একটি পুস্তিকার এক লাইন দিয়ে কি একজন মানুষের বিচার করা যায়?

অভিযোগটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কোনো বই থেকে নয়, অন্য এক ব্যক্তির একটি পুস্তিকা থেকে। বর্ণনা যাচাইয়ের ইসলামী নিয়মে এর মূল্য কতটুকু, চলুন দেখি।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

ধরুন, পাড়ার একজন লোক আপনার সম্পর্কে একটি কথা ছড়াল। কথাটি আপনি কখনো বলেননি, লেখেননি। তবু কেউ সেই কথা দিয়ে আপনার বিচার করতে বসল। আপনি কী বলবেন?

নিশ্চয়ই বলবেন: আগে দেখুন কথাটি আমি নিজে বলেছি কি না, আর যে বলছে সে কতটা নির্ভরযোগ্য। এই আপত্তির বেলাতেও আমাদের ঠিক এই প্রশ্নটিই করতে হবে।

আপত্তিটি কী?

আপত্তিতে বলা হয়, কাজী ইয়ার মুহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একবার নিজের এক আধ্যাত্মিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, কাশফের (দিব্যদর্শনের) অবস্থায় তাঁর নিজেকে নারী বলে মনে হয়েছিল। সূত্র হিসেবে দেওয়া হয় “ইসলামী কুরবানী” নামের একটি ট্র্যাক্ট, নম্বর ৩৪।

এই বর্ণনা দেখিয়ে বিরোধীরা বোঝাতে চান যে হযরত মির্যা সাহেবের দাবিগুলো অদ্ভুত আর অগ্রহণযোগ্য।

প্রথম প্রশ্ন: কথাটি কার?

এখানে প্রথম কথা হলো, এই বর্ণনা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের কোনো বই, চিঠি বা বক্তৃতায় নেই। তাঁর লেখা আশির বেশি বই রূহানী খাযায়েনে সংকলিত আছে। সেখান থেকে এমন কোনো কাশফ দেখানো হয়নি।

“ইসলামী কুরবানী” পুস্তিকাটি লিখেছেন কাজী ইয়ার মুহাম্মদ নিজে। এটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বা তাঁর কোনো খলীফার লেখা নয়, আর আপত্তির উৎস প্রবন্ধ অনুযায়ী জামাত এটি প্রকাশও করেনি। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নীতি পরিষ্কার: জামাতের বিশ্বাস জানতে হলে দেখতে হবে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আর তাঁর খলীফাগণ কী বলেছেন। অন্য কারো ব্যক্তিগত বর্ণনা বা ব্যাখ্যা জামাতের জন্য দলিল নয়।

উৎস প্রবন্ধটি আরও জানায়, প্রথম যুগের আহমদীরা কাজী ইয়ার মুহাম্মদ সাহেবকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন বলে জানতেন, আর আপত্তিতে উদ্ধৃত লাইনের ঠিক নিচের লাইনেই তাঁর এমন বক্তব্য আছে যা এ কথার সাক্ষ্য দেয়। একজন বর্ণনাকারীর অবস্থা এমন হলে তাঁর বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে অন্য কারো বিচার করা যায় না।

ইসলাম বর্ণনা যাচাই করতে শেখায়

হাদীসের আলেমরা হাজার হাজার বর্ণনা যাচাই করেছেন একটি নীতিতে: বর্ণনাকারী কি সৎ, আর তাঁর স্মৃতি ও বুদ্ধি কি সুস্থ? এই বিদ্যাকে বলে আসমাউর রিজাল। কোনো বর্ণনাকারী দুর্বল হলে বর্ণনাটিও দুর্বল ধরা হয়।

এই নীতির মূল পবিত্র কুরআনেই আছে:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ جَآءَکُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا
“হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! যদি কোন দুষ্কৃতকারী তোমাদের নিকট কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ লইয়া আসে তাহা হইলে তোমরা ভালরূপে তদন্ত কর…”
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৪৯:৬।

মহানবী (সা.) আরও সাবধান করেছেন:

كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“একজন মানুষের গুনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই বলে বেড়ায়।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল আদব, হাদীস ৪৯৯২

যে নিয়মে আমরা মহানবী (সা.)-এর নামে আসা বর্ণনা যাচাই করি, সেই নিয়ম অন্য কারো ক্ষেত্রে ভুলে গেলে চলবে না। ন্যায়বিচার সবার জন্য একই।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কাজী ইয়ার মুহাম্মদ তো আহমদী ছিলেন; তাঁর কথা কি জামাতের কথা নয়?

কেউ কেউ এভাবে প্রশ্ন করেন। কিন্তু একটু ভাবুন। প্রত্যেক মুসলমান সমাজে এমন মানুষ আছেন যারা ধর্ম নিয়ে নিজের মতো করে লেখেন। তাঁদের প্রত্যেকের কথাকে কি ইসলামের কথা বলা যায়? যায় না। ইসলাম জানতে আমরা কুরআন আর সহীহ হাদীস দেখি। ঠিক তেমনি আহমদীয়া জামাতকে জানতে হলে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠাতা আর খলীফাগণের লেখা। একজন সদস্যের পুস্তিকা জামাতের আকিদা নয়।

হযরত মির্যা সাহেব কি নিজেকে “মরিয়ম” বলেননি?

এটি সত্য, আর এখানে লুকানোর কিছু নেই। কিন্তু তিনি যা বলেছেন, তা কুরআনের একটি উপমার ব্যাখ্যা। সূরা তাহরীমে আল্লাহ মু’মিনদের উপমা দিয়েছেন দুজন নারীর সাথে:

وَضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوا امۡرَاَتَ فِرۡعَوۡنَ … وَمَرۡیَمَ ابۡنَتَ عِمۡرٰنَ الَّتِیۡۤ اَحۡصَنَتۡ فَرۡجَہَا فَنَفَخۡنَا فِیۡہِ مِنۡ رُّوۡحِنَا
“এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদের জন্য আল্লাহ্ ফেরাউনের স্ত্রীকে উপমা স্বরূপ বর্ণনা করিয়াছেন… এবং ইমরানের কন্যা মরিয়মকে (উপমা স্বরূপ বর্ণনা করিয়াছেন), যে স্বীয় সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল এবং আমরা তাহার মধ্যে আমাদের বাণী ফুৎকার করিলাম…”
সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১২-১৩

অর্থাৎ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সব মু’মিনের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে কুরআন দুজন নারীর সাথে তুলনা করেছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর কিশতিয়ে নূহ গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এই উম্মতের কেউ প্রথমে মরিয়মের মর্যাদা পাবেন, তারপর তাঁর মধ্যে ঈসার রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে, অর্থাৎ মরিয়মসুলভ গুণাবলি ঈসাসুলভ গুণাবলিতে রূপ নেবে। এটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক উপমা, শরীর বা লিঙ্গের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কুরআনের ভাষাকে যারা গ্রহণ করেন, তাদের এতে আপত্তি করার সুযোগ নেই।

তাহলে কি কাশফের কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা?

আমরা কারো নিয়ত নিয়ে রায় দিতে চাই না। আমাদের দাবি শুধু এটুকু: এই বর্ণনা প্রতিষ্ঠাতার নিজের কোনো লেখায় নেই, এর বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত নন, তাই ইসলামী বর্ণনানীতিতে এর ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী করা যায় না। কুরআন বলে, “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই উহার পশ্চাদনুসরণ করিও না” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩৭)।

প্রতিষ্ঠাতার নিজের লেখা পড়ার সুযোগ কি আছে?

আছে, আর এটাই সবচেয়ে বড় কথা। তাঁর বইগুলো রূহানী খাযায়েন নামে সংকলিত, আর অনেকগুলোর ইংরেজি অনুবাদ alislam.org-এ বিনামূল্যে পড়া যায়। যে কেউ নিজে পড়ে দেখতে পারেন তিনি কী বলেছেন। এমন খোলা উৎস থাকতে একটি পুস্তিকার যাচাইহীন বর্ণনার ওপর নির্ভর করার কোনো কারণ নেই।

শেষ কথা

একজন মানুষের বিচার হয় তাঁর নিজের কথা আর কাজ দিয়ে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা সবার সামনে খোলা। সেখানে না পেয়ে অন্যের দুর্বল বর্ণনা টেনে আনা ন্যায়বিচারের পথ নয়।

সংক্ষেপে

  1. অভিযোগের বর্ণনাটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের কোনো লেখায় নেই; এটি কাজী ইয়ার মুহাম্মদের একটি পুস্তিকা থেকে।
  2. জামাতের আকিদা হলো প্রতিষ্ঠাতা ও খলীফাগণের লেখা; অন্য কারো ব্যক্তিগত বর্ণনা দলিল নয়।
  3. কুরআন (৪৯:৭) আর হাদীস (আবু দাউদ ৪৯৯২) যাচাই না করে বর্ণনা ছড়াতে নিষেধ করে।
  4. “মরিয়ম” নামটি সূরা তাহরীমের আধ্যাত্মিক উপমার ব্যাখ্যা, যেখানে সব মু’মিনকে দুজন নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.