একদিন কয়েকজন সাহাবী মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসূল, আপনার ওপর সালাম কীভাবে পাঠাতে হয় তা আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন। কিন্তু আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর দরূদ কীভাবে পাঠাব?”
মহানবী (সা.) তাঁদের শিখিয়ে দিলেন সেই দরূদ, যা আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান প্রতিটি নামাযে পড়েন:
লক্ষ করুন, মহানবী (সা.) নিজেই দরূদে শুধু নিজের নাম রাখেননি; সাথে রেখেছেন “আলে মুহাম্মদ”, আর তুলনায় এনেছেন ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারকে। দরূদ এক দরজা, যার ভেতর দিয়ে রহমত ছড়িয়ে পড়ে অনেকের ওপর।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা দুটি কথা বলেন। প্রথমত, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে দরূদ শরীফের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর অনুসারীরা তাঁর নামের সাথে “আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম” বলেন, যা তাঁদের মতে শুধু নবীদের জন্য, আর অন্য কারো জন্য বলা হারাম।
আহমদীরা নামাযে কোন দরূদ পড়েন?
প্রথম কথাটি যাচাই করা খুব সহজ। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রকাশিত নামাযের বই সালাত খুলুন। সেখানে তাশাহহুদের পর যে দরূদ শেখানো হয়েছে, তা হুবহু ওপরে উদ্ধৃত সহীহ বুখারীর দরূদে ইবরাহীমী: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন…”। এর মধ্যে একটি শব্দও যোগ করা হয়নি, কারো নাম ঢোকানো হয়নি। (Salat: The Muslim Prayer Book, পৃষ্ঠা ৪৮–৪৯)
যে কেউ যেকোনো আহমদী মসজিদে গিয়ে নিজের কানে শুনে আসতে পারেন। নামাযের দরূদে নতুন কোনো নাম যোগ করার অভিযোগ তথ্যের সাথে মেলে না।
“সালাত” ও “সালাম” কি শুধু নবীদের জন্য?
এবার দ্বিতীয় অভিযোগ। প্রশ্ন হলো, কোনো নবী নন এমন কারো জন্য “সালাত” (রহমতের দোয়া) আর “সালাম” (শান্তির দোয়া) বলা কি হারাম? কুরআন নিজেই এর উত্তর দেয়। আল্লাহ সাধারণ মুমিনদের সম্পর্কে বলেছেন:
আরবীতে এখানে সেই একই শব্দ: ইউসাল্লী আলাইকুম। আল্লাহ নিজে মুমিনদের ওপর “সালাত” পাঠান। আর মহানবী (সা.)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যারা সদকা দেয় তাদের জন্য দোয়া করতে, আর সেখানেও শব্দটি “ওয়া সাল্লি আলাইহিম” (সূরা আত-তাওবা ৯:১০৩)। ধৈর্যশীল মুমিনদের সম্পর্কেও কুরআন বলেছে, তাদের ওপর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে “সালাওয়াত” ও রহমত (সূরা আল-বাকারা ২:১৫৮)।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই এই আপত্তির জবাবে লিখেছেন: আমি প্রতিশ্রুত মসীহ; অন্যদের সালাত বা সালাম বলা তো এক পাশে, স্বয়ং মহানবী (সা.) বলেছেন, যে তাঁকে পাবে সে যেন তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দেয়। আর হাদীস ও হাদীসের সব ব্যাখ্যাগ্রন্থে প্রতিশ্রুত মসীহ সম্পর্কে শত শত জায়গায় সালাত ও সালাম শব্দ লেখা আছে। তাহলে আমার জামাত আমার জন্য এই বাক্য বললে তা হারাম হলো কীভাবে? কুরআন শরীফে সাধারণভাবে সব মুমিনের জন্য সালাত ও সালাম, দুটি শব্দই এসেছে। (আরবাঈন, রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৯–৩৫০)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
তাহলে “আলাইহিস সালাম” কি যে কারো জন্য বলা যায়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, এভাবে তো সবাইকে নবীর সমান করা হলো। চলুন দেখি। কুরআন দেখায়, সালাত ও সালাম মূলত দোয়া, আর তা মুমিনদের জন্যও করা যায়। তবে মুসলমানদের প্রচলিত রীতিতে এই সম্মানসূচক বাক্য সাধারণত নবীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। আহমদীরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর জন্য এটি বলেন, কারণ তাঁরা তাঁকে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীকৃত প্রতিশ্রুত মসীহ বলে বিশ্বাস করেন, যাঁর ব্যাপারে হাদীসেই সালামের কথা আছে। এতে কাউকে মহানবী (সা.)-এর সমান করা হয় না; বরং মহানবী (সা.)-এর নিজের পাঠানো সালামই পৌঁছে দেওয়া হয়।
তিনি কি নিজেকে “আলে মুহাম্মদ”-এর মধ্যে দাবি করেছেন?
দরূদে “আলে মুহাম্মদ” অর্থ মহানবী (সা.)-এর পরিবার ও তাঁর সাথে যুক্ত মানুষ। এক গলতী কা ইযালা-র একটি টীকায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস অনুযায়ী তাঁর এক প্রপিতামহী ছিলেন হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর এক সৈয়দ পরিবারের; আর একটি কাশফে হযরত ফাতিমা (রা.) তাঁর মাথা নিজের কোলে রেখেছিলেন, যা বারাহীনে আহমদীয়া-য় লেখা আছে। (A Misconception Removed, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৩–১৪, টীকা)
তবে তাঁর মূল কথাটি বংশ নিয়ে নয়, আধ্যাত্মিক সম্পর্ক নিয়ে। একই পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, প্রতিশ্রুত ব্যক্তির আসল পরিচয় হলো তিনি মহানবী (সা.)-এর উত্তরাধিকারী হবেন, যেন পুত্রের মতো: তাঁর নাম, চরিত্র, জ্ঞান আর আধ্যাত্মিকতার উত্তরাধিকারী। (পৃষ্ঠা ১৫) দরূদে “আল” শব্দ মহানবী (সা.) নিজেই রেখেছেন; তাঁর সত্যিকারের অনুগামীরা সেই রহমতের অংশীদার হওয়ার আশা রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক।
তাঁর ইলহামে “তোমার ওপর দরূদ পাঠাবে” কথাটি কি বাড়াবাড়ি নয়?
বারাহীনে আহমদীয়া-য় একটি ইলহাম আছে: “আসহাবুস সুফফা… তুমি দেখবে তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, তারা তোমার ওপর দরূদ পাঠাবে।” তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, মুমিনের স্বভাব হলো আল্লাহর কুদরতের কোনো নিদর্শন দেখলে আবেগে তার মুখ থেকে দরূদ বেরিয়ে আসে; যাঁরা সবসময় তাঁর কাছে থাকবেন, তাঁরা নানা নিদর্শন দেখে এমনই করবেন। তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কট্টর বিরোধী মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী এই বইয়ের প্রশংসাসূচক পর্যালোচনা লিখেছিলেন, তখন এই ইলহাম নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০ ও টীকা)
আর কুরআনের সবচেয়ে বিখ্যাত দরূদের আয়াতটি তো মহানবী (সা.)-এর জন্যই: “নিশ্চয় আল্লাহ্ এই নবীর উপর রহমত নাযেল করিতেছেন… হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! তোমরাও তাহার জন্য রহমত কামনা (দরূদ পাঠ) কর” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৭)। আহমদীরা প্রতিটি নামাযে এই নির্দেশই পালন করেন, মহানবী (সা.)-এর শেখানো দরূদ দিয়ে।
সংক্ষেপে
- আহমদীরা নামাযে হুবহু সহীহ বুখারীর দরূদে ইবরাহীমী পড়েন; তাতে কোনো নাম যোগ করা হয়নি।
- কুরআন সাধারণ মুমিনদের জন্যও “সালাত” শব্দ ব্যবহার করেছে (৩৩:৪৪, ৯:১০৩, ২:১৫৮)।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর উত্তর: মহানবী (সা.) নিজেই প্রতিশ্রুত মসীহকে সালাম পৌঁছাতে বলেছেন (রূহানী খাযায়েন ১৭, পৃষ্ঠা ৩৪৯)।
- তাই “আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম” বলা দরূদে নতুন কিছু যোগ করা নয়, আর তা হারামও নয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.