শেষ যুগের সংস্কারককে কেন ‘ইবনে মরিয়ম’ বলা হলো?

হাদীসে আগমনকারীর নাম ঈসা ইবনে মরিয়ম। তাহলে কি দুই হাজার বছর আগের ঈসা (আ.)-ই ফিরবেন? ইহুদিরা একবার ঠিক এমন প্রশ্নেই পথ হারিয়েছিল।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

আমাদের সমাজে কেউ খুব দানশীল হলে লোকে বলে, “উনি তো আমাদের এলাকার হাতেম তাঈ।” কেউ অসাধারণ বীর হলে বলে, “ছেলেটা একেবারে রুস্তম।” কেউ শুনে ভাবে না যে প্রাচীন আরবের হাতেম তাঈ কবর থেকে উঠে এসেছেন।

একটি গুণের জন্য পুরনো মানুষের নাম নতুন মানুষকে দেওয়া, এটি সব ভাষার স্বাভাবিক রীতি। তাহলে আল্লাহর বাণীতে কাউকে “ইবনে মরিয়ম” বললে আমরা কেন ধরে নিই যে সেই পুরনো মানুষটিকেই ফিরে আসতে হবে?

ইলিয়াসের অপেক্ষায় ইহুদিরা

ইতিহাসে ঠিক এই প্রশ্নের একটি পরীক্ষা হয়ে গেছে। বাইবেলের মালাখি পুস্তকে বনী ইসরাঈলকে বলা হয়েছিল, মসীহ্ আসার আগে আল্লাহ্ নবী ইলিয়াসকে পাঠাবেন (মালাখি ৪:৫)। আর ইহুদিদের বিশ্বাস ছিল, ইলিয়াস ঘূর্ণিঝড়ে চড়ে আকাশে উঠে গেছেন (২ রাজাবলি ২:১১)।

তাই তারা অপেক্ষা করছিল, সেই পুরনো ইলিয়াস আকাশ থেকে নামবেন, তারপর মসীহ্ আসবেন। এরপর হযরত ঈসা (আ.) এসে মসীহ্ হওয়ার দাবি করলেন। ইহুদি আলেমরা আপত্তি তুলল: ইলিয়াস তো এখনও আকাশ থেকে নামেননি, তাহলে তুমি মসীহ্ হও কী করে?

ঈসা (আ.) উত্তর দিলেন, যে ইলিয়াসের আসার কথা ছিল, তিনি এসে গেছেন; তিনি হলেন ইয়াহইয়া, অর্থাৎ যোহন (মথি ১১:১৪)। মানে, ইলিয়াসের নাম ছিল, কিন্তু এসেছেন ইলিয়াসের গুণ ও শক্তি নিয়ে আরেকজন।

ইহুদিরা এই ব্যাখ্যা মানেনি। শব্দের বাহ্যিক অর্থ ধরে থাকার কারণে তারা একজন সত্য নবীকে অস্বীকার করল। আর আজও তারা ইলিয়াসের আকাশ থেকে নামার অপেক্ষায় আছে।

✦

কুরআনে ‘মরিয়ম’ একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা

ইবনে মরিয়ম নামের আরেকটি গভীর দিক কুরআন নিজেই খুলে দিয়েছে। সূরা আত-তাহরীমের শেষে আল্লাহ্ মু’মিনদের দুই রকম উপমা দিয়েছেন। প্রথমটি ফেরাউনের স্ত্রী। তারপর বলেছেন:

وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ
“এবং ইমরানের কন্যা মরিয়মকে (উপমা স্বরূপ বর্ণনা করিয়াছেন), যে স্বীয় সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল এবং আমরা তাহার মধ্যে আমাদের বাণী ফুৎকার করিলাম এবং সে সত্যায়ন করিয়াছিল তাহার প্রতিপালকের বাণীসমূহের এবং তাঁহার কিতাবসমূহের এবং সে অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।”
সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১৩
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬৬:১২।

লক্ষ্য করুন, এটি নারীদের জন্য আলাদা কোনো উপদেশ নয়। আগের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ এই উপমা দিয়েছেন “যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদের জন্য”, অর্থাৎ সব মু’মিনের জন্য। কিছু মু’মিন হবে মরিয়মের মতো: পবিত্র, অনুগত, আল্লাহর বাণী সত্য বলে মেনে নেওয়া।

খলীফাতুল মসীহ্ সানী হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) তাঁর দাওয়াতুল আমীর গ্রন্থে এর সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মু’মিনদের এক দল যদি মরিয়মের মতো হয়, তবে আগমনকারীকে “মরিয়মের পুত্র” বলার অর্থ হতে পারে: তাঁর জীবনের প্রথম অংশ হবে মরিয়মের মতো পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক। তারপর সেই অবস্থা থেকে আল্লাহ্ তাঁর মধ্যে নিজের রূহ ফুঁকে দেবেন, আর তিনি ঈসা (আ.)-এর মতো অবস্থায় পৌঁছাবেন। ঈসা (আ.) যেমন রূহুল কুদুসের সাহায্য পেয়েছিলেন, সত্যের সেবায় জীবন দিয়েছিলেন, আগমনকারীও তেমনি করবেন।

তিনি সূফী বুযুর্গ শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর আওয়ারিফুল মাআরিফ থেকেও উল্লেখ করেছেন যে জন্ম দুই রকম: একটি দৈহিক, আরেকটি আধ্যাত্মিক। দ্বিতীয় জন্মই মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের সাথে যুক্ত করে।

ক্রুশের ফিতনা আর ঈসার নাম

আরও একটি কারণ আছে। হাদীসে আগমনকারী মসীহের প্রধান কাজ বলা হয়েছে “ক্রুশ ভাঙা”। অর্থাৎ শেষ যুগে খ্রিষ্টধর্মের ভুল বিশ্বাস দলিল দিয়ে খণ্ডন করা।

কোনো নবীর অনুসারীরা বিপথে গেলে, তাদের সংশোধনের কাজ যেন সেই নবীরই কাজ। ঈসা (আ.)-এর নামে যে ভুল বিশ্বাস ছড়িয়েছে, তা দূর করবেন যিনি, তাঁকে তাই ঈসা (আ.)-এর নাম দেওয়া হয়েছে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজে এক কবিতায় বলেছেন, খ্রিষ্টান জাতির কাছে আলো পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই কল্যাণের খাতিরে তাঁর নাম ইবনে মরিয়ম রাখা হয়েছে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হাদীসে তো “ঈসার মতো একজন” বলা হয়নি, সরাসরি “ইবনে মরিয়ম” বলা হয়েছে?

এটিই সবচেয়ে বেশি শোনা আপত্তি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে এর উত্তরে বলেছেন: আল্লাহ্ যখন আগমনকারীর নামই ইবনে মরিয়ম রেখে দিয়েছেন, তখন আর “ইবনে মরিয়মের মতো” বলার প্রয়োজন কী? মানুষ নিজের ছেলের নাম মূসা, দাউদ বা ঈসা রাখে এই আশায় যে সে পুণ্যে তাঁদের মতো হবে; কিন্তু কেউ ছেলেকে “মূসার মতো” বলে ডাকে না (রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড)।

ইলিয়াসের ঘটনাতেও ঠিক তাই হয়েছিল। ভবিষ্যদ্বাণীতে “ইলিয়াসের মতো কেউ” বলা হয়নি, বলা হয়েছিল “ইলিয়াস”। তবুও এসেছিলেন ইয়াহইয়া (আ.)।

বাইবেলের ঘটনা দিয়ে মুসলমানদের কাছে প্রমাণ কেন?

এখানে বাইবেলকে আইনের উৎস বানানো হচ্ছে না। দেখানো হচ্ছে আল্লাহর একটি চিরন্তন রীতি। কুরআন নিজেই বলে:

سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ ۖ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
“আল্লাহ্‌র এই বিধান (গ্রহণ কর), যাহা ঐ সকল লোকের মধ্যে প্রচলিত ছিল যাহারা পূর্বে অতীত হইয়াছে; এবং তুমি আল্লাহ্‌র বিধানে কখনও কোন পরিবর্তন পাইবে না।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৩

ইয়াহইয়া (আ.) আর ঈসা (আ.) দুজনই কুরআনে স্বীকৃত সত্য নবী। ইহুদিরা যে কারণে তাঁদের অস্বীকার করেছিল, সেটি ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর শব্দ আক্ষরিক অর্থে ধরে রাখা। আল্লাহর রীতি বদলায় না; তাই একই ভুল আবার করলে একই ফল হবে।

ঈসা (আ.) তো আকাশে জীবিত, তিনিই তো ফিরবেন?

কুরআন এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে রেখেছে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের দিন হযরত আবু বকর (রা.) এই আয়াতটি পড়েছিলেন:

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ
“এবং মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল। তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে।…”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫

মহানবী (সা.)-এর আগের সব রসূল মারা গেছেন; ঈসা (আ.) সেই রসূলদেরই একজন। আর কিয়ামতের দিন ঈসা (আ.) নিজেই বলবেন, “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে তখন তুমিই তাহাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক ছিলে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১৮)। যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি দুনিয়ায় ফেরেন না। তাই হাদীসের ইবনে মরিয়ম হবেন তাঁর গুণ ও রূহ নিয়ে আসা উম্মতে মুহাম্মদীয়ার একজন।

সংক্ষেপে

  1. গুণের কারণে পুরনো মানুষের নাম নতুন মানুষকে দেওয়া সব ভাষার রীতি, আল্লাহর বাণীতেও তা আছে।
  2. ইলিয়াসের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছিল ইয়াহইয়া (আ.)-এর মাধ্যমে; শব্দ আঁকড়ে ধরে ইহুদিরা সত্য নবীকে অস্বীকার করেছিল।
  3. কুরআন মু’মিনদের এক দলকে মরিয়মের সাথে তুলনা করেছে; সেই অবস্থা থেকে একজন ঈসার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন।
  4. ক্রুশের ফিতনা দূর করার দায়িত্বের কারণে আগমনকারীর নাম রাখা হয়েছে ইবনে মরিয়ম।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.