একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। নাসরতের একটি ছোট্ট ঘর। সন্ধ্যা নেমেছে। মা মারইয়াম রুটি সেঁকছেন, পাশে বসে আছেন তাঁর ছেলে ঈসা। দুজনে একসঙ্গে খেতে বসলেন। সাধারণ একটি পরিবারের সাধারণ একটি দৃশ্য।
এই সাধারণ দৃশ্যটিকেই আল্লাহ কুরআনে একটি বড় সত্যের প্রমাণ বানিয়েছেন। খ্রিষ্টানরা যখন ঈসা (আ.) আর তাঁর মাকে উপাস্য বানিয়ে ফেলল, তখন আল্লাহ মনে করিয়ে দিলেন: যাঁকে খেতে হয়, তিনি খোদা হতে পারেন না।
আয়াতের তিনটি অংশ
প্রথম অংশ: ঈসা (আ.) একজন রসূল মাত্র, আর তাঁর আগের সব রসূল মারা গেছেন। অর্থাৎ তিনিও সেই একই রসূল-পরিবারের সদস্য, যাঁদের সবার জন্য একই নিয়ম।
দ্বিতীয় অংশ: তাঁর মা ছিলেন একজন সত্যবাদিনী, পুণ্যবতী নারী। খোদা নন, খোদার একজন নেক বান্দি।
তৃতীয় অংশ, আর এটিই আমাদের আলোচনার মূল: কানা ইয়া’কুলানিত তাআম, “তাহারা উভয়েই খাদ্য খাইত।”
“খেতেন”, “খান” নয়
আরবি কানা শব্দটি অতীতের একটি চলমান অবস্থা বোঝায়: তাঁরা খেতেন, এখন আর খান না। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই শব্দ থেকেই স্পষ্ট যে ঈসা (আ.) ও তাঁর মা কেউই আর খাবার খান না।
হযরত মারইয়াম (আ.) যে মারা গেছেন, তা নিয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত নেই। তাঁর খাবার খাওয়া বন্ধ হয়েছে মৃত্যুর কারণে। এখন আল্লাহ একই বাক্যে, একই ক্রিয়াপদে, একই অতীত কালে দুজনকে একসঙ্গে রেখেছেন। একজনের বেলায় “আর খান না” মানে মৃত্যু হলে অন্যজনের বেলায় কেন অন্য কিছু হবে?
এটা অনেকটা এমন: কেউ যদি বলে, “আমার দাদা আর দাদি দুজনেই এই গ্রামে থাকতেন”, শ্রোতা বুঝে নেয় দুজনের কেউই এখন আর সেখানে থাকেন না। একজন এখনো সেখানে থাকলে বক্তা এভাবে বলতেন না।
খাবার ছাড়া শরীর বাঁচে না
খাবারের কথা আল্লাহ কেন আনলেন? কারণ খাবারের প্রয়োজন প্রমাণ করে যে এই শরীর নশ্বর, দুর্বল, মুখাপেক্ষী। অন্য নবীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
এই আয়াতে দুটি কথা পাশাপাশি: নবীদের শরীর খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল, আর তাঁরা চিরকাল বাঁচার জন্য ছিলেন না। আলইসলাম.অর্গের ভাষায়, খাবার ছাড়া কোনো দেহ টিকে থাকতে পারে না; এটিই আল্লাহর নিয়ম। তাহলে ঈসা (আ.)-কে কেন এর ব্যতিক্রম ভাবব?
মহানবী (সা.)-কেও আল্লাহ একই কথা বলেছেন: “এবং আমরা তোমার পূর্বে যত রসূল প্রেরণ করিয়াছি তাহারা সকলেই তো আহার করিত এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করিত” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:২১)। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আগের নবীরা খেতেন কিন্তু আর খান না; শরীর টিকিয়ে রাখতে খাবার লাগে, আর যেহেতু তাঁরা কেউ আর খান না, তাই তাঁরা সবাই মৃত, ঈসা (আ.)-ও। এখানেও “সকলেই” শব্দটি লক্ষ করার মতো; কোনো একজনকে আলাদা করা হয়নি।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আকাশে হয়তো খাবারের দরকারই হয় না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, ঈসা (আ.) আকাশে আছেন, সেখানে হয়তো খাবার লাগে না, ফিরিশতাদের মতো আছেন। চলুন দেখি। কুরআন যে দেহের কথা বলছে, তা পৃথিবীর মানবদেহ, যার প্রকৃতি হলো খাবারের ওপর নির্ভর করা। যদি সেই একই শরীর দুই হাজার বছর খাবার ছাড়া টিকে থাকে, তাহলে তা আর মানুষের শরীর রইল না।
আরও বড় কথা, ঠিক এই আয়াতের উদ্দেশ্যই ছিল প্রমাণ করা যে ঈসা (আ.) খোদা নন, কারণ তাঁকে খেতে হতো। এখন যদি বলা হয় তিনি দুই হাজার বছর ধরে খাবার ছাড়াই জীবিত, তাহলে আয়াতের যুক্তিটিই উল্টে যায়, আর খ্রিষ্টানদের হাতে একটি “অলৌকিক” বৈশিষ্ট্য তুলে দেওয়া হয়। কুরআন যে যুক্তি দিয়ে ত্রিত্ববাদ খণ্ডন করছে, সেই যুক্তিকে দুর্বল করা কোনো মুসলমানের কাজ হতে পারে না।
আল্লাহ কি চাইলে তাঁকে খাবার ছাড়া বাঁচিয়ে রাখতে পারেন না?
অবশ্যই আল্লাহ সর্বশক্তিমান। প্রশ্নটি আল্লাহর ক্ষমতার নয়, আল্লাহ কী করেছেন বলে জানিয়েছেন তার। তিনি নিজেই বলেছেন, “তুমি আল্লাহ্র নিয়মে আদৌ কোন পরিবর্তন পাইবে না; এবং আল্লাহ্র নিয়মকে কখনও টলিতে দেখিবে না” (সূরা ফাতির ৩৫:৪৪)। আর নবীদের সম্পর্কে তাঁর জানানো নিয়ম হলো: তাঁরা খাবার খেতেন, চিরকাল বাঁচার জন্য ছিলেন না। ঈসা (আ.)-এর জন্য ব্যতিক্রম থাকলে আল্লাহ তা স্পষ্ট বলে দিতেন। উল্টো, তিনি ঈসা (আ.)-কে তাঁর মায়ের সঙ্গে একই বাক্যে রেখে দিয়েছেন।
আয়াতটি তো উপাস্য হওয়া নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে নয়?
ঠিক, আয়াতের মূল বিষয় ঈসা (আ.) ও তাঁর মায়ের খোদা না হওয়া। কিন্তু সেই যুক্তি দিতে গিয়ে আল্লাহ যে শব্দ বেছে নিয়েছেন, তাতেই একটি বাড়তি সাক্ষ্য রয়ে গেছে। তিনি বলতে পারতেন “তারা খায়”, যা জীবিত দুজনের জন্য ঠিক হতো। কিন্তু বলেছেন “তারা খেত”। আল্লাহর কালামের প্রতিটি শব্দ মাপা। তাই এখান থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা অবহেলা করার সুযোগ নেই।
সংক্ষেপে
- সূরা আল-মায়েদার ৭৬ আয়াতে ঈসা (আ.) ও তাঁর মা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তাহারা উভয়েই খাদ্য খাইত”, অতীত কালে।
- হযরত মারইয়াম (আ.)-এর খাওয়া বন্ধ হয়েছে মৃত্যুর কারণে; একই বাক্যে থাকা ঈসা (আ.)-এর বেলাতেও তাই।
- কুরআন বলছে, নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী ছিল এবং তাঁরা চিরকাল বাঁচার জন্য ছিলেন না।
- খাবার ছাড়া দুই হাজার বছর বেঁচে থাকার বিশ্বাস এই আয়াতের ত্রিত্ববাদবিরোধী যুক্তিকেই দুর্বল করে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- 30 Verses of the Holy Quran which prove the Natural Death of Jesus Christ (as) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.