নবুওয়তের কোন দরজা বন্ধ, আর কোন দরজা খোলা?

“নবুওয়তের দরজা খোলা” বাক্যটি শুনে অনেকে চমকে ওঠেন। কিন্তু একই বইয়ে বলা আছে কোন দুটি দরজা চিরতরে বন্ধ। পুরো কথাটি শুনলে ছবিটি বদলে যায়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

একটি বিশাল প্রাসাদের কথা ভাবুন। প্রধান ফটক একটাই, তার চাবি একজনের হাতে। আগে প্রাসাদে ঢোকার আরও অনেক পথ ছিল। এখন সব পথ বন্ধ, কেবল ওই প্রধান ফটক খোলা। যে-ই ঢুকতে চায়, তাকে আসতে হবে সেই ফটক দিয়ে, চাবিওয়ালার অনুমতিতে।

এই প্রাসাদে কি “দরজা খোলা” না “দরজা বন্ধ”? দুটোই সত্য, কোন দরজার কথা বলছেন তার ওপর নির্ভর করে। নবুওয়তের প্রশ্নটিও ঠিক এমন।

আপত্তিটি কী?

আপত্তিতে হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), খলীফাতুল মসীহ সানীর বই হকীকাতুন নবুওয়ত (পৃষ্ঠা ২২৮) থেকে একটি বাক্য তুলে ধরা হয়: “দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে নবুওয়তের দরজা খোলা।” বিরোধীরা বলেন, এটি খাতামান নাবিয়্যীন আয়াতের সরাসরি বিরোধিতা।

একই বই কী বলে?

উৎস প্রবন্ধে একই বই থেকে আরেকটি অংশ উদ্ধৃত হয়েছে, যা আপত্তিতে দেখানো হয় না। সেখানে হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) লিখেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর দুই ধরনের নবুওয়তের দরজা বন্ধ, অর্থাৎ শরীয়তবাহী নবুওয়ত এবং স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ নবুওয়ত। খোলা কেবল সেই পথ, যেখানে মহানবী (সা.)-এর কল্যাণে কল্যাণমণ্ডিত হয়ে, তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের মধ্য দিয়ে নবুওয়তের মর্যাদা লাভ হয়।

এটা আসলে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের কথারই ব্যাখ্যা। alislam.org-এ উদ্ধৃত তাঁর এক লেখায় আছে: “মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত ছাড়া সব নবুওয়ত শেষ হয়ে গেছে। তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী আসতে পারে না।” (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, রূহানী খাযায়েন ২০ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১২)

কুরআনে দুই ধরনের কথা

শরীয়তের পূর্ণতার কথা কুরআন স্পষ্ট বলেছে:

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ
“…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ন করিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে (অনুগ্রহকে) সম্পূর্ণ করিলাম…”
সূরা আল-মায়েদা ৫:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৫:৩ ও ৪:৬৯।

দ্বীন যখন পূর্ণ, তখন নতুন শরীয়ত নিয়ে কেউ আসবে না। এই দরজা চিরতরে বন্ধ। কিন্তু একই কুরআন আনুগত্যের পুরস্কারের কথাও বলেছে:

وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَالرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَالصِّدِّیۡقِیۡنَ وَالشُّہَدَآءِ وَالصّٰلِحِیۡنَ
“এবং যাহারা আল্লাহ্ এবং এই রসূলের আনুগত্য করিবে তাহারা ঐ সকল লোকদের মধ্যে শামিল হইবে যাহাদিগকে আল্লাহ্ পুরস্কার দান করিয়াছেন অর্থাৎ নবীগণ এবং সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ এবং সালেহগণের মধ্যে। এবং ইহারাই সঙ্গী হিসাবে উত্তম।”
সূরা আন-নিসা ৪:৭০

এখানে শর্ত একটাই: “এই রসূলের” আনুগত্য। অর্থাৎ যে পুরস্কারই আসুক, তা আসবে মহানবী (সা.)-এর দরজা দিয়ে। আগের মতো নিজের যোগ্যতায়, আলাদাভাবে কেউ নবী হবে না। এই আনুগত্যের নবুওয়তকেই বলা হয় উম্মতী বা যিল্লি নবুওয়ত।

আয়নার উপমা

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এক গলতী কা ইযালায় (রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ড) এর চাবিকাঠি বুঝিয়েছেন। alislam.org-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে মর্ম: যে ব্যক্তি খাতামান নাবিয়্যীন (সা.)-এর মধ্যে এমনভাবে বিলীন হয়ে যান যে তাঁর নাম পান আর তাঁর চেহারা প্রতিফলিত করেন, তিনি এই পূর্ণ একাত্মতার কারণে মোহর না ভেঙেই নবী নামে অভিহিত হন, কারণ তিনি ছায়ারূপে মুহাম্মদ (সা.)-ই। আর যে নিজেকে নবী বলে অথচ তাঁর আর মহানবী (সা.)-এর মাঝে সামান্য দূরত্বও থাকে, সে মোহর ভাঙার অপরাধী।

আয়নায় সূর্যের আলো পড়লে আয়না জ্বলজ্বল করে। কিন্তু আলো আয়নার নিজের নয়। সূর্য একটাই থাকে।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হাদীসে তো আছে “আমার পরে কোনো নবী নেই”?

হ্যাঁ, আছে। হাদীসটির পুরো কথা দেখুন:

كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الأَنْبِيَاءُ، كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ، وَإِنَّهُ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي، وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ
“বনী ইসরাঈলকে নবীরা পরিচালনা করতেন। একজন নবী মারা গেলে আরেকজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই; তবে খলীফারা হবেন, এবং তাঁরা অনেক হবেন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৫৫

এখানে মহানবী (সা.)-এর পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে উম্মত পরিচালনার জন্য নবী আসার কথা নাকচ করা হয়েছে; সেই কাজ করবেন খলীফারা। কিন্তু একই মহানবী (সা.) শেষ যুগে আগমনকারী মসীহকে চারবার “নাবিউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭)। তাহলে “আমার পরে নবী নেই” কথাটিকে সব অর্থে চূড়ান্ত ধরলে এই হাদীসের সাথে মেলানো যায় না। মেলানোর পথ একটাই: শরীয়ত নিয়ে, মহানবী (সা.) থেকে আলাদা হয়ে কোনো নবী আসবে না; তাঁর উম্মতের ভেতর থেকে, তাঁর অধীনে একজন আসতে পারেন।

ঈসা (আ.) তো পুরোনো নবী, তিনি এলে নতুন নবী আসা হয় না?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এক গলতী কা ইযালায় ঠিক এর উল্টো যুক্তি দিয়েছেন: ঈসা (আ.)-এর নবুওয়ত আলাদা ও স্বতন্ত্র, ইসলামের ছয়শো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত। তিনি আবার এলে আলাদা এক নবুওয়ত নিয়ে আসবেন, আর সেটিই মোহর ভাঙবে। পক্ষান্তরে উম্মতের ভেতর থেকে যিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আসেন, তাঁর নবুওয়ত আসলে মহানবী (সা.)-এরই নবুওয়তের প্রতিফলন; তাতে মোহর অটুট থাকে।

“খাতামান নাবিয়্যীন”-এর অর্থ কি “শেষ নবী” নয়?

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ
“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কাহারও পিতা নহে, কিন্তু সে আল্লাহ্‌র রসূল এবং নবীগণের মোহর;…”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১

আহমদীয়া জামাত বিশ্বাস করে, মহানবী (সা.) শরীয়তবাহী শেষ নবী। একই সাথে “মোহর” শব্দটির গভীরতাও মানে: মোহর যার ওপর পড়ে, তা সত্যায়িত হয়। alislam.org-এ উদ্ধৃত হযরত মুজাদ্দিদ আলফে সানী (রহ.)-এর কথাও এ রকম: খাতামান নাবিয়্যীন (সা.)-এর আগমনের পর তাঁর অনুসারীরা অধীনস্থ হিসেবে বা উত্তরাধিকারসূত্রে নবুওয়তের গুণাবলি লাভ করলে তা তাঁর খাতামান নাবিয়্যীন হওয়ার বিরোধী নয় (মাকতুবাতে ইমাম রব্বানী, ১ম খণ্ড, মাকতুব নং ৩০১)।

সব মিলিয়ে: “নবুওয়তের দরজা খোলা” বাক্যটি একা পড়লে এক রকম শোনায়। কিন্তু একই বইয়ে বলা আছে, শরীয়তবাহী আর স্বাধীন নবুওয়তের দরজা চিরতরে বন্ধ। খোলা কেবল মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের দরজা, যার চাবি তাঁর হাতে। প্রাসাদের মালিক তিনিই থাকেন।

সংক্ষেপে

  1. হকীকাতুন নবুওয়ত-এ স্পষ্ট বলা আছে, মহানবী (সা.)-এর পরে শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবুওয়তের দরজা বন্ধ।
  2. খোলা শুধু তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে লাভ করা উম্মতী নবুওয়ত, যার ইঙ্গিত সূরা আন-নিসা ৪:৭০-এ।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে যিনি আসেন, তাঁর দ্বারা মোহর ভাঙে না।
  4. মহানবী (সা.) নিজেই আগমনকারী মসীহকে “নাবিউল্লাহ” বলেছেন (মুসলিম ২৯৩৭), তাই “লা নাবিয়্যা বা’দী”-কে সব অর্থে চূড়ান্ত ধরা যায় না।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.