“হেলাল” আর “বদর”: কাকে কী বলা হয়েছিল?

বলা হয়, তিনি মহানবী (সা.)-কে নতুন চাঁদ আর নিজেকে পূর্ণিমার চাঁদ বলেছেন। মূল আরবী লেখাটি পড়লে দেখা যায়, সেখানে কথা হচ্ছে কোনো ব্যক্তির নয়, ইসলামের যাত্রার।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

চান্দ্র মাসের প্রথম সন্ধ্যা। পশ্চিম আকাশে সরু এক ফালি চাঁদ, এত ক্ষীণ যে খুঁজে বের করতে হয়। একে বলে হেলাল। তারপর রাতের পর রাত চাঁদ বড় হতে থাকে, আর চৌদ্দতম রাতে আকাশ ভরে ওঠে পূর্ণিমার আলোয়। একে বলে বদর।

লক্ষ করুন, হেলাল আর বদর দুটি আলাদা চাঁদ নয়। একই চাঁদ, একই আলো; শুধু সময়ের সাথে তা পূর্ণতা পায়। এই ছবিটি মনে রাখলে আজকের আপত্তিটি বুঝতে সহজ হবে।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মহানবী (সা.)-কে “হেলাল” (নতুন চাঁদ) আর নিজেকে “বদর” (পূর্ণিমার চাঁদ) বলেছেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর যুগ ছিল অপূর্ণ, আর তাঁর নিজের যুগ পূর্ণ। এভাবে তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় দেখিয়েছেন।

লেখাটি আছে তাঁর আরবী গ্রন্থ খুতবা ইলহামিয়া-য়। বইটির প্রথম অধ্যায় হলো ১৯০০ সালের ঈদুল আযহায় তাঁর দেওয়া বিখ্যাত আরবী খুতবা; পরে তিনি এর সাথে আরও কয়েকটি অধ্যায় লিখে যোগ করেন। আলোচ্য অংশটি সেই পরের অধ্যায়গুলোর একটিতে।

মূল লেখাটি কী বলে?

তিনি লিখেছেন:

وكان الإسلام بدأ كالهلال وكان قُدّر أنه سيكون بدرًا في آخر الزمان والمآل بإذن الله ذي الجلال، فاقتضت حكمة الله أن يكون الإسلام بدرًا في مائة تشابه البدر عِدّةً

অর্থাৎ: “ইসলাম শুরু হয়েছিল হেলালের মতো, আর নির্ধারিত ছিল যে মহিমান্বিত আল্লাহর আদেশে শেষ যুগে পরিণামে তা বদর হবে। তাই আল্লাহর প্রজ্ঞা চাইল যে ইসলাম এমন এক শতাব্দীতে বদর হবে, যা সংখ্যায় বদরের (পূর্ণিমার রাতের) সদৃশ।” (খুতবা ইলহামিয়া, রূহানী খাযায়েন, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৫)

বাক্যটি আবার পড়ুন। কে হেলালের মতো শুরু হয়েছিল? ইসলাম। কে বদর হবে? ইসলাম। এখানে মহানবী (সা.)-কে হেলাল বলা হয়নি, তিনি নিজেকেও বদর বলেননি। কথা হচ্ছে একটি ধর্মের যাত্রা নিয়ে: শুরুতে ছোট্ট এক দল, আর শেষ যুগে সারা পৃথিবীতে তার আলো।

পূর্ণিমা হয় চৌদ্দতম রাতে। তাই তিনি বলছেন, ইসলামের পূর্ণ বিকাশের যুগ হবে চৌদ্দতম শতাব্দী, যে শতাব্দীতে তিনি নিজেকে প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

✦

বদরের যুদ্ধ আর দুটি বদর

এই আলোচনাটি তিনি শুরু করেছেন কুরআনের একটি আয়াত দিয়ে:

وَلَقَدۡ نَصَرَکُمُ اللّٰہُ بِبَدۡرٍ وَّاَنۡتُمۡ اَذِلَّۃٌ
“এবং (ইতিপূর্বে) বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে তখন আল্লাহ্‌ তোমাদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন।…”
সূরা আলে ইমরান ৩:১২৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩:১২৩।

তিনি লিখেছেন, এই আয়াতের দুটি দিক আছে। একটি বদর অতীতের, যা প্রথম যুগের মুসলমানদের সাহায্যের জন্য এসেছিল: মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে বদরের প্রান্তরে দুর্বল মুসলমানদের বিজয়। আরেকটি বদর ভবিষ্যতের, যা পরবর্তীদের জন্য একটি নিদর্শন: এমন এক যুগে, যখন মুসলমানরা আবার দুর্বল ও লাঞ্ছিত। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, আয়াতটির অতীতের অর্থ সবার জানা এবং তিনি তা স্বীকার করেন; তার সাথে এতে ভবিষ্যতের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতও আছে। (রূহানী খাযায়েন, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩–২৭৬)

অর্থাৎ পুরো আলোচনাটি ইসলামের দুই বিজয়ের: প্রথমটি মহানবী (সা.)-এর হাতে, দ্বিতীয়টি তাঁরই উম্মতের শেষ যুগে। দুটিই ইসলামের বিজয়, দুটিই মহানবী (সা.)-এর আনা দ্বীনের বিজয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ইসলাম “হেলাল” ছিল বললে কি মহানবী (সা.)-এর যুগকে ছোট করা হয় না?

এখানে কেউ কেউ বলেন, মহানবী (সা.)-এর যুগেই তো দ্বীন পূর্ণ হয়েছে, তাকে হেলাল বলা অবমাননা। চলুন দেখি। দ্বীন পূর্ণ হওয়া এক কথা, আর সেই দ্বীন পৃথিবীর সব মানুষের কাছে পৌঁছানো আরেক কথা। শিক্ষা ও শরীয়ত মহানবী (সা.)-এর হাতেই পূর্ণ হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুরুতে ইসলাম ছিল মক্কার কয়েকজন দুর্বল মানুষের ধর্ম। বদরের দিনেও কুরআন মুসলমানদের বলেছে “হীনবল”। সেখান থেকে আজ পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে ইসলামের বিস্তার। এই বিস্তারকে হেলাল থেকে বদরের যাত্রা বলা হয়েছে।

আর চাঁদের উপমাটিই উত্তর দেয়: হেলাল আর বদর একই চাঁদ। পূর্ণিমার আলো নতুন কোনো আলো নয়; প্রথম রাতের সেই চাঁদেরই আলো।

তাহলে মহানবী (সা.)-এর সাথে নিজের সম্পর্ক তিনি কীভাবে দেখতেন?

চাঁদের উপমার চেয়েও সুন্দর একটি উপমা তিনি নিজেই দিয়েছেন। হাকীকাতুল ওহী-তে মহানবী (সা.) সম্পর্কে লিখেছেন: এই হেদায়াতের সূর্যের কিরণ রোদের মতো আমাদের ওপর পড়ে, আর আমরা ততক্ষণই আলোকিত থাকতে পারি, যতক্ষণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি এ-ও লিখেছেন, মহানবী (সা.)-ই প্রতিটি কল্যাণের উৎস, আর যে তাঁর অনুগ্রহ স্বীকার না করে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে, সে শয়তানের বংশধর। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৯)

চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই; পূর্ণিমার সব উজ্জ্বলতা সূর্যের দান। যিনি নিজেকে সূর্যের সামনে দাঁড়ানো এক আলোকিত বস্তু বলেন, তিনি সূর্যের চেয়ে বড় হওয়ার দাবি করেন না।

চৌদ্দতম শতাব্দীতে ইসলাম কি সত্যিই “বদর” হয়েছে?

তিনি লেখাটিতে বলছেন এমন এক যুগের কথা, যখন মুসলমানরা আবার দুর্বল, আর তখন আল্লাহ দ্বিতীয়বার সাহায্য করবেন। তাঁর অন্য লেখায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ছাপাখানা, ডাক ও যাতায়াতের মাধ্যমে এই যুগেই প্রথমবার পৃথিবীর সব জাতির কাছে ইসলাম পৌঁছানোর পথ খুলেছে। (তোহফায়ে গোলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৩–২৬৪) পূর্ণিমা এক রাতে হয় না, চাঁদ ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়। ইসলামের সেই বিশ্বব্যাপী প্রচারের ধারা চলমান; আর তার কেন্দ্রে আছে মহানবী (সা.)-এর আনা কুরআন।

সংক্ষেপে

  1. খুতবা ইলহামিয়া-র মূল আরবী লেখায় “হেলাল” ও “বদর” বলা হয়েছে ইসলামকে, কোনো ব্যক্তিকে নয় (রূহানী খাযায়েন ১৬, পৃষ্ঠা ২৭৫)।
  2. ইসলাম ছোট্ট দল হিসেবে শুরু হয়ে শেষ যুগে পূর্ণ বিকাশ লাভ করবে; চৌদ্দতম শতাব্দীকে পূর্ণিমার চৌদ্দতম রাতের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
  3. “বদর” শব্দে তিনি সূরা আলে ইমরানের ৩:১২৪ আয়াতের দুই দিক দেখিয়েছেন: অতীতের বদর বিজয় আর ভবিষ্যতের বিজয়।
  4. তাঁর নিজের ভাষায় মহানবী (সা.) হেদায়াতের সূর্য, আর তিনি সেই সূর্যের আলোয় আলোকিত; তাই আপত্তিটি মূল লেখার ভুল পাঠ।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.