আপনি একটি চিঠি লিখছেন। তাড়াহুড়োয় “৪ তারিখ” লিখতে গিয়ে লিখে ফেললেন “৪র্থ মাস”। পরের পাতায় আবার একই তারিখ লিখলেন, এবার একদম ঠিকভাবে। কেউ যদি শুধু প্রথম পাতাটি তুলে ধরে বলে, “দেখুন, এই লোক মাসের নামই জানে না”, সেটা কি ন্যায্য হবে?
আজকের আপত্তিটি ঠিক এমনই একটি ঘটনা নিয়ে।
আপত্তিটি কী
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর চতুর্থ পুত্রের জন্ম নিয়ে একটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। সেই পুত্রের জন্মের কথা লিখতে গিয়ে রূহানী খাযায়েন ১৫ খণ্ডের ২১৮ পৃষ্ঠায় একটি বাক্য এসেছে, যার ভাব এমন: যেহেতু সে চতুর্থ সন্তান, তাই সে ইসলামী চতুর্থ মাস সফরে জন্মেছে, আর সপ্তাহের চতুর্থ দিন বুধবারে জন্মেছে।
বিরোধীরা দুটি আপত্তি তোলেন। প্রথমত, সফর তো হিজরী বছরের দ্বিতীয় মাস, চতুর্থ নয়। দ্বিতীয়ত, বুধবারকে সপ্তাহের চতুর্থ দিন বলা ভুল। তাঁদের দাবি, এটি অজ্ঞতার প্রমাণ।
তিন পৃষ্ঠা পরে কী লেখা আছে
একই বইয়ের একই খণ্ডে, মাত্র তিন পৃষ্ঠা পরে, ২২১ পৃষ্ঠায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই ঘটনাটি আবার লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, চতুর্থ পুত্রসন্তানের এই ভবিষ্যদ্বাণী ১৪ জুন ১৮৯৯, অর্থাৎ ৪ সফর ১৩১৭ হিজরী তারিখে পূর্ণ হয়েছে।
এখানে তারিখটি একদম নির্ভুল: সফর মাসের চার তারিখ। অর্থাৎ যিনি এই বই লিখেছেন, তিনি ভালো করেই জানতেন যে জন্ম হয়েছে সফর মাসের চতুর্থ দিনে। ২১৮ পৃষ্ঠায় “সফরের চার তারিখ” কথাটি লিখতে বা ছাপতে গিয়ে “চতুর্থ মাস সফর” হয়ে গেছে।
উর্দুতে একে বলে “সাবকাতে কলম”, অর্থাৎ কলম ফসকে যাওয়া। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে ছাপাখানায় যাওয়ার পথে এমন ভুল খুব স্বাভাবিক। লিপিকার বা মুদ্রাকরের হাতেও তা হতে পারে।
বুধবার কি সত্যিই চতুর্থ দিন নয়?
দ্বিতীয় আপত্তিটি আরও সহজে মেটে। আরবী ভাষায় সপ্তাহের দিনগুলোর নাম সংখ্যা দিয়ে। রবিবার হলো ইয়াওমুল আহাদ (প্রথম দিন), সোমবার ইয়াওমুল ইসনাইন (দ্বিতীয় দিন), মঙ্গলবার ইয়াওমুস সুলাসা (তৃতীয় দিন), আর বুধবার ইয়াওমুল আরবিআ, যার শাব্দিক অর্থই “চতুর্থ দিন”।
মসজিদে জুমার খুতবায়, হাদীসের কিতাবে, সব জায়গায় বুধবারকে এই নামেই ডাকা হয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আরবী নামটির শাব্দিক অর্থই লিখেছেন। এতে ভুল নেই, বরং আরবী ভাষার সঙ্গে গভীর পরিচয়ের ছাপ আছে।
কুরআনের শিক্ষা: যাচাই করো
কোনো কথা শুনে বা পড়ে সঙ্গে সঙ্গে রায় দেওয়ার আগে কুরআন আমাদের একটি নিয়ম শিখিয়েছে:
এখানে তদন্ত মানে খুব কঠিন কিছু নয়। শুধু তিনটি পাতা উল্টালেই সত্যটা চোখের সামনে চলে আসে। যিনি ২১৮ পৃষ্ঠা পড়ে আপত্তি করেছেন, ২২১ পৃষ্ঠাও তাঁর হাতের নাগালেই ছিল।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
নবীর লেখায় কি এমন ভুল থাকতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট, তাঁর লেখায় সামান্য ভুলও থাকা উচিত নয়। চলুন দেখি, মহানবী (সা.) নিজে এ বিষয়ে কী বলেছেন। একবার নামাযে কিছু কম-বেশি হয়ে যাওয়ার পর সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলে তিনি সাহু সিজদা দিলেন এবং বললেন:
ওহীর বাণীতে ভুল হয় না, কিন্তু মানুষ হিসেবে ভুলে যাওয়া বা কলম ফসকে যাওয়া নবীদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। এতে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়তে কোনো দাগ লাগেনি। তেমনি একটি তারিখ লেখায় কলম ফসকে যাওয়া কোনো দাবির সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করে না।
এটা যে ছাপার ভুল, তার প্রমাণ কী?
প্রমাণ বইয়ের ভেতরেই আছে। একই খণ্ডে একই ঘটনার সঠিক তারিখ, “৪ সফর ১৩১৭ হিজরী”, লেখক নিজেই লিখে গেছেন। যিনি সত্যিই সফরকে চতুর্থ মাস মনে করতেন, তিনি পরের লেখায় “৪ সফর” লিখতেন না। দুটি লেখা পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, কোনটি আসল কথা আর কোনটি কলমের ভুল।
তাহলে বিরোধীরা শুধু প্রথম বাক্যটিই কেন দেখান?
এর উত্তর পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। আমরা শুধু এটুকু বলি: একটি বই থেকে উদ্ধৃতি দিলে পুরো প্রসঙ্গ দেখানো সততার দাবি। পুরো প্রসঙ্গ দেখালে এখানে আপত্তি করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
আসল আলোচনাটি কী ছিল?
একটি ছাপার ভুল নিয়ে এত কথার মাঝে মূল বিষয়টিই হারিয়ে যায়। ২২১ পৃষ্ঠার যে বাক্যটি আমরা দেখলাম, সেখানে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আসলে একটি ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতার কথা বলছিলেন। তিনি আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, আল্লাহ তাঁকে চতুর্থ একটি পুত্রসন্তান দেবেন। আর সেই উদ্ধৃতি অনুযায়ী, এই ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর সত্যতার প্রমাণ এবং বিরোধীদের, বিশেষ করে আব্দুল হক গযনবীর জন্য সতর্কবাণী হিসেবে করা হয়েছিল।
১৮৯৯ সালের ১৪ জুন সেই পুত্রের জন্ম হলো, যাঁর নাম রাখা হয় মির্যা মুবারক আহমদ। অর্থাৎ যে বইয়ের একটি বাক্যের তারিখ নিয়ে আপত্তি, সেই আলোচনার আসল বিষয় হলো একটি পূর্ণ হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী।
একজন ন্যায়পরায়ণ পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করবেন: আগে থেকে ঘোষিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হলো কি না, সেটি বড় প্রশ্ন, নাকি তার বর্ণনায় কলম ফসকে একটি শব্দ এদিক-ওদিক হলো কি না, সেটি? আসল প্রশ্নের উত্তর তো একেবারে স্পষ্ট: ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে।
সংক্ষেপে
- রূহানী খাযায়েন ১৫ খণ্ডের ২১৮ পৃষ্ঠায় “চতুর্থ মাস সফর” কথাটি একটি কলমের বা ছাপার ভুল।
- মাত্র তিন পৃষ্ঠা পরে, ২২১ পৃষ্ঠায়, সঠিক তারিখ লেখা আছে: ১৪ জুন ১৮৯৯, অর্থাৎ ৪ সফর ১৩১৭ হিজরী।
- আরবীতে বুধবারের নাম “ইয়াওমুল আরবিআ”, যার অর্থই চতুর্থ দিন; তাই এখানে কোনো ভুল নেই।
- কুরআনের নির্দেশ হলো, রায় দেওয়ার আগে যাচাই করো; যাচাই করলে আপত্তিটি টেকে না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.