এক কিশোর বাবার কাছে ছুটে এসে বলল, “বাবা, স্বপ্নে দেখলাম এগারোটি তারা, সূর্য আর চাঁদ আমাকে সেজদা করছে।” বাবা ছিলেন একজন নবী, হযরত ইয়াকুব (আ.)। তিনি ছেলেকে বকা দেননি, বরং বুঝেছিলেন, এই স্বপ্নে আল্লাহ এক মহান ভবিষ্যতের খবর দিয়েছেন।
স্বপ্নের ভাষা প্রতীকের ভাষা। এই সহজ কথাটি ভুলে গেলে কী হয়, আজকের আপত্তি তারই উদাহরণ।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা রূহানী খাযায়েন ৫ খণ্ডের ৫৬৪ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, “স্বপ্নে দেখলাম আমি খোদা, এবং বিশ্বাস করলাম যে আমি সত্যিই তা-ই।” তাঁদের দাবি, এটি খোদায়ী দাবির প্রমাণ।
স্বপ্নের পুরো বিবরণ
এই অংশটি আছে তাঁর গ্রন্থ আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম-এর আরবী অংশে। পুরো বিবরণের ভাব এমন: তিনি স্বপ্নে নিজেকে আল্লাহরূপে দেখলেন, আর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে তিনিই তা। তারপর তিনি বর্ণনা করেছেন, তাঁর নিজের কোনো ইচ্ছা, চিন্তা বা কাজ অবশিষ্ট রইল না; তিনি হয়ে গেলেন কানায় কানায় ভরা একটি পাত্রের মতো, বরং এমন একটি বস্তুর মতো, যাকে অন্য এক সত্তা সম্পূর্ণ নিজের ভেতরে লুকিয়ে নিয়েছে, ফলে তার নিজের কোনো অস্তিত্বের চিহ্নও রইল না।
খেয়াল করুন, এখানে নিজেকে বড় করা নয়, বরং নিজেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার কথা। এরপর তিনি নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন: নিজেকে আল্লাহরূপে দেখার অর্থ হলো ছায়ার তার মূলের দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহপ্রেমীদের সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা প্রায়ই ঘটে। আল্লাহ যখন কোনো কল্যাণের পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁর বান্দাকে সেই ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম বানিয়ে নেন। সৎকর্মশীল ও সিদ্দীকদের সঙ্গে তিনি এমন আচরণই করেন।
আর শেষে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন: এর দ্বারা তিনি “ওয়াহদাতুল উজূদ” (সবকিছুই খোদা) মতবাদের অনুসারীদের ধারণা বোঝাচ্ছেন না, আবার “হুলূল” (খোদা কারও দেহে প্রবেশ করেন) মতবাদের ধারণাও বোঝাচ্ছেন না। বরং এটি ঠিক সেই অবস্থা, যার কথা সহীহ বুখারীর নফল ইবাদতের হাদীসে বলা হয়েছে।
যে হাদীসের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন
এই হাদীসে আল্লাহ নিজেই বলছেন, তিনি বান্দার কান, চোখ, হাত, পা হয়ে যান। এর অর্থ কেউ এই করেন না যে বান্দা খোদা হয়ে গেছে। অর্থ হলো, বান্দা আল্লাহর ইচ্ছায় এমনভাবে বিলীন হয়ে যায় যে, তার দেখা-শোনা-চলা সবই আল্লাহর ইচ্ছামতো হয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর স্বপ্ন ঠিক এই অবস্থারই একটি প্রতীকী দৃশ্য।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
স্বপ্নেও কি এমন দৃশ্য দেখা গ্রহণযোগ্য?
এখানে কেউ কেউ বলেন, স্বপ্নে হলেও নিজেকে খোদা দেখা আপত্তিকর। চলুন কুরআনের সেই স্বপ্নটি দেখি:
সেজদা শুধু আল্লাহর প্রাপ্য, এ কথা সব মুসলমান জানে। তবু হযরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্নে নিজেকে সেজদার পাত্র দেখেছেন। কেউ বলেন না যে তিনি উপাস্য হওয়ার দাবি করেছেন। কারণ স্বপ্নের দৃশ্য প্রতীক, তার অর্থ ব্যাখ্যায় খোলে। এখানেও স্বপ্নদ্রষ্টা নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছেন।
তিনি কি কখনো জাগ্রত অবস্থায় খোদায়ী দাবি করেছেন?
কখনো না। এই একই বিবরণে তিনি নিজেকে একটি পাত্র, একটি বস্তু, অন্য সত্তায় বিলীন এক বান্দা বলেছেন। আর ওয়াহদাতুল উজূদ ও হুলূল দুটি মতবাদকেই স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যে লেখায় খোদায়ী দাবিকে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করা হয়েছে, সেই লেখাকেই খোদায়ী দাবির প্রমাণ বলা উদ্ধৃতির প্রতি অবিচার।
তাহলে শুধু প্রথম লাইনটি কেন তুলে ধরা হয়?
৫৬৪ পৃষ্ঠার প্রথম লাইন আর পরের ব্যাখ্যা একই বইয়ে, একই আলোচনায় আছে। পাঠকের কাছে আমাদের অনুরোধ একটাই: যেকোনো উদ্ধৃতি শুনলে পুরো অংশটি পড়ুন। পুরো অংশ পড়লে দেখা যায়, এটি খোদায়ী দাবি নয়, বরং আল্লাহর প্রেমে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার স্বীকারোক্তি।
“ছায়ার মূলের দিকে ফেরা” কথাটির অর্থ কী?
একটি আয়নার কথা ভাবুন। আয়নার সামনে সূর্য রাখলে আয়নায় সূর্য ঝলমল করে। দূর থেকে কেউ বলতেই পারে, “আয়নায় সূর্য উঠেছে।” কিন্তু আয়না নিজে সূর্য হয়ে যায়নি; সে শুধু এতটা পরিষ্কার হয়েছে যে, সূর্যের আলো পুরোপুরি ফুটে উঠছে।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজের স্বপ্নকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষ আল্লাহর গুণাবলির ছায়া মাত্র। যে বান্দা নিজের ইচ্ছা, অহংকার আর কামনা মুছে ফেলে, তার মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন পরিষ্কার আয়নায় সূর্যের আলো। এই অবস্থা দেখানোর জন্যই স্বপ্নে তাঁকে এমন দৃশ্য দেখানো হয়েছে, আর তাই তিনি নিজেকে “কানায় কানায় ভরা পাত্র” বলেছেন, যার নিজের কিছু অবশিষ্ট নেই।
এ কথা নতুন নয়। সহীহ বুখারীর যে হাদীসটি আমরা দেখলাম, তাতেও আল্লাহ বলেছেন, তিনি প্রিয় বান্দার চোখ, কান, হাত, পা হয়ে যান। মুসলমানরা চৌদ্দশো বছর ধরে এই হাদীস পড়ছেন, আর কেউ এর অর্থ করেননি যে বান্দা খোদা হয়ে গেছে। একই মাপকাঠি এখানেও প্রযোজ্য।
সংক্ষেপে
- আপত্তিকৃত কথাটি একটি স্বপ্নের বর্ণনা, যা আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম গ্রন্থের আরবী অংশে আছে।
- একই বিবরণে তিনি নিজেকে অন্য সত্তায় সম্পূর্ণ বিলীন এক পাত্র বলেছেন, আর ওয়াহদাতুল উজূদ ও হুলূল মতবাদ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
- তিনি স্বপ্নের অর্থ নির্দিষ্ট করেছেন সহীহ বুখারীর নফল ইবাদতের হাদীস দিয়ে (হাদীস ৬৫০২)।
- হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সেজদার স্বপ্নের মতো এটিও প্রতীকী দৃশ্য, যার অর্থ ব্যাখ্যায় স্পষ্ট (১২:৫)।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- আপত্তি: স্বপ্নে দেখলাম, আমি খোদা এবং বিশ্বাস করলাম · ahmadiyyabangla.org
- The Mirror of the Excellences of Islam · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.