১৯০৮ সালের মে মাস। লাহোর শহর। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে আছেন। দিনভর লিখছেন, মানুষের সাথে দেখা করছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন।
২০ মে তাঁর ওপর একটি ইলহাম হলো: “আর-রাহীলু সুম্মার রাহীলু ওয়াল মাউতু কারীব।” অর্থাৎ, “যাত্রা, তারপর আবার যাত্রা, আর মৃত্যু নিকটে।” আল্লাহ তাআলা আগেই জানিয়ে দিলেন, বিদায়ের সময় এসে গেছে।
এর ছয় দিন পর, ২৬ মে, তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু নিয়ে পরে একটি কথা ছড়ানো হয়েছে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং টয়লেটে পড়ে মারা গেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চান যে তাঁর মৃত্যু ছিল অপমানজনক, তাই তিনি সত্য হতে পারেন না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেখতে হবে, যাঁরা সেই রাতে তাঁর পাশে ছিলেন, তাঁরা কী বলেছেন। মৃত্যুর শেষ দিন ও শেষ ঘণ্টাগুলোর সব নির্ভরযোগ্য বর্ণনা এসেছে তাঁর পরিবার আর সাহাবীদের কাছ থেকে, যাঁরা নিজের চোখে সব দেখেছেন।
শেষ রাতটি কেমন ছিল
২৫ মে ১৯০৮। সেদিন তিনি তাঁর শেষ বই পয়গামে সুলেহ (শান্তির বাণী) লেখা শেষ করলেন। দিনের শেষ নামায পড়লেন, রাতের খাবার খেলেন।
তিনি সারা জীবন মাথাব্যথা আর পেটের পীড়ায় (ডায়রিয়া বা আমাশয়) ভুগতেন। কাজের চাপ বাড়লে এই অসুখও বেড়ে যেত। সে রাতেও পেটের পীড়া শুরু হলো। রাত এগারোটার আগে কয়েকবার তাঁকে বাথরুমে যেতে হলো। এতে তিনি খুব দুর্বল হয়ে পড়লেন।
তাঁর সহধর্মিণী বর্ণনা করেছেন, এক সময় তিনি এতই দুর্বল হয়ে গেলেন যে বাইরে যাওয়ার শক্তি ছিল না। তাই ঘরেই ব্যবস্থা করা হলো। এরপর বিছানায় ফিরে তিনি প্রায় ঢলে পড়লেন। স্ত্রী ঘাবড়ে গেলে তিনি শান্তভাবে বললেন, যা নির্ধারিত ছিল, তা-ই এখন ঘটছে। (সীরাতুল মাহদী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০–১১)
হযরত মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.) এবং ডাক্তারদের ডাকা হলো। ওষুধ দেওয়া হলো। কণ্ঠ ভেঙে গেল, তবু তাঁর মুখে একটিই কথা: “আল্লাহ, মেরে পেয়ারে আল্লাহ”, অর্থাৎ “আল্লাহ, আমার প্রিয় আল্লাহ।”
ভোরে সূর্য উঠলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নামাযের সময় কি হয়েছে? হ্যাঁ শুনে বিছানায় শুয়েই নামায শুরু করলেন। জ্ঞান হারালেন। জ্ঞান ফিরলে আবার নামায শুরু করলেন। এভাবেই প্রিয় আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে ২৬ মে সকাল সাড়ে দশটার দিকে তিনি নিজের ঘরে, নিজের বিছানায়, পরিবার ও সাহাবীদের মাঝে ইন্তেকাল করলেন। (তারীখে আহমদীয়াত, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮–৫৪৩ অবলম্বনে)
লক্ষ করুন, ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী বাথরুমে যাওয়ার ঘটনাগুলো ঘটেছিল আগের রাত এগারোটার আগে। এরপর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় বারো ঘণ্টা তাঁর বাথরুমে যাওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। তিনি মারা গেছেন বিছানায়। টয়লেটে মারা যাওয়ার কথাটির কোনো প্রমাণ নেই।
কলেরা নয়: ডাক্তারের সনদ আর রেলগাড়ি
কলেরা একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। তখনকার সরকার কলেরায় মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে কঠোর নিয়ম মানত, যাতে রোগ না ছড়ায়।
তাঁর মৃত্যুর পর বিরোধীরা ঠিক এই কথাটিই ছড়াতে লাগলেন, যেন তাঁর লাশ ট্রেনে করে কাদিয়ানে নেওয়া না যায়। তখন শেখ রহমতুল্লাহ সাহেব, ডা. মির্যা ইয়াকুব বেগ সাহেব ও আরও কয়েকজন সাহাবী লাহোরের সিভিল সার্জন ডা. কানিংহামের কাছে গেলেন মৃত্যুর সনদ নিতে।
সনদে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট লেখা হলো: পেটের পীড়া (ডিসেন্ট্রি), কলেরা নয়। লাহোর মেডিকেল কলেজের প্রধান মেজর ডা. সাদারল্যান্ড সেই সনদ অনুমোদন করলেন। এরপরই তাঁর লাশ ট্রেনে করে কাদিয়ানে নেওয়া সম্ভব হলো।
আরেকটি সহজ বিষয় ভাবুন। মৃত্যু থেকে দাফন পর্যন্ত তাঁর চারপাশে ছিলেন পরিবার, বন্ধু, অনুসারী আর অনেক ডাক্তার। লাহোর থেকে কাদিয়ান পর্যন্ত হয়তো হাজারো মানুষ তাঁর দেহের কাছাকাছি এসেছেন। অথচ কেউ কলেরায় আক্রান্ত হয়েছেন, এমন একটি ঘটনাও লিপিবদ্ধ নেই। সত্যিই কলেরা হলে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“হায়াতে নাসের” বইয়ে তো আছে, তিনি নিজেই কলেরার কথা বলেছিলেন?
এখানে কেউ কেউ একটি বর্ণনা তুলে ধরেন। হায়াতে নাসের বইটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর শ্বশুর মীর নাসের নওয়াব সাহেবের জীবনী, প্রকাশ করেছিলেন শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী (রা.), ১৯২৭ সালে। সেখানে মীর সাহেব বলেছেন, সেই রাতে তিনি পৌঁছালে হযরত সাহেব তাঁকে দেখে বলেছিলেন, “মীর সাহেব, আমার মহামারী কলেরা হয়েছে।” (হায়াতে নাসের, পৃষ্ঠা ১৪)
চলুন দেখি। প্রথমত, উর্দুতে একই বাক্য শুধু উচ্চারণের সুর বদলালেই প্রশ্ন হয়ে যায়: “আমার কি কলেরা হয়েছে?” তীব্র দুর্বলতার মাঝে মানুষের মনে এমন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, কথাটি বিবৃতি হিসেবে বলা হলেও তা ছিল অসুস্থ মানুষের মুহূর্তের একটি আশঙ্কা। রোগ কী ছিল, তা ঠিক করেছেন চিকিৎসকরা, আর তাঁদের সনদে লেখা হয়েছে: কলেরা নয়।
তৃতীয় বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বর্ণনা যিনি দিয়েছেন, সেই মীর নাসের নওয়াব সাহেব নিজে ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি এমন মানুষ ছিলেন যে, মেয়ের বিয়ের পরও শুরুতে জামাতার দাবি মানেননি, কারণ তাঁর কাছে সত্যই ছিল আগে। সেই মানুষটি এই রাত নিজের চোখে দেখার পরও আমৃত্যু হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। মৃত্যু সত্যিই লাঞ্ছনার হলে সবার আগে তাঁর বিশ্বাসই টলে যেত। তাই এই বর্ণনা দিয়ে কলেরা প্রমাণ হয় না।
অসুস্থ অবস্থায় ঘরে পায়খানার ব্যবস্থা করা কি অসম্মানের?
শেষ অসুস্থতায় শরীর দুর্বল হয়, প্রয়োজন হয় অন্যের সাহায্যের। এটি মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা, এতে লজ্জার কিছু নেই। নবীদের জীবনেও তা ছিল। মহানবী (সা.)-এর খাটের নিচেও রাতের জন্য একটি পাত্র রাখা থাকত:
শুধু তা-ই নয়, মহানবী (সা.)-এর ওফাতের বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, শেষ মুহূর্তের আগে তিনি পাত্র চেয়ে নিয়ে প্রয়োজন সেরেছিলেন, তারপর ইন্তেকাল করেন। (শামায়েলে তিরমিযী, ওফাত অধ্যায়, বর্ণনা ৩৬৯) কেউ কি এ থেকে কোনো অসম্মান খুঁজবে? কখনো না।
সেই শেষ সময়ে মহানবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে ছিলেন। জ্ঞান হারালেন, আবার জ্ঞান ফিরল, আর তাঁর শেষ কথা ছিল:
এখন দুটি মৃত্যুশয্যা পাশাপাশি রাখুন। একজনের শেষ কথা “হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী”, অন্যজনের শেষ কথা “আল্লাহ, আমার প্রিয় আল্লাহ।” দুজনই শেষ সময়েও নামাযের চিন্তায় ব্যাকুল। প্রভুর প্রতি এই ভালোবাসার মিলটুকুই অনেক কিছু বলে দেয়। অসুস্থতার স্বাভাবিক অবস্থা কোনো মানুষের মর্যাদা কমায় না।
পেটের অসুখে মৃত্যু কি অভিশপ্ত মৃত্যু?
উল্টো, মহানবী (সা.) পেটের রোগে মৃত্যুকে সম্মানের মৃত্যু বলেছেন:
তাহলে যে অসুস্থতাকে মহানবী (সা.) শাহাদাতের মর্যাদা দিয়েছেন, সেটিকে অপমান বলা কীভাবে ঠিক হয়? হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই একটি নীতি বলে গেছেন: ন্যায্য আপত্তি সেটিই যা আল্লাহর কিতাবের মানদণ্ডে টেকে; এমন আপত্তি নয় যার আওতায় সব নবী-রাসূলও এসে পড়েন। (রূহানী খাযায়েন, ৯ম খণ্ড, আনওয়ারুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৪১)
একজন মানুষকে আল্লাহ আগেই মৃত্যুর খবর দিলেন। তিনি ইসলামের পক্ষে শেষ বইটি শেষ করলেন। শেষ রাত কাটালেন আল্লাহর নাম নিয়ে, শেষ ভোরে নামাযের জন্য ব্যাকুল হলেন, আর প্রিয়জনদের দোয়ার মাঝে বিদায় নিলেন। এটি অপমানের মৃত্যু নয়, বরং আল্লাহর এক প্রিয় বান্দার মৃত্যু।
সংক্ষেপে
- মৃত্যুর ছয় দিন আগেই ইলহামে তাঁকে জানানো হয়েছিল: “মৃত্যু নিকটে।”
- প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ২৬ মে ১৯০৮ সকালে নিজের বিছানায় ইন্তেকাল করেন; শেষ বারো ঘণ্টায় বাথরুমে যাওয়ার উল্লেখও নেই।
- লাহোরের সিভিল সার্জনের সনদে মৃত্যুর কারণ লেখা হয় পেটের পীড়া, কলেরা নয়; তাই লাশ ট্রেনে কাদিয়ানে নেওয়া গেছে।
- মহানবী (সা.) পেটের রোগে মৃত্যুকে শাহাদাতের মর্যাদা দিয়েছেন; তাই এই আপত্তি ভিত্তিহীন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.