মদীনায় একদিন সাহাবীরা মহানবী (সা.)-কে ঘিরে বসে আছেন। এমন সময় সূরা আল-জুমুআ নাযিল হলো। একটি আয়াতে বলা হলো, ভবিষ্যতের “অন্য লোকেদের” মধ্যেও তিনি আবির্ভূত হবেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসূল, এরা কারা?”
মহানবী (সা.) চুপ রইলেন। আবু হুরায়রা (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর আবার। তৃতীয়বারে মহানবী (সা.) পাশে বসা এক অনারব সাহাবীর কাঁধে হাত রাখলেন। তিনি পারস্যের মানুষ, হযরত সালমান ফারসী (রা.)।
সালমানের কাঁধে রাখা হাত
তারপর মহানবী (সা.) যে কথা বললেন, তা সহীহ বুখারীতে সংরক্ষিত আছে:
আর যে আয়াতের ব্যাখ্যায় এ কথা বলা হলো, সেটি এই:
অর্থাৎ শেষ যুগে, যখন ঈমান পৃথিবী থেকে যেন আকাশে উঠে যাবে, তখন তা ফিরিয়ে আনবেন পারস্য বংশের একজন মানুষ। হুযূর আনোয়ার (আই.) ২০২৩ সালের ২৪ মার্চের জুমুআর খুতবায় এই আয়াত ও হাদীস ব্যাখ্যা করে বলেছেন, সেই মানুষ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.), যিনি সত্যিই পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন।
“আমার মধ্য থেকে”, “আহলে বাইত থেকে”, “ফাতেমার বংশ থেকে”
এবার অন্য হাদীসগুলো দেখা যাক। সুনান আবু দাউদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন: “আল-মাহদী মিন্নী”, অর্থাৎ মাহদী আমার মধ্য থেকে হবেন (কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৫)।
সুনান ইবনে মাজাহতে হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনায় আছে:
আর হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে: “মাহদী আমার পরিবার থেকে, ফাতেমার সন্তানদের মধ্য থেকে” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৪; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪০৮৬)।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এগুলো পারস্যের হাদীসের সঙ্গে মেলে না। একজন মানুষ একসঙ্গে পারসিক আর ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হন কীভাবে? এই জট খোলে কুরআনের একটি নীতি।
কুরআনের নীতি: আত্মীয়তা অনুসরণে
হযরত নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলে যখন ডুবে যাচ্ছিল, তিনি আল্লাহকে বললেন, সে তো আমার পরিবারের। আল্লাহ উত্তর দিলেন:
রক্তের সন্তান, তবু আল্লাহর দৃষ্টিতে “পরিবারভুক্ত নয়”। উল্টো দিকটি বলেছেন হযরত ইবরাহীম (আ.):
আরবি শব্দটি “মিন্নী”, ঠিক সেই শব্দ যা মাহদীর হাদীসে এসেছে: “আল-মাহদী মিন্নী”। কুরআন নিজেই শিখিয়ে দিচ্ছে, “আমার মধ্য থেকে” মানে যে আমার পথে চলে। আর পবিত্র কুরআন বলেছে, মহানবী (সা.)-এর পত্নীগণ মুমিনদের মা (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭)। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অর্থে প্রত্যেক সত্যিকারের মুমিন সেই পরিবারেরই সন্তান।
এবার সব হাদীস এক সুতোয় গাঁথা যায়। প্রতিশ্রুত মাহদী রক্তে পারস্যের মানুষ, যেমন বুখারী বলেছে। আর আধ্যাত্মিকভাবে তিনি মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে কাছের সন্তান, আহলে বাইতেরই একজন, কারণ তিনি তাঁর পূর্ণ অনুসারী।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“ফাতেমা (রা.)-এর বংশের হাদীস তো সনদের দিক থেকে মজবুত, একে রূপক বলবেন কেন?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, আবু দাউদের এই হাদীসকে শায়খ আলবানীসহ অনেকে সহীহ বলেছেন। কথাটি সত্য, আর আমরা হাদীসটি অস্বীকার করছি না। প্রশ্ন হলো এর অর্থ নিয়ে।
লক্ষ করুন, মাহদীর বংশ নিয়ে বর্ণনাগুলো এক রকম নয়। কোথাও “আমার মধ্য থেকে”, কোথাও “আহলে বাইত থেকে”, কোথাও “ফাতেমার সন্তান থেকে”, আর বুখারীতে “পারস্যের মানুষ”। কোনো কোনো বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশের কথাও এসেছে (কানযুল উম্মাল, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪১)। সবগুলো আক্ষরিক অর্থে নিলে একজন মানুষকে একসঙ্গে কয়েকটি আলাদা বংশে জন্ম নিতে হবে। আর আধ্যাত্মিক অর্থে নিলে সব বর্ণনা একসঙ্গে সত্য হয়, কোনোটিকে বাদ দিতে হয় না।
“পারস্যের মানুষ আহলে বাইত হন কীভাবে?”
আহলে বাইত মানে “ঘরের মানুষ”। কুরআন দেখিয়েছে, নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলে এই ঘর থেকে বাদ পড়েছে তার কাজের কারণে। তাহলে উল্টোটাও সম্ভব: রক্তে বাইরের মানুষ তাঁর ঈমান আর আনুগত্যের কারণে ঘরের মানুষ হয়ে যেতে পারেন।
আর মহানবী (সা.) নিজেই এই দরজা খুলে দিয়েছেন। এত সাহাবীর মধ্যে তিনি বেছে নিলেন একজন পারসিককে, তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, শেষ যুগে ঈমান ফিরিয়ে আনবে “এদের মধ্য থেকে” কেউ। যে কাজ তিনি ভবিষ্যতের এক পারসিককে দিলেন, সেই কাজ তো আহলে বাইতের সবচেয়ে বড় সম্মান।
“বংশই যদি গুরুত্বহীন হয়, তবে হাদীসে বংশের কথা এল কেন?”
বংশের কথা এসেছে সম্পর্ক বোঝাতে। যিনি আসবেন, তিনি বাইরের কোনো নতুন নবী নন, বরং মহানবী (সা.)-এর ঘরের মানুষ, তাঁরই উম্মতের সন্তান। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত হাকীকাতুল মাহদী গ্রন্থের অনুবাদে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মাহদী সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ধারণা, যেমন তিনি ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হবেন, আলোচনা করে স্পষ্ট করেছেন যে প্রতিশ্রুত মাহদী তিনিই। বংশ পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী।
সংক্ষেপে
- সহীহ বুখারী (৪৮৯৭) অনুযায়ী শেষ যুগে ঈমান ফিরিয়ে আনবেন পারস্যের একজন মানুষ; হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) পারস্য বংশোদ্ভূত।
- অন্য হাদীসে মাহদীকে “আমার মধ্য থেকে”, “আহলে বাইত থেকে”, “ফাতেমার সন্তান থেকে” বলা হয়েছে।
- কুরআন শেখায়, আসল সম্পর্ক অনুসরণের: “যে আমার অনুসরণ করে সে আমার সহিত সম্পৃক্ত” (১৪:৩৭), আর অবাধ্য সন্তান “পরিবারভুক্ত নহে” (১১:৪৭)।
- এই নীতিতে সব বর্ণনা একসঙ্গে সত্য: রক্তে পারসিক, আত্মায় আহলে বাইত।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Promised Messiah and Mahdi (as) (Friday Sermon, 24 March 2023) · alislam.org
- Beliefs Concerning the Mahdi (The True Nature of the Mahdi) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.