ধরুন কেউ আপনাকে একটি চিঠির একটি লাইন পড়ে শোনাল, আর বলল, “দেখুন, চিঠিতে এই কথা লেখা।” আপনি পুরো চিঠি হাতে নিয়ে দেখলেন, সেই লাইনের ঠিক পরেই এমন কথা আছে যা পুরো অর্থটাই পাল্টে দেয়। তখন আপনি কী বলবেন?
সূরা আল-মায়েদার একটি আয়াতের বেলায় ঠিক এমনটাই ঘটে। আয়াতের একটি অংশ পড়ে বলা হয়: “দেখুন, আল্লাহ বলছেন, তিনি মসীহকে ধ্বংস করতে চাইলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। অর্থাৎ আল্লাহ এখনো তা চাননি। তাই ঈসা (আ.) এখনো জীবিত।”
চলুন, পুরো আয়াতটি পড়ি।
বাদ পড়ে যাওয়া অংশটি
দেখলেন তো? আয়াতে শুধু মসীহের কথা নেই। আছে “তাহার মাতাকে” এবং “যাহারা জগতে আছে তাহাদের সকলকে”ও।
এখন আপত্তিকারীদের যুক্তিটি পুরো আয়াতে প্রয়োগ করে দেখুন। যদি এই আয়াত প্রমাণ করে যে আল্লাহ এখনো মসীহকে মৃত্যু দিতে চাননি, তাহলে একই যুক্তিতে প্রমাণ হবে যে তিনি মরিয়ম (আ.)-কেও মৃত্যু দিতে চাননি। আর পৃথিবীর সব মানুষকেও না।
তাহলে কি হযরত মরিয়ম (আ.) আজও জীবিত? গত দুই হাজার বছরে পৃথিবীর কেউ কি মারা যায়নি? কোনো মুসলমান এমন কথা বলেন না। তাহলে একই বাক্যের একই শব্দ শুধু ঈসা (আ.)-এর বেলায় অন্য অর্থ দেবে কীভাবে?
আয়াতটি আসলে কী বলছে
আয়াতের শুরুটা দেখুন: “তাহারা অবশ্যই কুফরী করিয়াছে যাহারা বলে, আল্লাহ্ - তিনিই মরিয়মের পুত্র মসীহ্।” অর্থাৎ আয়াতের বিষয় ঈসা (আ.) জীবিত না মৃত, তা নয়। বিষয় হলো, তাঁকে খোদা বানানো।
alislam.org-এর বিস্তারিত তফসীর বলে, এখানে আল্লাহ কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন ঈসা (আ.)-কে খোদা বা খোদার পুত্র বলার বিশ্বাসটির অসারতা উন্মোচন করার জন্য। প্রশ্নটির ভেতরেই উত্তর লুকিয়ে আছে: আল্লাহর মোকাবিলায় যিনি নিজেকে আর নিজের মাকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন না, তিনি খোদা হন কীভাবে? তফসীরে আরও বলা হয়েছে, “ধ্বংস করা” শব্দটি এখানে শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করার অর্থে এসেছে। যেহেতু ঈসা (আ.) ও তাঁর মা এই ভুল বিশ্বাসের কেন্দ্র হয়ে গেছেন, তাই আয়াতে তাঁদের নামই নেওয়া হয়েছে।
আয়াতের শেষ অংশটিও একই দিকে ইঙ্গিত করে: “আকাশ সমূহ এবং পৃথিবীতে এবং এতদুভয়ের মধ্যে যাহা কিছু আছে, সকলের উপর আধিপত্য আল্লাহ্র। তিনি যাহা চাহেন সৃষ্টি করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ্ সকল বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।” পুরো আয়াতটি আল্লাহর একত্ব আর সার্বভৌম ক্ষমতার ঘোষণা। এর কোথাও ঈসা (আ.)-এর বয়স বা তাঁর বর্তমান অবস্থার কোনো আলোচনা নেই।
এ ধরনের বাক্য আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ঘোষণা। “যদি তিনি চাহেন” কথাটি জানায়, আল্লাহ চাইলে কী করতে পারেন। কোনো ঘটনা ঘটেছে কি ঘটেনি, সেই খবর এটি দেয় না।
এই সূরাতেই উত্তর আছে
মজার ব্যাপার হলো, এই একই সূরা আল-মায়েদায় কিছু পরে আল্লাহ ঈসা (আ.) আর তাঁর মা সম্পর্কে এমন একটি কথা বলেছেন, যা এই বিতর্কের ইতি টেনে দেয়:
“তাহারা উভয়েই খাদ্য খাইত”, অতীতকালে বলা। alislam.org-এর প্রবন্ধে এই আয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে: মরিয়ম (আ.)-এর খাওয়া বন্ধ হয়েছে তাঁর মৃত্যুর কারণে, এ কথা সবাই মানেন। আর দুজনের কথা একসাথে, একইভাবে বলা হয়েছে। তাই একই যুক্তিতে ঈসা (আ.)-এর খাওয়া বন্ধ হওয়াও মৃত্যুর কারণেই।
এভাবে যে সূরা থেকে তাঁর জীবিত থাকার প্রমাণ খোঁজা হয়, সেই সূরাই তাঁর মৃত্যুর সাক্ষী দেয়। এই সূরার শেষ দিকে ঈসা (আ.)-এর নিজের মুখের স্বীকারোক্তিও আছে: “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১৮)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“যদি তিনি চাহেন” কথাটি কি বোঝায় না যে আল্লাহ এখনো চাননি?
এখানে কেউ কেউ শর্তবাক্যের ওপর জোর দেন। কিন্তু শর্তবাক্যটি তিন জনের ওপর একসাথে প্রযোজ্য: মসীহ, তাঁর মা, আর পৃথিবীর সবাই। এখন যদি বলা হয় “এখনো চাননি”, তাহলে তিনজনের বেলায়ই তা বলতে হবে। অথচ মরিয়ম (আ.)-এর মৃত্যু সবাই মানেন। সুতরাং শর্তবাক্যটি কারো জীবিত থাকার খবর দিচ্ছে না, শুধু আল্লাহর ক্ষমতার ঘোষণা দিচ্ছে। একটি বাক্যের এক অংশের অর্থ এক রকম আর আরেক অংশের অর্থ অন্য রকম, এটা হতে পারে না।
তাহলে কি এই আয়াত দিয়ে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণ করা হচ্ছে?
আমাদের কথা আরও সহজ। এই আয়াতটি ঈসা (আ.) জীবিত না মৃত, সেই আলোচনার জন্য আসেনি; এটি এসেছে তাঁকে খোদা বানানোর বিশ্বাস খণ্ডন করতে। তাই একে আকাশে জীবিত থাকার প্রমাণ বানানো যায় না। আর তাঁর মৃত্যুর কথা কুরআন অন্য জায়গায় স্পষ্ট বলেছে: “তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫), আর এই সূরাতেই, “তাহারা উভয়েই খাদ্য খাইত”। বরং আয়াতটি থেকে একটি শিক্ষা পাওয়া যায়: মৃত্যু দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ, আর তাঁর নির্ধারিত সময়ে তিনি সব মানুষকেই মৃত্যু দেন।
সংক্ষেপে
- আয়াতে মসীহের সাথে তাঁর মা আর পৃথিবীর সব মানুষের কথাও আছে।
- এই যুক্তিতে ঈসা (আ.) জীবিত হলে মরিয়ম (আ.) আর সব মানুষও জীবিত হতেন, যা কেউ মানেন না।
- আয়াতের বিষয় ঈসা (আ.)-কে খোদা বানানোর খণ্ডন, তাঁর জীবন-মৃত্যু নয়।
- একই সূরা বলে, ঈসা (আ.) ও তাঁর মা “খাদ্য খাইত”, আর ঈসা (আ.) নিজে বলবেন, “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে”।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Holy Quran 5:18 (with commentary) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.