১৫ ডিসেম্বর ১৯০০। কাদিয়ান থেকে একটি ইশতেহার গেল গোলড়া শরীফের প্রসিদ্ধ পীর মেহের আলী শাহ সাহেবের কাছে। প্রস্তাবটি সোজা: দুজনেই সত্তর দিনের মধ্যে আরবি ভাষায় সূরা ফাতিহার একটি তফসীর লিখবেন। আল্লাহ যাঁর সাথে আছেন, তাঁর লেখাই ভাষার সৌন্দর্য আর জ্ঞানের গভীরতায় এগিয়ে থাকবে।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দুশো পৃষ্ঠার বেশি দীর্ঘ আরবি তফসীর শেষ করলেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০১ তারিখে তা পীর সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বইটির নাম ইজাযুল মসীহ, অর্থাৎ “মসীহের মুজিযা”। অপর পক্ষ থেকে কোনো তফসীর এল না।
আপত্তিটি কী?
পরে বিরোধীরা বললেন, ইজাযুল মসীহ আসলে মুজিযা নয়; এতে আরবি সাহিত্যের বিখ্যাত বই মাকামাতে হারীরী থেকে বাক্য নেওয়া হয়েছে। তাঁরা দুই বইয়ের কিছু বাক্য পাশাপাশি রেখে দেখান যে শব্দগুলো মিলে যায়। তাঁদের যুক্তি: যে বইয়ে অন্যের বাক্য আছে, তা অলৌকিক হয় কীভাবে?
তিনি নিজে কী বলেছেন
আপত্তিটি তাঁর জীবদ্দশাতেই উঠেছিল, আর তিনি কিছু লুকাননি। তিনি লিখেছেন, পীর মেহের আলী সাহেব অভিযোগ করেছেন যে তিনি মাকামাতে হারীরী-র মতো বই থেকে প্রবাদ ও বাক্য নিয়েছেন; “আমি সত্যিই সেগুলো আমার বইয়ে এনেছি, কিন্তু উদ্ধৃতি বা দৃষ্টান্তের আকারে, যা দুই-তিন লাইনের বেশি নয়।” (তোহফাতুন নদওয়া; ইংরেজি অনুবাদ A Gift for An-Nadwah, পৃষ্ঠা ২১–২২)
“দুই-তিন লাইন” কথাটি উর্দু বাগধারা, যার অর্থ “অল্প কয়েকটি”। অর্থাৎ বইয়ে আরবদের প্রচলিত কিছু প্রবাদ ও বাক্য আছে, যেগুলো হারীরীর বইয়েও আছে। পুরো তফসীর, তার যুক্তি, তার বিষয়বস্তু, এর কোনোটিই হারীরীর বিষয় নয়; হারীরীর বই তো তফসীরই নয়, কাল্পনিক গল্পের সংকলন।
আরবি সাহিত্যের একটি স্বীকৃত রীতি
আরবি অলংকারশাস্ত্রে দুটি পরিচিত পরিভাষা আছে। ইকতিবাস মানে নিজের লেখায় কুরআন বা হাদীসের শব্দ বুনে দেওয়া। তাযমীন মানে অন্য কবি বা লেখকের পরিচিত পঙ্ক্তি বা বাক্য নিজের রচনায় জুড়ে দেওয়া। এগুলো চুরি নয়, বরং লেখকের জ্ঞান ও রুচির প্রকাশ বলে গণ্য হয়; পাঠক জানেন বাক্যটি পরিচিত।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এই বিষয়টি নুযূলুল মসীহ-তে বিস্তারিত বলেছেন। তাঁর যুক্তিগুলোর সারকথা:
প্রথমত, হারীরী নিজেও তাঁর বইয়ে কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেছেন, অন্য কবিদের পঙ্ক্তি হুবহু এনেছেন, এবং তাঁর পূর্বসূরি বদীউয যামান হামাদানীর কিছু বাক্যও অপরিবর্তিত রেখেছেন। তাহলে কি গোটা মাকামাতে হারীরী-কেই নকল বলা হবে?
দ্বিতীয়ত, কিছু প্রবাদের পরিসর এত সংকীর্ণ যে একই ভাব প্রকাশ করতে গেলে সব দক্ষ লেখককে একই শব্দ ব্যবহার করতে হয়। কোনো জায়গায় যদি অলংকারের দাবি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট শব্দই বসে, সবাই সেটিই লিখবে; আর যে অজ্ঞ সেখানে অন্য শব্দ বসাবে, সাহিত্যিকদের চোখে সেটিই ভুল হবে।
তৃতীয়ত, কুরআনের কিছু বাগধারাও জাহেলী যুগের কবিতায় পাওয়া যায়। এ কারণে ইমামরা হাজার হাজার জাহেলী কবিতা মুখস্থ রাখতেন, কুরআনের ভাষার সৌন্দর্য প্রমাণ করার জন্য। কেউ এ থেকে কুরআনকে “নকল” বলেন না। (নুযূলুল মসীহ, রূহানী খাযায়েন, ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩২–৪৩৪)
তিনি আরও লিখেছেন, আরবি লেখার সময় অনেক সময় পুরো বাক্য ইলহামের আকারে তাঁর হৃদয়ে নাযিল হয়, আর কখনো পরে জানতে পারেন যে সেই বাক্য কোনো বইয়ে আগে থেকেই আছে; আল্লাহ যেকোনো বইয়ের একটি সুন্দর বাক্য তাঁর হৃদয়ে নামিয়ে দিতে পারেন। (নুযূলুল মসীহ, রূহানী খাযায়েন, ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৪–৪৩৬)
মূল প্রশ্ন: চ্যালেঞ্জের জবাব কোথায়?
এই বিতর্কের আসল কেন্দ্র একটি চ্যালেঞ্জ। ইজাযুল মসীহ লেখার সময় তিনি দোয়া করেছিলেন, এই বই যেন আলেমদের জন্য একটি নিদর্শন হয় এবং কেউ এর সমতুল্য লিখতে না পারে; আর তাঁকে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল, আকাশ থেকে বাধা দেওয়া হবে। (ইজাযুল মসীহ, রূহানী খাযায়েন, ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮)
যদি বইটি সত্যিই অন্য বই থেকে জোড়াতালি দিয়ে বানানো হতো, তাহলে কাজটি তো সহজ ছিল: হারীরী আর অন্য বই সামনে রেখে সূরা ফাতিহার একটি আরবি তফসীর লিখে ফেলা। পীর সাহেব, তাঁর সহযোগী আলেমরা, আরব-অনারব কেউই তা করেননি। কুরআনও প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই মাপকাঠিই দিয়েছে:
কুরআনের ক্ষেত্রেও বিরোধীরা জবাব না দিয়ে বলেছিল, এ তো পুরোনো কাহিনি, কেউ শিখিয়ে দিয়েছে। সমতুল্য কিছু আনা আর অভিযোগ তোলা, দুটি এক কাজ নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মিল যদি সামান্যই হয়, তাহলে বিরোধীরা লম্বা তালিকা দেখান কীভাবে?
এখানে কেউ কেউ বহু বাক্যের তালিকা তুলে ধরেন। চলুন দেখি সেই তালিকায় কী থাকে। বেশির ভাগই আরবদের মুখে মুখে প্রচলিত প্রবাদ, বাগধারা আর শব্দজোড়া, যেগুলো হারীরী নিজেও তৈরি করেননি, বরং আরবদের কথ্য ভাষা থেকে সংগ্রহ করে গল্পে সাজিয়েছেন। এই মাপকাঠিতে প্রায় যেকোনো আরবি গদ্যকে “হারীরী থেকে নকল” বলা যায়, এমনকি হারীরীকেও তাঁর আগের লেখকদের থেকে। প্রচলিত প্রবাদ ব্যবহার করা ভাষা জানার প্রমাণ, নকলের প্রমাণ নয়।
তাহলে বইটিকে “মুজিযা” বলা হয় কেন?
মুজিযা দাবিটি ছিল পুরো বইয়ের সামগ্রিক রূপ নিয়ে: নির্ধারিত সময়ের ভেতরে, ছন্দোবদ্ধ অলংকৃত আরবি গদ্যে, সূরা ফাতিহার গভীর তফসীর লেখা, যার সমতুল্য প্রতিপক্ষ লিখতে পারবে না। কয়েকটি প্রবাদের মিল এই দাবিকে স্পর্শও করে না। যিনি উর্দু-ফারসির দেশে বসে কোনো আরব দেশে না গিয়ে এমন বই লিখেছেন, তাঁর জবাব দেওয়ার পথ খোলা ছিল একটিই: সমতুল্য একটি বই লেখা।
পীর মেহের আলী শাহ সাহেব কি কোনো জবাব দেননি?
তিনি তফসীর লেখেননি; পরে উর্দুতে একটি বই প্রকাশ করেন, যাতে ইজাযুল মসীহ-র ভাষার সমালোচনা ছিল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, সেই সমালোচনাও আসলে মৌলভী মুহাম্মদ হাসান নামের আরেকজনের লেখা নোট থেকে নেওয়া, ফলে যিনি কয়েকটি প্রবাদের জন্য নকলের অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেই একটি গোটা বই নকলের অভিযোগ উঠল। (তোহফাতুন নদওয়া; A Gift for An-Nadwah, পৃষ্ঠা ২১–২২)
সংক্ষেপে
- ইজাযুল মসীহ ছিল সত্তর দিনের চ্যালেঞ্জে লেখা আরবি তফসীর; প্রতিপক্ষ কোনো তফসীর উপস্থাপন করেননি।
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই স্বীকার করেছেন, বইয়ে উদ্ধৃতি আকারে অল্প কিছু প্রচলিত বাক্য আছে, যা হারীরীর বইয়েও পাওয়া যায়।
- ইকতিবাস ও তাযমীন আরবি সাহিত্যের স্বীকৃত রীতি; হারীরী নিজেও কুরআনের আয়াত ও অন্যদের বাক্য ব্যবহার করেছেন।
- নকলের অভিযোগের সত্যিকারের জবাব হতো সমতুল্য একটি তফসীর লেখা, যা আজও কেউ করেননি।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Were the Arabic works of the Promised Messiah plagiarised from “Maqamat al-Hariri”? Part I · alhakam.org
- Were the Arabic works of the Promised Messiah plagiarised from Maqamat al-Hariri? Part II · alhakam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.