১৮৮৩ সালের আগের কোনো একদিন। কাদিয়ানের এক নিভৃত ঘরে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। হঠাৎ তাঁর ওপর ইলহাম হলো, আর ভাষাটি তাঁর অচেনা: “I love you.” তারপর: “I am with you.” তারপর: “I shall help you.”
তিনি লিখেছেন, উচ্চারণ আর সুর শুনে মনে হচ্ছিল যেন একজন ইংরেজ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছেন। কথার গাম্ভীর্যে শরীর কেঁপে উঠেছিল, তবু অর্থ জানার আগেই মনে এক গভীর প্রশান্তি নেমে এসেছিল। আর এমন ইংরেজি ইলহাম পরেও বহুবার হয়েছে। (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড, রূহানী খাযায়েন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭১–৫৭২, টীকা)
পাঞ্জাবের এক গ্রামের মানুষ, যিনি ইংরেজি জানতেন না, তাঁর ওপর ইংরেজিতে ইলহাম। আর তাঁর বেশিরভাগ ইলহাম আরবীতে। এটিই আজকের আপত্তির বিষয়।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, কুরআন অনুযায়ী আল্লাহ প্রত্যেক রসূলকে তাঁর জাতির ভাষায় পাঠান:
তাহলে পাঞ্জাবি বা উর্দুভাষী একজন মানুষের ওপর আরবীতে, এমনকি ইংরেজি বা অন্য ভাষায় ইলহাম কেন? তাঁদের মতে, এটিই প্রমাণ করে যে ইলহামগুলো সত্য নয়।
আরবী কেন: অনুসারী আর অনুসৃতের চিহ্ন
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই এই আপত্তির উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “ওহী নিজের মাতৃভাষায় হতে হবে”, এই শর্ত তার জন্য, যে মুহাম্মদী নবুওয়তের প্রদীপ থেকে আলো না নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নবুওয়তের দাবি করে। কিন্তু যে উম্মতি হিসেবে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়ত থেকে আলো পায়, সে আল্লাহর সাথে বাক্যালাপে তার অনুসৃত নবীর ভাষায় ওহী পায়, যাতে অনুসারী আর অনুসৃতের মধ্যে একটি চিহ্ন থাকে, যা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক জানিয়ে দেয়। (রিভিউ বর মুবাহাসা বাটালভী ও চকড়ালভী, রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৬)
কথাটি সহজ উদাহরণে বুঝি। একটি বড় পরিবারের সন্তান যেখানেই থাকুক, পরিবারের ভাষা, পরিবারের রীতি তার পরিচয় বহন করে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেকে স্বতন্ত্র নবী নয়, বরং মহানবী (সা.)-এর একজন উম্মতি বলেছেন। তাই তাঁর ইলহামের প্রধান ভাষা মহানবী (সা.)-এর ভাষা, কুরআনের ভাষা। এই আরবীই জানিয়ে দেয়, তাঁর সব কিছু কোথা থেকে এসেছে।
অন্য ভাষা কেন: সারা পৃথিবীর জন্য বার্তা
এবার সূরা ইবরাহীমের আয়াতটি আবার পড়ুন: প্রত্যেক রসূলকে পাঠানো হয়েছে তাঁর জাতির ভাষায়, “যেন সে তাহাদের নিকট স্পষ্ট করিয়া বর্ণনা করিতে পারে”। আগের নবীরা পাঠানো হতেন নির্দিষ্ট জাতির কাছে, তাই তাঁদের ভাষাও ছিল সেই জাতির ভাষা।
কিন্তু মহানবী (সা.)-এর জাতি কারা? কুরআন বলছে:
অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর “জাতি” গোটা মানবজাতি। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে যিনি শেষ যুগে ইসলামকে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এসেছেন, তাঁর বার্তাও সব জাতির জন্য। তাই তাঁর ওপর আরবী ছাড়াও উর্দু, ফারসি, ইংরেজি এমনকি হিব্রু শব্দেও ইলহাম হয়েছে, এ নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। (তাযকিরা, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৭৯, ১২৬)
লক্ষ করুন একটি ইংরেজি ইলহাম: “I love you. I shall give you a large party of Islam.” অর্থাৎ “আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমাকে ইসলামের এক বিশাল দল দেব।” (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড, রূহানী খাযায়েন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৬৪, টীকা) কথাটি এসেছিল ইংরেজিতে, যে ভাষা তখন পৃথিবীর বহু দেশে পৌঁছানোর ভাষা হয়ে উঠছিল। আর আজ সেই “বিশাল দল” পৃথিবীর বহু দেশে, বহু ভাষায় ছড়িয়ে আছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
যে ভাষা তিনি জানতেন না, সেই ভাষায় ইলহাম হলে তার অর্থ কী?
এখানে কেউ কেউ বলেন, অচেনা ভাষার ইলহাম অর্থহীন। চলুন দেখি। তিনি নিজেই লিখেছেন, ইংরেজি ইলহামের অর্থ তিনি পরে জেনে নিয়েছেন। আর এখানেই এর মূল্য: যে ভাষা তিনি জানতেন না, তাতে সঠিক অর্থবহ বাক্য তাঁর মনে আসা প্রমাণ করে, এটি তাঁর নিজের চিন্তা নয়। নিজের মন থেকে বানানো কথা মানুষ নিজের জানা ভাষাতেই বানায়।
কুরআন তো বলে রসূল তাঁর জাতির ভাষায় আসেন; এতে কি আয়াতের বিরোধিতা হলো না?
বরং আয়াতের উদ্দেশ্যই পূর্ণ হয়েছে। আয়াত বলছে, ভাষা দেওয়া হয় “যেন স্পষ্ট করে বর্ণনা করা যায়”। তিনি তাঁর জাতিকে বোঝাতে উর্দু ও ফারসিতে বিপুল সাহিত্য রচনা করেছেন, আর আরব জগতের জন্য আরবীতে বই লিখেছেন। আর ইলহামের প্রধান ভাষা আরবী হওয়া, তাঁর নিজের ব্যাখ্যায়, মহানবী (সা.)-এর সাথে তাঁর সম্পর্কের সাক্ষ্য। আয়াতটি স্বতন্ত্র রসূলদের নিয়ম বলছে; তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর উম্মতি বলেছেন।
আরবীতে ইলহাম হলে তো তিনি আরবী জানতেন বলে প্রমাণ হয়?
তিনি আরবী ভাষার প্রাথমিক পাঠ ছেলেবেলায় ঘরোয়া শিক্ষকের কাছে নিয়েছিলেন, এটি তিনি নিজেই লিখেছেন। কিন্তু পরে যে উচ্চাঙ্গের আরবী গদ্য ও কবিতায় তিনি বই লিখে আরব-অনারব আলেমদের মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন, তাকে তিনি আল্লাহর দান বলেছেন। ইলহাম কোন ভাষায় হবে, তা ঠিক করেন আল্লাহ; মানুষের জানা-অজানার ওপর তা নির্ভর করে না। ইংরেজি আর হিব্রু ইলহামই তার প্রমাণ।
শেষে আবার সেই প্রথম ইংরেজি ইলহামটির কথা ভাবুন: “I love you.” পাঞ্জাবের এক গ্রামে বসে, যে ভাষা তিনি জানতেন না, সেই ভাষায় আল্লাহর ভালোবাসার ঘোষণা। আজ সেই জামাতের মানুষ পৃথিবীর নানা দেশে নানা ভাষায় কুরআন পড়েন, আর মহানবী (সা.)-এর ভাষা আরবীতেই নামায পড়েন। ভাষার এই বৈচিত্র্য আর আরবীর এই কেন্দ্র, দুটিই সেই ইলহামগুলোর বার্তার সাথে মিলে যায়।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ব্যাখ্যায়, উম্মতি নবী ওহী পান অনুসৃত নবীর ভাষায়, যা তাঁদের সম্পর্কের চিহ্ন (রূহানী খাযায়েন ১৯, পৃষ্ঠা ২১৬)।
- “জাতির ভাষায় রসূল” নিয়মটি নির্দিষ্ট জাতির রসূলদের জন্য; মহানবী (সা.) এসেছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য (৩৪:২৯)।
- তাই তাঁর প্রতিনিধির ওপর আরবীর পাশাপাশি উর্দু, ফারসি, ইংরেজি ও হিব্রুতেও ইলহাম হয়েছে।
- অজানা ভাষায় অর্থবহ ইলহাম প্রমাণ করে যে তা তাঁর নিজের বানানো নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.