মদীনার মসজিদে সাহাবীরা বসে আছেন। মহানবী (সা.)-এর ওপর সূরা আল-জুমুআ নাযিল হচ্ছে। একটি আয়াতে এমন এক দলের কথা এল, যারা “এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি”। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জানতে চাইলেন, এরা কারা? একবার, দুবার, তিনবার।
মহানবী (সা.) তখন পাশে বসা পারস্যের সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর গায়ে হাত রাখলেন। তারপর যা বললেন, সেটিই আজকের আলোচনার চাবি।
অর্থাৎ এমন এক সময় আসবে যখন ঈমান পৃথিবী ছেড়ে যেন আকাশের তারায় উঠে যাবে। আর তখন পারস্য বংশের একজন মানুষ তা আবার ফিরিয়ে আনবেন।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর “ইযালায়ে আওহাম” পুস্তকে লিখেছেন, কুরআন পৃথিবী থেকে উঠে গিয়েছিল, আর তিনি হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী তা আকাশ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। আপত্তিকারীরা রূহানী খাযায়েন ৩য় খণ্ডের ৪৯৩ পৃষ্ঠার বরাত দেন এবং বলেন, এটি কুরআনের অবমাননা, কারণ কুরআন তো কখনো হারায়নি।
লক্ষ করার বিষয়, তিনি নিজেই বলেছেন কথাটি “হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী”। তাই আগে দেখতে হবে, কোন হাদীস।
হাদীস কী বলে
ওপরের বুখারীর হাদীসটি তো আছেই। মিশকাতুল মাসাবীহ-এর কিতাবুল ইলমে, ইমাম বায়হাকীর সূত্রে হযরত আলী (রা.) থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে। এর মর্ম হলো: মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন ইসলামের শুধু নাম আর কুরআনের শুধু অক্ষর বাকি থাকবে। মসজিদগুলো বাইরে থেকে জমকালো হবে, কিন্তু হেদায়াতশূন্য থাকবে।
দুটি হাদীস মিলিয়ে পড়ুন। একটিতে ঈমান আকাশে উঠে যাওয়ার কথা, অন্যটিতে কুরআনের অক্ষর থাকলেও তার প্রাণ না থাকার কথা। কুরআনের কাগজ, কালি, হরফ সবই থাকবে, কিন্তু মানুষের জীবনে তার আমল থাকবে না।
পবিত্র কুরআনও এমন একটি করুণ দৃশ্যের কথা বলে, যেখানে স্বয়ং রসূল (সা.) আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন:
কুরআন ঘরে আছে, তাকের ওপর আছে, তবু তা “পরিত্যক্ত”। এটাই কুরআন “উঠে যাওয়া”র অর্থ।
তিনি নিজে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সূরা আল-জুমুআর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ শেষ যুগে আরেকটি দল তৈরি করবেন, যারা প্রথমে অন্ধকারে থাকবে, তারপর সাহাবীদের মতো হেদায়াত পাবে। এরপর তিনি সালমান (রা.)-এর হাদীসটি উল্লেখ করে বলেছেন, এটি ইঙ্গিত দেয় যে শেষ যুগে পারস্য বংশের একজন মানুষ জন্ম নেবেন, এমন এক সময়ে যার সম্পর্কে লেখা আছে যে কুরআন আকাশে উঠে যাবে। আর এই সময়টিই প্রতিশ্রুত মসীহর সময়।
হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) এই উদ্ধৃতি পড়ে শোনানোর পর ব্যাখ্যা করেছেন: ঈমান ও কুরআন আকাশে উঠে যাওয়ার অর্থ হলো, মানুষ আর তার ওপর আমল করবে না। (জুমুআর খুতবা, ২৪ মার্চ ২০২৩, alislam.org)
তাহলে “আকাশ থেকে ফিরিয়ে আনা” মানে কী? মানে, কুরআনের ভুলে যাওয়া শিক্ষা, তার জীবন্ত মর্ম আর তার ওপর আমলের প্রেরণা আবার মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠা করা। এটাই সেই কাজ, যা মহানবী (সা.) পারস্য বংশের সেই মানুষের জন্য নির্ধারণ করে গেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কুরআন তো লাখো হাফেযের বুকে আর প্রতিটি ঘরে আছে; উঠে গেল কীভাবে?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, এই দাবি বাস্তবতার বিরুদ্ধে। চলুন দেখি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজে কুরআনের অক্ষর সম্পর্কে কী বিশ্বাস করতেন। আশ্চর্যের বিষয়, একই “ইযালায়ে আওহাম” পুস্তকে তিনি লিখেছেন:
“পবিত্র কুরআন আল্লাহর অকাট্য বাণী, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মানুষের যোগ করা এক বিন্দুও এতে নেই। এর শব্দ ও অর্থ আল্লাহর বাণী… এর প্রতিটি অক্ষর নিজ স্থানে আছে। নিজের অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি পরিবর্তন ও সংযোজন থেকে মুক্ত।” (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৪; জুমুআর খুতবা, ১৭ মার্চ ২০২৩, alislam.org-এ উদ্ধৃত)
যে লেখক একই বইয়ে কুরআনের প্রতিটি অক্ষর অক্ষত থাকার ঘোষণা দেন, তিনি অক্ষর হারিয়ে যাওয়ার কথা বলতে পারেন না। তিনি কথা বলছেন আমল ও ঈমান নিয়ে, ঠিক যেমন হাদীস বলছে। আল্লাহ নিজেই কুরআন হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন (সূরা আল-হিজর ১৫:১০); সেই হেফাযতের একটি অংশ হলো, প্রয়োজনের সময় এর প্রকৃত মর্ম পুনরুদ্ধারের জন্য মানুষ পাঠানো।
“‘আমি ফিরিয়ে এনেছি’ বলা কি অহংকার নয়?”
মহানবী (সা.) নিজেই বলে গেছেন যে একজন বা কয়েকজন মানুষ ঈমান ফিরিয়ে আনবেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী কারও না কারও মাধ্যমে পূর্ণ হতেই হবে। যিনি দাবি করেন যে আল্লাহ তাঁকে সেই কাজের জন্য পাঠিয়েছেন, তাঁকে তো সে কথা বলতেই হবে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন, আর তাঁর সারা জীবন কুরআনের সৌন্দর্য ও যুক্তি তুলে ধরতে কেটেছে (alislam.org-এর “The Promised Messiah” প্রবন্ধ এই হাদীসকেই তাঁর সত্যতার একটি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে)। কাজটি তাঁর নিজের কৃতিত্ব নয়, বরং মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা।
“এভাবে বললে কি গোটা উম্মতকে ছোট করা হয় না?”
উম্মতের অবস্থা নিয়ে সবচেয়ে কঠিন সতর্কবাণী দিয়েছেন মহানবী (সা.) নিজে, আর কুরআন জানিয়েছে, রসূল (সা.) তাঁর জাতির বিরুদ্ধে কুরআনকে পরিত্যক্ত বানানোর অভিযোগ করবেন। একজন ডাক্তার যখন রোগ চিহ্নিত করেন, তখন তিনি রোগীর অপমান করেন না, তিনি চিকিৎসার পথ খোলেন। এই সতর্কবাণী মনে করিয়ে দেওয়া তাই অবমাননা নয়, আন্তরিক দরদ।
সিদ্ধান্ত: “কুরআন উঠে যাওয়া” মহানবী (সা.)-এরই ভাষার প্রতিধ্বনি, আর এর অর্থ কুরআনের ওপর আমল হারিয়ে যাওয়া; অক্ষর নয়।
সংক্ষেপে
- সহীহ বুখারীতে (৪৮৯৭) আছে, ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে চলে গেলেও পারস্য বংশের মানুষ তা ফিরিয়ে আনবেন।
- মিশকাতের বর্ণনা ও কুরআনের সূরা আল-ফুরকান দেখায়, কুরআনের অক্ষর থাকলেও তার আমল হারিয়ে যেতে পারে।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একই বইয়ে লিখেছেন, কুরআনের প্রতিটি অক্ষর পরিবর্তন থেকে মুক্ত; তাই তাঁর কথা আমল ও ঈমান নিয়ে।
- “ফিরিয়ে আনা” মানে কুরআনের জীবন্ত শিক্ষা পুনরুদ্ধার, যা মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Promised Messiah and Mahdi (as), Friday Sermon 24 March 2023 · alislam.org
- The Promised Messiah (as): The Unique and Superior Features of The Holy Quran · alislam.org
- The Promised Messiah · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.