কুরআনে যুদ্ধ ফরজ, তবু কেন বলা হলো এ যুগে ধর্মযুদ্ধ নিষেধ?

রোযা ফরজ, তবু অসুস্থ মানুষ রমযানে রোযা ভাঙতে পারেন। যুদ্ধের বিধানও কি শর্ত ছাড়া চলে? কুরআন নিজেই উত্তর দিয়েছে।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

একজন মানুষ রমযানের মাঝামাঝি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার বললেন, রোযা রাখা যাবে না। তিনি কি গুনাহগার হলেন? কোনো আলেমই তা বলবেন না। কারণ রোযা ফরজ, কিন্তু তার সঙ্গে আল্লাহ নিজেই কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

এই সহজ কথাটি মনে রাখলে আজকের আপত্তিটি বোঝা খুব সহজ হয়ে যাবে।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা রূহানী খাযায়েন ১৯ খণ্ডের ৭৫ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন যে, কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী (এ যুগে) ধর্মের নামে যুদ্ধ করা হারাম। অথচ কুরআনে তো স্পষ্ট লেখা আছে, তোমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। তাহলে কি তিনি কুরআনের বিরুদ্ধে কথা বললেন?

আয়াতটি প্রথমে পুরোটা দেখে নিই।

کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِتَالُ وَہُوَ کُرۡہٌ لَّکُمۡ
“তোমাদের জন্য যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করা হইল এমতাবস্থায় যে, উহা তোমাদের নিকট অপ্রীতিকর…”
সূরা আল-বাকারা ২:২১৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:২১৬।

এই একই সূরায়, এর কিছু আগে, প্রায় একই শব্দে আরেকটি বিধান এসেছে: “তোমাদের উপর রোযা বিধিবদ্ধ করা হইল।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪)। আর ঠিক পরের আয়াতেই বলা হয়েছে:

فَمَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ
“…কিন্তু তোমাদের মধ্যে যদি কেহ পীড়িত হয় অথবা সফরে থাকে, তাহা হইলে তাহাকে অন্য সময়ে এই সংখ্যা পূর্ণ করিতে হইবে…”
সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫

অর্থাৎ “বিধিবদ্ধ করা হলো” শব্দটি থাকলেই একটি বিধান সব অবস্থায়, সব মানুষের উপর, সব সময় চাপানো যায় না। নামায ফরজ, তবু নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়া যায় না। যাকাত ফরজ, তবু একজন নিঃস্ব মানুষের উপর যাকাত নেই। প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে তার নিজস্ব শর্ত আছে।

যুদ্ধের অনুমতি কখন দেওয়া হয়েছিল

এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের শর্ত কী? এর উত্তরও কুরআন নিজেই দিয়েছে। মক্কায় তেরো বছর মুসলমানরা অকথ্য নির্যাতন সয়েছেন, কিন্তু হাত তোলেননি। প্রথম যে আয়াতে যুদ্ধের অনুমতি এলো, সেটি এই:

اُذِنَ لِلَّذِیۡنَ یُقٰتَلُوۡنَ بِاَنَّہُمۡ ظُلِمُوۡا
“যাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইতেছে তাহাদিগকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার) অনুমতি দেওয়া হইল, কারণ তাহাদের উপর যুলুম করা হইতেছে…”
সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০

পরের আয়াতে কারণটি আরও খুলে বলা হয়েছে: তাদের অন্যায়ভাবে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে শুধু এজন্য যে তারা বলে, “আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক।” (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪১)

আরেক জায়গায় সীমাটিও টেনে দেওয়া হয়েছে:

وَقَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ وَلَا تَعۡتَدُوۡا
“এবং আল্লাহ্‌র পথে তোমরা ঐ সকল লোকের সহিত যুদ্ধ কর যাহারা তোমাদের সহিত যুদ্ধ করে, কিন্তু তোমরা সীমালঙ্ঘন করিও না…”
সূরা আল-বাকারা ২:১৯১

তাহলে কুরআনের শর্ত পরিষ্কার: ধর্মের কারণে মুসলমানদের উপর যখন যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরার অনুমতি আছে। যে সরকার ধর্মের কারণে কারও বিরুদ্ধে তলোয়ার তোলে না, তার বিরুদ্ধে ধর্মের নামে যুদ্ধের কোনো ভিত্তি থাকে না।

✦

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আসলে কী বলেছিলেন

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কুরআনের কোনো বিধান বাতিল করেননি। তিনি শুধু দেখিয়েছেন, তাঁর সময়ে ভারতবর্ষে এই শর্তগুলো পাওয়া যাচ্ছিল না। শিখ শাসনামলে মুসলমানরা নির্যাতিত হয়েছিলেন, অনেক মসজিদকে আস্তাবল বানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী শাসনে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে নামায পড়তেন, রোযা রাখতেন, ইসলাম প্রচার করতেন। ধর্মের কারণে কেউ তাদের উপর তলোয়ার তুলছিল না।

alislam.org-এ প্রকাশিত আলোচনায় তাঁর একটি চিঠির কথা উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি বলেছেন, এ যুগের জিহাদ হলো ইসলামের বাণী উঁচু করে তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করা এবং বিরোধীদের আপত্তির জবাব দেওয়া, যতদিন না আল্লাহ পৃথিবীতে অন্য কোনো অবস্থা সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ এটি চিরকালের জন্য বাতিল ঘোষণা নয়, বরং শর্ত না থাকায় অস্ত্রের যুদ্ধ স্থগিত থাকার কথা।

আর জিহাদের সবচেয়ে বড় অংশ, নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, কুরআন দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করার সংগ্রাম, তা কখনো থামেনি এবং থামবে না।

মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

মজার ব্যাপার হলো, শেষ যুগের মসীহ যে ধর্মের নামে যুদ্ধ বন্ধ করবেন, সেই কথা আগেই জানানো হয়েছিল। মুসনাদ আহমদে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে ন্যায়বিচারক ইমাম হিসেবে দেখবে; তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন এবং যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।

alislam.org-এর আলোচনাতেও এই কথাই এসেছে যে, মসীহ এলে তিনি ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। তাই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যা বলেছেন, তা কুরআনের বিরোধিতা নয়, বরং কুরআনের শর্ত আর মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী, দুটোরই বাস্তব রূপ।

কুরআনের একটি আয়াতের কয়েকটি শব্দ তুলে ধরে বাকি আয়াতগুলো চেপে গেলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু পুরো কুরআন সামনে রাখলে ছবিটা একেবারে পরিষ্কার।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

শাসকদের খুশি করার জন্যই কি এই ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল?

এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। চলুন দেখি, সেই সময়ের অন্য আলেমরা কী বলেছিলেন। আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের প্রখ্যাত নেতা মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন বাটালভী, যিনি পরে আহমদীয়া জামাতের প্রধান বিরোধী হন, নিজের পত্রিকায় লিখেছিলেন, এই সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধকারীদের সাহায্য করা স্পষ্ট বিদ্রোহ এবং হারাম কাজ (ইশাআতুস সুন্নাহ, ৯ম খণ্ড, নম্বর ১০, পৃষ্ঠা ৩০৯)। বেরেলভী আলেম মৌলভী আহমদ রেযা খানও ভারতবর্ষকে “দারুল ইসলাম” বলেছেন, “দারুল হারব” নয় (নুসরাতুল আবরার, পৃষ্ঠা ১২৯)।

যে সিদ্ধান্ত বিরোধী আলেমরাও দিয়েছেন, সেটির জন্য শুধু হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-কে দোষ দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। আসল কারণ একটিই: কুরআনের শর্ত পূরণ হচ্ছিল না।

তাহলে কি মুসলমানরা আক্রান্ত হলেও আত্মরক্ষা করতে পারবে না?

অবশ্যই পারবে। alislam.org-এর আলোচনায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, তিনি জিহাদকে চিরতরে নিষিদ্ধ করেননি, বরং শর্ত না থাকায় অস্ত্রের জিহাদ স্থগিত বলেছেন। সূরা আল-হাজ্জের অনুমতি আজও কুরআনে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। যেখানে ধর্মের কারণে মুসলমানদের উপর যুদ্ধ চাপানো হবে, সেখানে আত্মরক্ষার বিধান প্রযোজ্য।

জিহাদ কি তাহলে থেমে গেছে?

না। কুরআন নিজেই সবচেয়ে বড় জিহাদের কথা বলেছে, আর তা হলো কুরআন দিয়ে জিহাদ:

فَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَجَاہِدۡہُمۡ بِہٖ جِہَادًا کَبِیۡرًا
“অতএব তুমি কাফেরদের আনুগত্য করিও না, এবং তুমি ইহার (কুরআনের) সাহায্যে তাহাদের সহিত বৃহত্তর জিহাদ কর।”
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫৩

এটি মক্কী আয়াত, যখন তলোয়ারের যুদ্ধের অনুমতিই ছিল না। অর্থাৎ কুরআনের আলো ছড়ানোই “বৃহত্তর জিহাদ”। আহমদীয়া মুসলিম জামাত আজও এই জিহাদই করে চলেছে।

সংক্ষেপে

  1. রোযা, নামায, যাকাতের মতো যুদ্ধের বিধানও শর্তসাপেক্ষ; “বিধিবদ্ধ” শব্দটি শর্ত মুছে দেয় না।
  2. কুরআন যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছে তাদের, যাদের উপর ধর্মের কারণে যুদ্ধ চাপানো হয় ও যুলুম করা হয় (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০-৪১)।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বলেছেন, তাঁর সময়ে এই শর্ত পূরণ হচ্ছিল না, তাই অস্ত্রের ধর্মযুদ্ধ বৈধ ছিল না; নফস ও কলমের জিহাদ চলবে।
  4. মহানবী (সা.) নিজেই জানিয়েছিলেন, আগমনকারী মসীহ যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.