চৌদ্দশ বছর আগে মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের (রা.) বহু শতাব্দী পরের এক যুগের খবর দিয়েছিলেন। সেই সব ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে একটি ছিল প্রশ্নের আকারে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সেটি মনে রেখে বর্ণনা করেছেন:
হাদীসটি সহীহ, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আহমদী মুসলমানরা এটি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে মানেন। প্রশ্ন শুধু এর অর্থ নিয়ে। অনেকে বলেন, এই হাদীস প্রমাণ করে যে ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত আছেন, আর সেখান থেকে নেমে আসবেন। চলুন হাদীসের শব্দগুলো মন দিয়ে দেখি।
“আকাশ” শব্দটি কোথায়?
হাদীসটি আবার পড়ুন। “ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন।” কোথা থেকে? হাদীস তা বলেনি। “আকাশ থেকে” (মিনাস সামা) কথাটি এখানে নেই।
alislam.org-এর প্রবন্ধে এ কথাটিই প্রথমে বলা হয়েছে: হাদীসে “আকাশ থেকে” শব্দটি উল্লেখই নেই। “আকাশ থেকে নামবেন” কথাটি পরবর্তীকালে মানুষের মুখে মুখে যুক্ত হয়েছে, মহানবী (সা.)-এর মুখ থেকে নয়।
তাহলে বাকি থাকে দুটি শব্দ, যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়: “নাযিল” আর “ইবনে মরিয়ম”।
“নাযিল” মানে কি আকাশ থেকে পড়া?
আরবিতে “নাযালা” মানে নামা, অবতীর্ণ হওয়া, আবার কোথাও এসে থামা বা অবস্থান নেওয়াও। কুরআনে এই শব্দ এমন অনেক কিছুর জন্য ব্যবহার হয়েছে, যা আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি। স্বয়ং মহানবী (সা.)-এর আগমন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
মহানবী (সা.) মক্কায় মা আমিনার কোলে জন্মেছিলেন। কেউ বলেন না তিনি আকাশ থেকে নেমেছিলেন। অথচ কুরআন তাঁর জন্যই “নাযিল” শব্দ ব্যবহার করেছে। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা আসে, সম্মান বোঝাতে তাকে “নাযিল” বলা হয়। এই শব্দের আরও উদাহরণ নিয়ে এই সাইটে আলাদা একটি লেখা আছে।
“ইবনে মরিয়ম” কে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই। যেহেতু কুরআন স্পষ্ট বলেছে ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর মৃতরা পৃথিবীতে ফিরে আসেন না, তাই হাদীসের “ইবনে মরিয়ম” একজন নতুন ব্যক্তি, যিনি ঈসা (আ.)-এর গুণ আর দায়িত্ব নিয়ে আসবেন।
হাদীসের শেষ অংশটিই এর ইঙ্গিত দেয়: “তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে।” যিনি আসবেন, তিনি এই উম্মতেরই একজন।
সহীহ বুখারীতে আরেকটি সূক্ষ্ম প্রমাণ আছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, তিনি ঈসা, মূসা ও ইবরাহীম (আ.)-কে দেখেছেন, আর ঈসা (আ.)-এর বর্ণনা দিয়েছেন: লালচে বর্ণের, কোঁকড়ানো চুল, চওড়া বুক (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৩৮)। আবার এক স্বপ্নে কাবা তাওয়াফের সময় তিনি যে “ইবনে মরিয়ম”-কে দেখেছেন, যার পরপরই দাজ্জালকেও দেখেছেন, তাঁর বর্ণনা ভিন্ন: বাদামি বর্ণের, সোজা চুল (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪১)। alislam.org-এর প্রবন্ধে এই পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, মহানবী (সা.) নিজেই আগামী ঈসার দৈহিক বৈশিষ্ট্য অতীতের ঈসা ইবনে মরিয়ম থেকে ভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন। দুজন আলাদা মানুষ।
একজনের নামে আরেকজনকে ডাকা আরবি ভাষার পরিচিত রীতি। alislam.org-এর প্রবন্ধে সহীহ বুখারী থেকে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে: রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবার থেকে বেরিয়ে আবু সুফিয়ান মহানবী (সা.)-কে বলেছিলেন “ইবনে আবী কাবশা” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭)। মহানবী (সা.) আবু কাবশার ছেলে ছিলেন না। alislam.org-এর প্রবন্ধ অনুযায়ী আবু সুফিয়ান এই নাম দিয়েছিলেন একটি সাদৃশ্যের কারণে। আমরাও তো দানশীল মানুষকে বলি “হাতেম তাঈ”। এতে কেউ ভাবে না, সেই প্রাচীন হাতেম কবর থেকে উঠে এসেছেন।
প্রসিদ্ধ সূফী বুযুর্গ মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.)-এর একটি বক্তব্যও alislam.org-এর প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে, তফসীরে আরাইসুল বায়ান (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬২)-এর বরাতে: শেষ যুগে তাঁর অবতরণ হবে ভিন্ন দেহে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মহানবী (সা.) তো স্পষ্ট নাম ধরে “ইবনে মরিয়ম” বলেছেন। রূপক অর্থ নেওয়ার দরকার কী?
দরকারটা তৈরি করেছে কুরআন নিজেই। কুরআন বলেছে, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মুখ দিয়েই কিয়ামতের দিন বলা হবে: “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১৮)। মহানবী (সা.)-এর কথা কখনো কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। তাই দুটোকে মেলালে একটাই অর্থ দাঁড়ায়: ভবিষ্যতের “ইবনে মরিয়ম” এই উম্মতের একজন, যিনি ঈসা (আ.)-এর গুণে গুণান্বিত। কুরআনও মরিয়মপুত্রের উল্লেখকে বলেছে “দৃষ্টান্ত স্বরূপ” (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৫৮)। আর ভবিষ্যদ্বাণীতে রূপকের ব্যবহার কুরআন-হাদীসের পরিচিত রীতি।
আকাশ থেকে না নামলে “নাযিল” শব্দ কেন বলা হলো? “আসবেন” বললেই তো হতো।
কারণ “নাযিল” শব্দটি সম্মান আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার ভাব বহন করে। alislam.org-এর প্রবন্ধে বলা হয়েছে, মসীহের আগমনের জন্য এই শব্দ তাঁর গুরুত্ব, বরকত আর আধ্যাত্মিক মর্যাদা বোঝায়; আকাশ থেকে দেহসহ পড়া নয়। মহানবী (সা.), লোহা, গৃহপালিত পশু, পোশাক, সবকিছুর জন্যই কুরআনে এই শব্দ এসেছে। যিনি আল্লাহর প্রেরিত, তিনি “নাযিল” হন, যদিও তাঁর জন্ম হয় এই পৃথিবীরই কোনো ঘরে।
তাহলে প্রতিশ্রুত “ইবনে মরিয়ম” কে?
alislam.org-এর প্রবন্ধ ব্যাখ্যা করেছে, প্রতিশ্রুত ইমামকে মহানবী (সা.) “ইবনে মরিয়ম” বলেছেন, কারণ তিনি হবেন এই উম্মতের মসীহ। মসীহ নাম আর মসীহের দায়িত্ব নিয়েই তিনি আসবেন। আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে, এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ.)-এর মাধ্যমে, যিনি এই উম্মতের মধ্য থেকেই এসেছেন এবং প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। হাদীসের শব্দ “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে” এই কথার সাথেই পুরোপুরি মেলে।
সংক্ষেপে
- বুখারী (৩৪৪৯) ও মুসলিম (১৫৫)-এর হাদীসে “আকাশ থেকে” কথাটি নেই।
- “নাযিল” শব্দ কুরআনে মহানবী (সা.)-এর আগমনের জন্যও এসেছে; এর মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা।
- “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে”: আগমনকারী এই উম্মতের একজন।
- বুখারীতেই অতীতের ঈসা (আ.) আর আগামী ইবনে মরিয়মের দৈহিক বর্ণনা ভিন্ন; তাই “ইবনে মরিয়ম” একটি উপাধি, যা ঈসা (আ.)-এর গুণে আসা একজনকে বোঝায়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.