মাহদী নিয়ে হাদীসগুলো কেন একে অপরের সাথে মেলে না?

কোনো বর্ণনায় মাহদী ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর, কোনোটিতে আব্বাস (রা.)-এর; কোনোটিতে তিনি আলাদা মানুষ, কোনোটিতে তিনি স্বয়ং ঈসা। এই জট খোলার চাবি কোথায়?

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

ধরুন, একজন মানুষের ঠিকানা খুঁজছেন। একজন বলল, তিনি পূর্বপাড়ার। আরেকজন বলল, না, পশ্চিমপাড়ার। তৃতীয়জন বলল, তাঁর বাবার নাম আব্দুল্লাহ; চতুর্থজন বলল, হাসান। এমন অবস্থায় আপনি কী করবেন?

শেষ যুগের মাহদী সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনাগুলোর অবস্থা অনেকটা এমনই। মুসলমানরা প্রায় সবাই একমত যে মাহদী আসবেন। কিন্তু তিনি কেমন হবেন, কোন বংশে জন্মাবেন, কী করবেন, এসব বিষয়ে বর্ণনাগুলো একে অপরের সাথে মেলে না।

বংশ, নাম আর সময় নিয়ে টানাপোড়েন

হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.) তাঁর তবলীগে হেদায়াত গ্রন্থে এই অমিলগুলো সাজিয়ে দেখিয়েছেন। কিছু উদাহরণ দেখুন।

বংশ নিয়ে: একদল বলেন, মাহদী হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হবেন। তাঁদের মধ্যেও মতভেদ: কেউ বলেন ইমাম হাসান (রা.)-এর বংশে, কেউ বলেন ইমাম হুসাইন (রা.)-এর বংশে। আরেক দলের বর্ণনায় তিনি হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধর। আবার কোনো বর্ণনা বলে, তিনি বিশেষ কোনো বংশের নন, মহানবী (সা.)-এর উম্মতের একজন।

নাম নিয়ে: কোনো বর্ণনায় তাঁর নাম মুহাম্মদ, কোনোটিতে আহমদ, আর কোনোটিতে বলা হয়েছে মাহদী স্বয়ং ঈসা। পিতার নাম নিয়েও সুন্নি আর শিয়া বর্ণনা আলাদা।

মসীহ্ ও মাহদী নিয়ে: কিছু বর্ণনায় মাহদী আর মসীহ্ দুজন আলাদা মানুষ, একসাথে নামায পড়বেন। অথচ সুনান ইবনে মাজাহর একটি হাদীসে পরিষ্কার বলা হয়েছে: “লাল মাহদিয়্যু ইল্লা ঈসাবনু মারইয়াম”, অর্থাৎ ঈসা ইবনে মরিয়ম ছাড়া কোনো মাহদী নেই (সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৩৯)।

দুটি কথা একসাথে আক্ষরিক অর্থে সত্য হতে পারে না। হয় দুজন, নয় একজন।

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুই গ্রন্থ কী বলে

হাদীসের জগতে সহীহ বুখারী আর সহীহ মুসলিমকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুই গ্রন্থে “মাহদী” নাম নিয়ে শেষ যুগের কোনো হাদীস নেই। যুদ্ধ করে পৃথিবী জয় করা এক মাহদীর যে কাহিনী ওয়াজে শোনা যায়, তা এসেছে অন্য গ্রন্থের বর্ণনা থেকে।

বুখারী আর মুসলিমে যা আছে, তা হলো ইবনে মরিয়মের আগমনের কথা। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি “তোমাদের মধ্য থেকে” হয়ে আসবেন, আর সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় তিনি নিজেই মুসলমানদের ইমামতি করবেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস ১৫৫)।

প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনও তাঁর মুকাদ্দিমায় মাহদী সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো একটি একটি করে যাচাই করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, খুব অল্প কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব বর্ণনার সূত্রেই সমালোচনার জায়গা রয়েছে।

✦

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর মীমাংসা

তাহলে কি সব বর্ণনা ফেলে দিতে হবে? না। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর হাকীকাতুল মাহদী পুস্তিকায় এর একটি ভারসাম্যপূর্ণ মীমাংসা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মাহদীর আগমন সংক্রান্ত সব হাদীস একসাথে নির্ভরযোগ্য নয়; এগুলো তিন ভাগে পড়ে।

প্রথম ভাগ: বানোয়াট ও মিথ্যা বর্ণনা, যার বর্ণনাকারীরা অসততার দোষে দুষ্ট। কোনো পুণ্যবান মুসলমান এগুলোর উপর ভরসা করতে পারেন না।

দ্বিতীয় ভাগ: দুর্বল বর্ণনা, অথবা এমন বর্ণনা যা পরস্পরবিরোধী হওয়ায় অনির্ভরযোগ্য হয়ে গেছে।

তৃতীয় ভাগ: সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা। এগুলোর মধ্যে কিছু এমন যুদ্ধের কথা বলে যা অনেক আগেই ঘটে শেষ হয়ে গেছে। আর বাকিগুলো শুধু একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত মানুষের সুসংবাদ দেয়, যাঁর কোনো দুনিয়াবি রাজত্ব থাকবে না, যিনি যুদ্ধ করবেন না, রক্ত ঝরাবেন না; বরং আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আবার ঈমান প্রতিষ্ঠা করবেন।

এই তৃতীয় ভাগের উদাহরণ হিসেবে তিনি সেই হাদীসটিই উল্লেখ করেছেন: “ঈসা ছাড়া কোনো মাহদী নেই।” এর অর্থ, যিনি ঈসা (আ.)-এর স্বভাব ও রূহ নিয়ে আসবেন, তিনিই মাহদী। ঈসা (আ.)-এর মতোই তিনি মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে দেবেন না, যুদ্ধ করবেন না; নিজের পবিত্র আদর্শ আর আসমানী নিদর্শন দিয়ে হেদায়াত ছড়াবেন।

জট খোলার নিয়ম

যখন বর্ণনাগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সঠিক পথ হলো কুরআন আর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদীসকে মানদণ্ড বানানো। কুরআন বলে ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। বুখারী আর মুসলিম বলে, আগমনকারী ইবনে মরিয়ম মুসলমানদের মধ্য থেকেই হবেন। ইবনে মাজাহ বলে, তিনিই মাহদী। এই কথাগুলো একে অপরকে সমর্থন করে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভবিষ্যদ্বাণী সবসময় বাহ্যিক রূপে পূর্ণ হয় না। অনেক সময় এর ভেতরে এমন সূক্ষ্ম তত্ত্ব লুকিয়ে থাকে, যা পূর্ণ হওয়ার আগে পুরোপুরি বোঝা যায় না। পূর্বের পুণ্যবানরা তাই রূপক ভবিষ্যদ্বাণীতে ঈমান রাখতেন, আর এর প্রকাশের ধরন আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতেন (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১-১৭২)।

তাই প্রশ্নটি “কোন বংশ, কোন নাম” নয়। আসল প্রশ্ন হলো: আল্লাহ্ যাঁকে পাঠিয়েছেন, তিনি কি সেই কাজ করেছেন যা নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে? ঈমানকে কি আবার হৃদয়ে ফিরিয়ে এনেছেন, যুক্তি দিয়ে ক্রুশের বিশ্বাস ভেঙেছেন, তলোয়ার ছাড়া ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন?

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

মাহদীর হাদীস তো বহু সাহাবী বর্ণনা করেছেন; আপনারা কি মাহদীকেই অস্বীকার করছেন?

না, একেবারেই না। আহমদীয়া মুসলিম জামাত মাহদীর আগমনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে; আমাদের বিশ্বাস, তিনি এসেও গেছেন। প্রশ্ন বিশ্বাসের মূল নিয়ে নয়, খুঁটিনাটি নিয়ে। বহু বর্ণনায় যে মূল কথাটি বারবার এসেছে, শেষ যুগে আল্লাহ্ একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত সংস্কারক পাঠাবেন, সেটি সত্য। কিন্তু বংশ, নাম, যুদ্ধজয়ের যেসব খুঁটিনাটি একে অপরের সাথে মেলে না, সেগুলো একসাথে আক্ষরিকভাবে সত্য হতে পারে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তিন ভাগের মীমাংসা ঠিক এই কথাই বলে।

আপনারা কি নিজেদের সুবিধামতো হাদীস বেছে নিচ্ছেন না?

মানদণ্ডটা আমাদের বানানো নয়। পরস্পরবিরোধী বর্ণনার মধ্যে কুরআনের সাথে যা মেলে আর যা বেশি নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসেছে, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, এটিই হাদীস বিচারের স্বীকৃত পথ। এখানে আমরা যে কথাগুলোর উপর দাঁড়িয়েছি, সেগুলো এসেছে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে।

তা ছাড়া ভবিষ্যদ্বাণী যে ব্যাখ্যা চায়, তা মহানবী (সা.) নিজেই শিখিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, স্বপ্নে দেখলাম আমি মক্কা থেকে খেজুর গাছে ভরা এক দেশে হিজরত করছি; আমার ধারণা হলো সেটি ইয়ামামা বা হাজার, কিন্তু দেখা গেল সেটি মদীনা, ইয়াসরিব (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৬২২)। নবীর নিজের ধারণাও যেখানে প্রকাশের আগে পুরোপুরি মেলেনি, সেখানে পরবর্তী বর্ণনাকারীদের শব্দ আঁকড়ে ধরে থাকা নিরাপদ নয়।

সংক্ষেপে

  1. মাহদীর বংশ, নাম ও ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনাগুলো একে অপরের সাথে মেলে না।
  2. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে “মাহদী” নামে শেষ যুগের কোনো হাদীস নেই; সেখানে আছে উম্মতের মধ্য থেকে আগত ইবনে মরিয়মের কথা।
  3. হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) মাহদী সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: বানোয়াট, দুর্বল বা পরস্পরবিরোধী, আর নির্ভরযোগ্য।
  4. নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলো একজন শান্তিপূর্ণ, আধ্যাত্মিক সংস্কারকের কথা বলে, যিনি একই সাথে মসীহ্ ও মাহদী।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.