ১৫১০ নম্বরে কথাটি একজন সাহাবীর নিজের ব্যাখ্যা। ১৫১১ নম্বরে কথাটি মহানবী (সা.)-এর মুখের। আর মহানবী (সা.) তাঁর ছেলের মৃত্যুর কারণ হিসেবে নবুয়্যতের দরজা বন্ধ থাকার কথা বলেননি; বলেছেন, বেঁচে থাকলে সে নবী হতো। নবী (সা.)-এর কথাই চূড়ান্ত।
ইবরাহীম-বিষয়ক হাদীসের সনদ কি দুর্বল নয়?
কয়েকজন মুহাদ্দিস ইবনে মাজাহর এই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এটি সত্য। কিন্তু আলইসলাম ডট অর্গে উল্লেখিত হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনায় একই ঘটনা আরও বিস্তারিত এসেছে: ইবরাহীমকে দাফনের পর মহানবী (সা.) কবরের উপর হাত রেখে বললেন, “আল্লাহর কসম, সে নবী এবং নবীর পুত্র” (ইবনে হাজার, আল-ফাতাওয়াল হাদীসিয়্যা, পৃষ্ঠা ১৭৬)। আর মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর মতো সমালোচক আলেম এই বক্তব্যের অর্থ মেনে নিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন, যা আমরা উপরে দেখেছি। উম্মতের বড় আলেমরা এই কথাকে খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী মনে করেননি।
নবী ঈসা (আ.) তো পুরোনো নবী, তাঁকে “নবী” বলায় নতুন কিছু প্রমাণ হয় কি?
বিরোধী আলেমদের বিশ্বাস অনুযায়ীও মহানবী (সা.)-এর পরে একজন নবী আসবেন, আর তিনি নবী হিসেবেই আসবেন। অর্থাৎ “তাঁর পরে কোনো ধরনের নবী আসবেন না” কথাটি দুই পক্ষের কেউই মানেন না। প্রশ্ন শুধু, তিনি কে হবেন। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) মাপকাঠি দিয়েছেন: মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পান (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)। তাই আহমদী মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, প্রতিশ্রুত মসীহ এই উম্মত থেকেই, মহানবী (সা.)-এর অনুসারী হয়ে আসার কথা ছিল, আর তিনি এসেছেন।
সংক্ষেপে
- খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াতের চার বছর পরে মহানবী (সা.) বলেছেন, ইবরাহীম বেঁচে থাকলে সিদ্দীক নবী হতো (ইবনে মাজাহ ১৫১১)।
- আদম (আ.) সৃষ্টির আগেই তিনি খাতামান নাবিয়্যীন ছিলেন; তাই খাতামিয়্যাত সময়ের নয়, মর্যাদার বিষয়।
- শেষ যুগের মসীহকে মহানবী (সা.) চারবার “আল্লাহর নবী” বলেছেন (সহীহ মুসলিম), আর বলেছেন “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” (আবু দাউদ ৪৩২৪)।
- মোল্লা আলী কারী (রহ.)সহ বড় আলেমরা বলেছেন, অনুসারী নবী খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Advent of a Prophet According to the Need of the Time · alislam.org
- The Meaning of Khatamiyyat According to Ahadith · alislam.org
- Reality of Khatam al-Nabiyyin · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.