একটি বড় বিদ্যালয়ের কথা ভাবুন। সেখানে দেশের সেরা শিক্ষক পড়ান। তাঁর এক ছাত্র এমন ফল করল যে অন্য সব বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদেরও ছাড়িয়ে গেল। মানুষ কাকে বাহবা দেবে? ছাত্রকে তো বটেই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি শিক্ষককে।
ছাত্রের উচ্চতা শিক্ষকের উচ্চতার প্রমাণ। আজকের প্রশ্নটি এই সহজ কথাটির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্নগুলো কী?
সমালোচকরা কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এত বড় হয় কীভাবে? তিনি মুহাদ্দাসদের (যাঁদের সাথে আল্লাহ কথা বলেন) চেয়ে বড় হন কীভাবে? মহানবী (সা.)-এর আগের নবীদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হন কীভাবে?
প্রশ্নগুলোর পেছনের ভাবনা হলো: একজন উম্মতী, অর্থাৎ অনুসারী, এত উঁচুতে উঠতে পারেন না।
শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত
প্রথমে উম্মতের মর্যাদা দেখা যাক। আল্লাহ বলেন:
এই উম্মত শ্রেষ্ঠ কেন? কারণ এর নবী শ্রেষ্ঠ। আগের নবীরা এসেছিলেন নির্দিষ্ট জাতি আর নির্দিষ্ট যুগের জন্য; মহানবী (সা.) এসেছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য, কিয়ামত পর্যন্ত। তাই তাঁর অনুসারীদের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক উচ্চতা সম্ভব, তা আগের কোনো উম্মতে সম্ভব ছিল না।
প্রতিষ্ঠাতা নিজে কী যুক্তি দিয়েছেন?
কিশতিয়ে নূহ-এ (ইংরেজি অনুবাদ Noah’s Ark, alislam.org) হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একটি তুলনা দিয়েছেন। মূসা (আ.)-এর সিলসিলার পরে এসেছে মুহাম্মদ (সা.)-এর সিলসিলা, যা মর্যাদায় হাজার গুণ উঁচু। তাই “মূসার সদৃশ (অর্থাৎ মহানবী (সা.)) মূসার চেয়ে বড়, আর ইবনে মরিয়মের সদৃশ ইবনে মরিয়মের চেয়ে উঁচু।” যেমন মূসা (আ.)-এর পর চতুর্দশ শতাব্দীতে মসীহ ইবনে মরিয়ম এসেছিলেন, তেমনি মহানবী (সা.)-এর পর চতুর্দশ শতাব্দীতে প্রতিশ্রুত মসীহ এসেছেন।
যুক্তিটি সরল: মর্যাদার উৎস ব্যক্তি নন, উৎস হলেন তাঁর নবী। মূসা (আ.)-এর সিলসিলার মসীহের চেয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর সিলসিলার মসীহ বড়, কারণ মুহাম্মদ (সা.) মূসা (আ.)-এর চেয়ে বড়।
একই বইয়ে তিনি আরেকটি প্রশ্ন রেখেছেন: আল্লাহ যদি এই উম্মতকে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মন্দ দিকগুলোর অংশীদার হতে দেন, কিন্তু তাদের নবীদের মর্যাদা থেকে চিরতরে বঞ্চিত রাখেন, তাহলে এই উম্মতকে “শ্রেষ্ঠ উম্মত” বলা যায় কীভাবে?
সব কিছু আনুগত্যের দান
তাহলে কি তিনি নিজেকে নিয়ে গর্ব করেছেন? হাকীকাতুল ওহীতে তাঁর কথা শুনুন (alislam.org-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে মর্ম): “আল্লাহর নিছক অনুগ্রহে, আমার কোনো যোগ্যতায় নয়, আমাকে সেই অনুগ্রহের পূর্ণ অংশ দেওয়া হয়েছে যা আমার আগে নবী-রসূল আর আল্লাহর মনোনীতদের দেওয়া হয়েছিল। আমার প্রভু ও নেতা, নবীগণের গৌরব, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর পথ অনুসরণ না করলে এই অনুগ্রহ পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যা কিছু পেয়েছি, এই অনুসরণের কারণেই পেয়েছি।”
এই কথায় আত্মপ্রশংসার কিছু নেই। আছে এক দাসের স্বীকারোক্তি: মনিবের দরজা ছাড়া আমার কিছুই নেই।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
একজন উম্মতী কি নবীর মর্যাদা পেতে পারেন?
মহানবী (সা.) নিজেই শেষ যুগের আগমনকারীর পরিচয় দিয়েছেন দুটি কথায়। একদিকে বলেছেন:
অর্থাৎ তিনি হবেন “তোমাদের মধ্য থেকে”, উম্মতেরই একজন। আর অন্যদিকে দাজ্জাল সম্পর্কিত দীর্ঘ হাদীসে মহানবী (সা.) তাঁকে চারবার বলেছেন “নাবিউল্লাহ ঈসা”, আল্লাহর নবী ঈসা (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭)। একই ব্যক্তি উম্মতী, আবার নবী। এটি মহানবী (সা.)-এর নিজের বর্ণনা।
মুহাদ্দাসদের চেয়ে বড় হওয়ার দাবি কি বাড়াবাড়ি নয়?
উম্মতে অনেক ওলী-আউলিয়া, মুহাদ্দাস ও মুজাদ্দিদ এসেছেন। তাঁরা সবাই সম্মানিত। কিন্তু তাঁদের কাউকে মহানবী (সা.) “নাবিউল্লাহ” বলে ডাকেননি; এমন বিশেষ বর্ণনা এসেছে কেবল শেষ যুগের প্রতিশ্রুত মসীহের ক্ষেত্রে। যাঁকে মহানবী (সা.) নিজে আলাদা করে চিহ্নিত করেছেন, তাঁর মর্যাদা আলাদা হবে, এটিই স্বাভাবিক। আর এ মর্যাদাও কুরআনের নিয়মে আনুগত্যের দান: “যাহারা আল্লাহ্ এবং এই রসূলের আনুগত্য করিবে তাহারা… নবীগণ এবং সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ এবং সালেহগণের মধ্যে” শামিল হবে (সূরা আন-নিসা ৪:৭০)।
এতে কি মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কমে না?
উল্টো, বাড়ে। চাঁদ যত উজ্জ্বল হয়, ততই প্রমাণ হয় সূর্যের আলো কত প্রখর। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেকে সবসময় এই সম্পর্কেই রেখেছেন: তিনি যা পেয়েছেন, মহানবী (সা.)-এর অনুসরণে পেয়েছেন। শিষ্যের উচ্চতা গুরুর গৌরব।
ঈসা (আ.)-এর চেয়ে উঁচু মর্যাদার দাবি কি তাঁর অসম্মান নয়?
কিশতিয়ে নূহ-এ এর উত্তরও আছে। তিনি লিখেছেন: আমি ঈসা (আ.)-এর মহত্ত্ব অস্বীকার করি না, যদিও আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন যে মুহাম্মদ (সা.)-এর মসীহ মূসা (আ.)-এর মসীহের চেয়ে উঁচু মর্যাদার। তবু আমি মসীহ ইবনে মরিয়মকে গভীর সম্মান করি; তিনি ছিলেন ইসরাঈলী সিলসিলার “খাতামুল খুলাফা” (খলীফাদের মোহর), আর আধ্যাত্মিক অর্থে আমি ইসলামে খাতামুল খুলাফা।
এখানেও মাপকাঠি একই: মর্যাদার তারতম্য দুই নবীর সিলসিলার তারতম্য থেকে। মূসা (আ.)-এর চেয়ে মহানবী (সা.) বড়, তাই তাঁর উম্মতের মসীহও বড়। এতে ঈসা (আ.)-এর অসম্মান নেই, আছে মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। কুরআনও বলে, আল্লাহ রসূলদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৪)।
সব মিলিয়ে: প্রশ্ন ছিল, একজন উম্মতী এত বড় হন কীভাবে? উত্তর: কারণ তিনি সবচেয়ে বড় নবীর উম্মতী। আর তাঁর নিজের ভাষায়, এই মর্যাদা তাঁর নিজের অর্জন নয়, মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের ফল।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) শ্রেষ্ঠ নবী, তাই তাঁর উম্মত শ্রেষ্ঠ উম্মত (৩:১১১)।
- কিশতিয়ে নূহ-এর যুক্তি: মুহাম্মদী সিলসিলা মূসায়ী সিলসিলার চেয়ে উঁচু, তাই এর মসীহও আগের মসীহের চেয়ে উঁচু।
- মহানবী (সা.) আগমনকারীকে একদিকে “তোমাদের মধ্য থেকে” (বুখারী ৩৪৪৯), অন্যদিকে “নাবিউল্লাহ” (মুসলিম ২৯৩৭) বলেছেন।
- হাকীকাতুল ওহীতে তিনি লিখেছেন, তাঁর সব প্রাপ্তি মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের ফল।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Claim of the Promised Messiah · alislam.org
- Noah’s Ark (Kashti-e-Nuh), English PDF · alislam.org
- Haqiqatul-Wahi (English, PDF) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.